২০২৭ সালে আন্তর্জাতিক স্বর্ণের বাজারে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে ব্যবসায়ীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন কানাডাভিত্তিক মূল্যবান ধাতু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বুলিয়ন মার্টের প্রতিষ্ঠাতা ড. মনিরুজ জামান। তিনি বলেছেন, স্বর্ণের দাম বাড়বে নাকি কমবে, তা নির্ভুলভাবে অনুমান করার চেয়ে বাজারের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকাই ব্যবসায়ীদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গত রোববার (১ নভেম্বর) টরন্টোতে অনুষ্ঠিত ‘টাইম অ্যান্ড শাইন জুয়েলারি ট্রেড শো ২০২৬’-এর বিশেষ অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন অন্টারিওর জ্বালানি ও খনিবিষয়ক মন্ত্রীর পার্লামেন্টারি অ্যাসিস্ট্যান্ট ও স্কারবরো সেন্টারের প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য ডেভিড স্মিথ এবং কানাডায় নিযুক্ত ঘানার হাইকমিশনার অধ্যাপক ডোরা ফ্রান্সিসকা এডু-বুয়ানদোহ। জুয়েলারি ও মূল্যবান ধাতু খাতের ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা এবং শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে আয়োজিত অধিবেশনে ২০২৭ সালের স্বর্ণের বাজারের সম্ভাব্য পরিস্থিতি, মূল্য ওঠানামার ঝুঁকি, স্বর্ণের বিশুদ্ধতা যাচাই, পুরোনো স্বর্ণের অর্থনৈতিক ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। মূল আলোচনায় ড. মনিরুজ জামান বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে স্বর্ণের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। তবে বাজারের গতিবিধি সব সময় সঠিকভাবে অনুমান করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘এক্সপেক্ট দ্য আনএক্সপেক্ট ইন ২০২৭।’ অর্থাৎ ২০২৭ সালে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। ড. মনিরুজ জামান আরও বলেন, সফল জুয়েলারি ব্যবসায়ী তারাই হবেন, যারা প্রতিবার স্বর্ণের দামের সঠিক পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা না করে বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারবেন। তিনি বলেন, স্বর্ণের দাম বাড়তে পারে, আবার কমতেও পারে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের এমন পরিকল্পনা থাকতে হবে, যাতে বাজারের উভয় পরিস্থিতিতেই ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব হয়। জুয়েলারি ব্যবসায় মজুত ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরে ড. জামান বলেন, দোকান বা কারখানায় জমে থাকা ভাঙা চেইন, পুরোনো অলংকার, গ্রাহকদের বিনিময় করা স্বর্ণ এবং অলংকার তৈরির সময় অবশিষ্ট মূল্যবান ধাতু কেবল বাতিল উপকরণ নয়। এগুলো ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ চলতি মূলধন। এসব স্বর্ণ কখন ধরে রাখতে হবে, কখন বিক্রি করতে হবে কিংবা কখন পরিশোধনের মাধ্যমে পুনর্ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। স্বর্ণের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, জুয়েলারি ব্যবসায় প্রতারণা ও ভুল মান নির্ধারণের কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের লেনদেনে বিশুদ্ধতার সামান্য পার্থক্যও উলে¬খযোগ্য আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তিনি এক্স-রে প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষার পাশাপাশি স্বাধীন পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ এবং স্বর্ণের বিশুদ্ধতা নির্ধারণে স্বীকৃত ‘ফায়ার অ্যাসে’ পদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরেন। ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে ড. মনিরুজ জামান পাঁচটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন। এগুলো হলো ব্যবসার আর্থিক হিসাব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা, মজুত স্বর্ণের সঠিক ব্যবস্থাপনা, পুরোনো স্বর্ণকে চলতি মূলধন হিসেবে বিবেচনা করা, স্বর্ণের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকদের সচেতন করা। বক্তব্যের শেষাংশে ড. মনিরুজ জামান বলেন, আগামী বছরের স্বর্ণের বাজার কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে শুধু পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর না করে ব্যবসায়ীদের এমন প্রস্তুতি নিতে হবে, যাতে মূল্যবৃদ্ধি কিংবা দরপতন, উভয় পরিস্থিতিতেই ব্যবসা পরিচালনা করা যায়। তিনি বলেন, স্বর্ণের বাজারে পরিবর্তন আসবেই। সেই পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যবসার সক্ষমতা গড়ে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কানাডা-ঘানার স্বর্ণ বাণিজ্যে সহযোগিতার আহ্বান অনুষ্ঠানে ঘানার হাইকমিশনার অধ্যাপক ডোরা ফ্রান্সিসকা এডু-বুয়ানদোহ কানাডা ও ঘানার মধ্যে স্বর্ণ ও জুয়েলারি খাতে বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, দুই দেশের বিদ্যমান কূটনৈতিক সম্পর্ককে কার্যকর ব্যবসায়িক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে স্বর্ণ পরিশোধন, অলংকার নকশা ও উৎপাদন, প্রযুক্তি বিনিময় এবং দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে কানাডীয় ব্যবসায়ীরা ঘানার সঙ্গে কাজ করতে পারেন। তিনি বলেন, এসব কূটনৈতিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ চিহ্নিত করা, দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। বিশেষ করে অন্টারিওর জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের ঘানার স্বর্ণ খাতে বিনিয়োগ, পরিশোধন কার্যক্রম, অলংকার উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগ অনুসন্ধানের আহ্বান জানান তিনি। ঘানার সরকার ও ঘানা গোল্ড বোর্ডের সঙ্গে কানাডীয় ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ স্থাপনে হাইকমিশন সহযোগিতা করতে আগ্রহী বলেও জানান অধ্যাপক ডোরা ফ্রান্সিসকা এডু-বুয়ানদোহ। অনুষ্ঠানে মূল্যবান ধাতু ও খনিজসম্পদ খাতের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা, নীতিমালা, লাইসেন্সিং এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বিষয়গুলো তুলে ধরেন অন্টারিওর জ্বালানি ও খনিবিষয়ক মন্ত্রীর পার্লামেন্টারি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডেভিড স্মিথ। তিনি স্কারবরো সেন্টার আসনের নির্বাচিত প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য। অনুষ্ঠানে বক্তারা জুয়েলারি ও মূল্যবান ধাতু খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন অংশীদারত্ব তৈরি এবং স্বচ্ছ ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেন। অনুষ্ঠানে কানাডিয়ান জুয়েলার ম্যাগাজিন, সংশ্লিষ্ট জুয়েলারি সংগঠন এবং বুলিয়ন মার্টের ভূমিকার কথাও উঠে আসে।