সানার একটি তেল স্থাপনায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হামলা চালানোর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় পূর্ব অঞ্চলের শহর দহরানে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর একটি প্রশাসনিক ভবনে হামলা চালিয়েছে হুথিরা। সৌদি সরকারি বার্তা সংস্থা এসপিএকে দেওয়া এক বিবৃতিতে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবারের এ হামলায় সৃষ্ট আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনে কর্তৃপক্ষ। ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। মঙ্গলবার দিনের শুরুতে হুথিদের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক সতর্কবার্তায় সৌদির তেল স্থাপনাগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ আখ্যা দিয়ে এগুলোর আশপাশে থাকা সব কর্মচারী ও বেসামরিক লোকজনকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। এর কিছুক্ষণ পরই আরামকোর সদর দপ্তরে এই হামলা চালানো হলো। ইয়েমেনের হুথি নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানার ইয়েমেনি অয়েল কোম্পানির আল-সাবাহ কেন্দ্রীয় স্টেশন থেকে সাধারণ মানুষকে সরে যাওয়ার জন্য সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের আদেশের প্রতিক্রিয়ায় হুথিদের এই হুঁশিয়ারি আসে। জোটের এই আদেশের জবাবে হুথি মুখপাত্র জানান, সানায় যেকোনো ধরনের বিমান হামলা চালানো হলে সৌদি রাজধানী রিয়াদে এর ‘কঠোর ও বেদনাদায়ক’ জবাব দেওয়া হবে। এদিকে এসপিএ জানিয়েছে, রিয়াদ অভিমুখে হুথিদের ছোড়া বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝআকাশেই প্রতিহত করে ধ্বংস করেছে সৌদি আরব। সৌদি সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্রের বরাত দিয়ে এসপিএ জানায়, প্রতিহত করা দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরো নিচে পড়ে চারজন আহত হয়েছেন এবং ১৫টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সানার তেল স্থাপনায় হামলা সৌদি জোটের পক্ষ থেকে খালি করার নির্দেশ দেওয়ার পরপরই সানায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় বলে জানান আল জাজিরার মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধিরা। হুথি সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, সৌদির নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিমান হামলায় রাজধানীর আল-সাবাহ এলাকার একটি তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হুথি কর্মকর্তারা অবশ্য আগেই এই হামলার আশঙ্কা করেছিলেন। তেল কোম্পানিটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের মজুতাগারগুলো আগেই খালি করা হয়েছিল, তাই এই হামলার কারণে সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানি সরবরাহ বা মজুতে কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে ঘাটতির আশঙ্কায় নগরের পেট্রল পাম্পগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। আল জাজিরার প্রতিনিধি ইউসেফ মাওরি বলেন, ‘রাজধানী সানার এই কেন্দ্রীয় তেল স্টেশনে বিমান হামলার পরপরই আমরা বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই।’ তিনি আরও জানান, সৌদি আরব লোহিত সাগরের রাস ঈসা বন্দরেও বিমান হামলা চালিয়ে জ্বালানি তেলের ট্যাংক ধ্বংস করেছে এবং হুথি নিয়ন্ত্রিত হোদাইদাহ প্রদেশের একটি তেল কেন্দ্রে আঘাত হেনেছে। সৌদি জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি অভিযোগ করে বলেন, হুথিরা এই স্থাপনা ও এর ভূগর্ভস্থ জ্বালানি ডিপোকে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করছিল। বিস্ফোরণের ঘটনার পর হুথি মুখপাত্র জানান, ইয়েমেনি যোদ্ধারা সানায় সৌদি জোটের অনুগত বাহিনীর মুখোমুখি লড়াই করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় সারি সতর্ক করে বলেন, সৌদি জোট সানায় আক্রমণ অব্যাহত রাখলে খালি করার নির্দেশ দেওয়া অঞ্চলগুলোতে হামলা চালানো হবে। মঙ্গলবার দহরানের আরামকো সদর দপ্তর, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রিয়াদে অবস্থিত আরামকোর একটি তেল শোধনাগার থেকে সাধারণ মানুষকে অবিলম্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বিমানবন্দরে হামলা গত শনিবার রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালানো হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন, যা বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশটির স্থায়িত্বকে নাড়া দিয়েছে। এরপর রোববার একই বিমানবন্দরে আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে আরও একজন নিহত ও ১১ জন আহত হন। এই প্রাণঘাতী হামলার পর এয়ার ফ্র্যান্স-কেএলএম, এয়ার ইন্ডিয়া, ইতিহাদ, লুফথানসা, ডেল্টা, গালফ এয়ার ও কাতার এয়ারওয়েজসহ বিশ্বখ্যাত বহু আন্তর্জাতিক বিমানসংস্থা সৌদি আরব ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দেওয়া সৌদি আরব মঙ্গলবারও হুথিদের একের পর এক আক্রমণের মুখে পড়ে। রিয়াদের উত্তরাঞ্চলে আরও তিনটি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে জোট বাহিনী। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনার জেরে গত সপ্তাহ থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় বিমান হামলার পর হুথি মুখপাত্র আবার দেশটির অন্যান্য বিমানবন্দরগুলোতে সতর্কবার্তা জারি করেছেন। এসপিএ জানায়, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে হুথিদের এই ক্রমাগত হামলার জন্য তাদের ‘চড়া মাশুল’ দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রতিক্রিয়া মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বক্তব্যে বলেন, হুথিরা ‘খুবই বাজে আচরণ’ করছে। তিনি সাংবাদিকদের জানান, সৌদি আরবের স্বার্থ সুরক্ষায় ইয়েমেন ইস্যুতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানকে হস্তক্ষেপ করার অনুরোধ জানাতে পারেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, আমি বললে প্রেসিডেন্ট এরদোগান এটি করবেন।’ ‘ডন অব ইয়েমেন’ ও লড়াই বৃদ্ধি গত মাসে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু এলাকা হুথিরা দখল করার পর সৌদি আরব নতুন করে হামলা শুরু করে। এর অংশ হিসেবে ইয়েমেন সরকারের পালটা অভিযান ‘ডন অব ইয়েমেন’-এ বিমান সহায়তা দিচ্ছে রিয়াদ। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনী জানায়, মঙ্গলবার দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হুথিদের বিভিন্ন ঘাটি ও সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে একযোগে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তায়েজ গভর্নরেটে মোট নয়টি বিমান হামলা চালানো হয়েছে, যার মধ্যে ডুবাব জেলায় পাঁচটি এবং আল-মাসরাখ জেলায় চারটি হামলা অন্তর্ভুক্ত। ইয়েমেনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গণমাধ্যম কেন্দ্র জানায়, তায়েজের দক্ষিণে আল-শাগাব এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে তীব্র মুখোমুখি লড়াই চলছে। হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশন ‘ইয়েমেনি নেটওয়ার্ক ফর রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডম’ মঙ্গলবার জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় তায়েজে হুথিদের গোলাবর্ষণে পাঁচ বছরের এক শিশুসহ অন্তত পাঁচজন সাধারণ নাগরিক নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত সাতটি ঘরবাড়ি। গত একদিনেই হুথিরা তায়েজজুড়ে ১৮০টির বেশি গোলা নিক্ষেপ করেছে বলে অভিযোগ করেছে সংস্থাটি। হুথিদের অগ্রযাত্রা গত সেপ্টেম্বর মাসে মোখা অভিমুখে আকস্মিক স্থল অভিযান চালিয়ে রণকৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ওই বন্দরনগরী থেকে সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে দেয় হুথিরা। একই মাসে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেয় গোষ্ঠীটি, যার মধ্যে প্রণালিতে অবস্থিত কৌশলগত মায়্যুন দ্বীপও রয়েছে। ইয়েমেনে সংঘাত ক্রমেই মারাত্মক আকার ধারণ করায় রেড ক্রসের আন্তর্জাতিক কমিটির (আইসিআরসি) সভাপতি মিরজানা স্পোলজারিক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সব পক্ষকে যুদ্ধ বিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘ইয়েমেনের এডেন ও সানাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে হু হু করে বাড়ছে মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি ও ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বারবার ধ্বংস হচ্ছে বেসামরিক অবকাঠামো, ঝরছে বিপুল প্রাণ।’ জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ইয়েমেনে অন্তত ৪৬ জন সাধারণ মানুষ নিহত এবং ১৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশ শিশু। এ ছাড়া সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত দুই লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।