★ নিট এফডিআই বেড়েছে ১২.৭৮ শতাংশ ★ বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সরকারের নানা উদ্যোগ “বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের মধ্যেও নিট এফডিআই বাড়া ইতিবাচক। তবে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ আকর্ষণ এখনও চ্যালেঞ্জের” — নাহিয়ান রহমান রচি, সদস্য, ইনভেস্ট বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) নিট প্রবাহ বেড়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নিট এফডিআই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়েছে। এতে এই সংখ্যা বর্তমানে ৩৪৬ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। দেশে ব্যবসা করা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের প্রবণতা এ প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে দেশেল বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতেও নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) নাহিয়ান রহমান রচির মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের মধ্যেও নিট এফডিআই বাড়া ইতিবাচক। তবে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ আকর্ষণ এখনও চ্যালেঞ্জের। কেন্দ্রীয় ব্যংকসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে প্রায় ১.৭৭ বিলিয়ন থেকে ১.৮৫ বিলিয়ন (প্রায় ১৮০ কোটি) মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৯% থেকে ৪৪% বেশি ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ কিছুটা গতি হারিয়েছে। এপ্রিল-জুন (২০২৬) প্রান্তর: নিট বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ৩৪.৭ মিলিয়ন ডলার (বা ৩৪৭ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, যা আগের বছরের তুলনায় ১২.৭৮% বেশি ছিল)। জুলাই-সেপ্টেম্বর (২০২৪-২৫ বা ২০২৬ অর্থবছরের প্রান্তর): রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমে ১০৪.৩৩ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন ও তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে খাতভিত্তিক বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) চিত্র নিচে দেওয়া হলো: তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত সর্বোচ্চ বিনিয়োগ: তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত থেকে দেশে আসা মোট বিদেশি বিনিয়োগের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ আকর্ষণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পর ২০২৫ সালে এ খাতে নিট বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে শুধু তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে সর্বোচ্চ প্রায় ৪০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (মোট নিট এফডিআই-এর প্রায় ২৩.৯%) আসে। এছাড়া শুধু চীন থেকেই এ খাতে ৬৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। পোশাক খাতের পরিচ্ছন্ন ও সবুজ জ্বালানি রূপান্তরে ভবিষ্যতে প্রায় ৬.৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে জানানো হয়েছে। তৈরি পোশাক ও সুতা/টেক্সটাইল খাতে বিনিয়োগ এসেছে ৬৫ মিলিয়ন ডলার (চীন থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে)। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত বিনিয়োগের পরিমাণ: দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আসে। যেমন-২০২৫ সালে শুধু চীন থেকে দেশের বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ২১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ এসেছে। তবে ডলার সংকট ও জ্বালানি আমদানির চাপের কারণে এই খাতে নতুন বিনিয়োগের গতি ও তারল্য বর্তমানে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। একক দেশ হিসেবে চীন থেকে আসা বিনিয়োগের মধ্যে ২১৫ মিলিয়ন ডলার গেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য ১৭,৩৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সোলার প্যানেল আমদানিতে ১% শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি ও আইসিটি খাত প্রবণতা: তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস এবং হাই-টেক খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। তবে প্রযুক্তির সরাসরি ইক্যুইটি বিনিয়োগের চেয়ে রিইনভেস্টেড আর্নিংস বা অভ্যন্তরীণ পুনঃবিনিয়োগ এবং কোম্পানিগুলোর নিজেদের মধ্যকার ঋণের মাধ্যমে এ খাতের প্রবৃদ্ধি বজায় থাকছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে নিট পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় ৫৫ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ বেড়ে ২৬০ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে অর্জিত মুনাফার বড় অংশ নিজ দেশে ফেরত না নিয়ে এখানেই পুনরায় বিনিয়োগ করছে। এটি দেশের বাজারে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা ও বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রতি আস্থার ইঙ্গিত দেয়। তবে নতুন ইক্যুইটি মূলধন বিনিয়োগে কিছুটা ভাটা দেখা গেছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ খাতে নিট বিনিয়োগ ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ কমে ৭৭ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। একই সময়ে আন্তঃকোম্পানি ঋণের নিট প্রবাহ ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬১ মিলিয়ন ডলারে। মোট ৩৩৩ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ডলারের আন্তঃকোম্পানি ঋণ এলেও আগের ঋণ পরিশোধের কারণে নিট প্রবাহ কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানির উচ্চমূল্য নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি করছে। খাতভিত্তিক হিসাবে, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) বাইরের খাতে নিট এফডিআই ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়ে ২৮০ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিপরীতে, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নিট এফডিআই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। তবে আগের প্রান্তিকে এ খাতে নিট বিনিয়োগ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার। ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) নাহিয়ান রহমান রচি বলেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের মধ্যেও নিট এফডিআই বাড়া ইতিবাচক। তবে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ আকর্ষণ এখনো চ্যালেঞ্জের। তিনি বলেন, বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিনিয়োগ বৃদ্ধি বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার প্রতি তাদের আস্থার ইঙ্গিত দেয়। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ব্যবসা সম্প্রসারণ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ বাড়বে। নাহিয়ান রহমান বলেন, দেশে আরও বেশি ও মানসম্মত বিদেশি বিনিয়োগ আনতে বিনিয়োগ পরিবেশের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ চলছে। সম্প্রতি কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা আশাব্যঞ্জক। পাশাপাশি, ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইনে থাকা প্রকল্পগুলো বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে কাজ করছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। তিনি আরও বলেন, এক দশকের বেশি সময় ধরে আটকে থাকা চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল প্রকল্পের উন্নয়নকাজ এখন এগোচ্ছে। ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটির উন্নয়নকাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ রয়েছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের ১৮০ দিনের অগ্রগতি প্রতিবেদনে সংস্থাটির উদ্যোগ, অর্জন এবং আরও কাজ প্রয়োজন, এমন ক্ষেত্রগুলো তুলে ধরা হয়েছে বলেও জানান তিনি। ভবিষ্যতে নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ করা হবে। বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগ, নতুন কারখানা ও কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়াই এখন প্রধান লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন নাহিয়ান রহমান।