মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে চীনের সাম্প্রতিক অগ্রগতি সত্যিই বিস্ময়কর। জটিলতা যত বেশি হোক কিংবা চিকিৎসা যত কঠিন পর্যায়েই পৌঁছাক, আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে চীন অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসার সক্ষমতাকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা একসময় প্রায় অকল্পনীয় ছিল। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক সার্জারি, উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তি, টেলিমেডিসিন ও দূরবর্তী চিকিৎসা-প্রযুক্তির ব্যবহার তাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রযুক্তি এখন শুধু রোগ শনাক্তকরণ বা চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করছে না; অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের মতো অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা প্রক্রিয়াতেও এর ব্যবহার হচ্ছে। রোবোটিক প্রযুক্তির মাধ্যমে চিকিৎসক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিয়ন্ত্রিতভাবে অস্ত্রোপচার করতে পারছেন। একই সঙ্গে এআইনির্ভর বিভিন্ন প্রযুক্তি রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও তথ্যভিত্তিক করে তুলছে। ফলে জটিল চিকিৎসাকেও তুলনামূলকভাবে অধিক নির্ভুল, নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, চীনের প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসাব্যবস্থার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি হলো দূরবর্তী চিকিৎসার সম্ভাবনা। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এক স্থানে অবস্থান করেও অত্যাধুনিক যোগাযোগ ও রোবোটিক প্রযুক্তির সহায়তায় বহু দূরের কোনো রোগীর চিকিৎসা-প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারছেন। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরত্ব চিকিৎসকের দক্ষতা ও প্রযুক্তির মধ্যে আর আগের মতো বড় বাধা হয়ে থাকছে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়; প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তিনি আরও বলেন, মানবকল্যাণের দৃষ্টিকোণ থেকে চিকিৎসায় প্রযুক্তির এই ব্যবহার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ একটি অগ্রগতি। চীনের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখাচ্ছে, গবেষণা, প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামোকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে পারলে একটি দেশের স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। বাংলাদেশের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের দেশেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে অগ্রগতি হচ্ছে এবং অনেক দক্ষ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। কিন্তু উন্নত প্রযুক্তি, আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের আরও বিস্তৃত সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রযুক্তি স্থানান্তর, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ, যৌথ গবেষণা, টেলিমেডিসিন, রোবোটিক সার্জারি এবং আধুনিক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তোলা গেলে বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থাও আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠতে পারে। এদিকে নারায়ণগঞ্জ কলেজের প্রভাষক আরিফ মিহির চীনে তাঁর চিকিৎসার অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন। ২০২৩ সালে সরকারি কাজে চীনের হাংচৌয়ে গিয়েছিলেন। বিদেশের মাটিতে নতুন শহর, নতুন মানুষ, নতুন অভিজ্ঞতা—সবকিছুই ছিল তাঁর কাছে আনন্দের। আরিফ মিহিরের ভাষায়, বিকেলে প্লেন থেকে নামার পর থেকেই হার্নিয়ার ব্যথা বাড়তে লাগল। প্রচণ্ড ব্যথা! হোটেলে পৌঁছে খাওয়া-দাওয়া সেরে আর দেরি করেননি। সেখানকার মেডিকেল সেন্টারে গেলেন। তাঁর অবস্থা দেখে চিকিৎসকেরা এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। বললেন, ‘ইমিডিয়েটলি হাসপাতালে যেতে হবে। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানালেন, তাঁর অবস্থা ভালো নয়। অপারেশন করতেই হবে। কিন্তু বিদেশে গিয়ে হঠাৎ অপারেশন! সাত-আট দিনের সফর শেষে দেশে ফেরার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। তাই আরিফ অনুরোধ করলেন, একটা ইনজেকশন দিন। ব্যথাটা যেন কমে যায়। দেশে ফিরে চিকিৎসা করব। ইনজেকশন দেওয়া হলো। কিছুটা স্বস্তিও পেলেন। কিন্তু রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার শুরু হলো অসহ্য যন্ত্রণা। সকাল হতেই আবার ছুটলেন চিকিৎসকের রুমে। চিকিৎসকদের বক্তব্য এবার আরও স্পষ্ট— অপারেশন করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। আরিফ আর দ্বিধা করলেন না। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কাগজপত্র, দীর্ঘ অপেক্ষা—সব মিলিয়ে অপারেশনের জন্য সময় লাগবে। কিন্তু চীনের হাসপাতালের অভিজ্ঞতা তাঁকে বিস্মিত করল। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরপরই শুরু হলো প্রস্তুতি। একতলা থেকে তাঁকে নেওয়া হলো ১১ তলায়। সেখানে আরও একটি বিষয় তাঁর চোখে পড়ল। বাংলাদেশে এক হাতে স্যালাইন দিতে দেখেছি। চীনে আমাকে দুই হাতে দুইটা স্যালাইন ধরিয়ে দিল! হাসতে হাসতে বলেন তিনি। সকাল আটটার দিকে চিকিৎসক এসে জানালেন, অপারেশন হবে। তবে প্রথমে তাঁরা চেষ্টা করবেন কাটা-ছেঁড়া ছাড়াই ল্যাপারোস্কোপির মাধ্যমে চিকিৎসা করতে। সেটি সম্ভব না হলে ওপেন সার্জারি করা হবে। আরিফ সম্মতি দিলেন। অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার আগে চিকিৎসকের আশ্বস্ত করার কথাটিও আজও তাঁর মনে আছে— ডোন্ট ওরি। অল্প কিছুক্ষণের জন্য তোমাকে ঘুমের রাজ্যে নিয়ে যাচ্ছি। এরপর মুখের সামনে একটি ছোট মাস্ক। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অচেতন হয়ে গেলেন তিনি। জ্ঞান ফিরতেই আরেক বিস্ময়। পাশে তিনজন নার্স—কেউ মাথার কাছে, কেউ পায়ের দিকে, কেউ পাশে বসে তাঁর খোঁজ নিচ্ছেন। নাকে অক্সিজেনের পাইপ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নার্সদের নিবিড় পরিচর্যা। আর সবচেয়ে বড় বিস্ময়, যে জায়গায় হার্নিয়ার ফোলা অংশটি অনুভব করছিলেন, সেটি আর নেই। চিকিৎসকেরা ল্যাপারোস্কোপির মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করে ভেতরে একটি জাল বা ‘নেট’ বসিয়ে দিয়েছেন, যাতে দুর্বল জায়গা দিয়ে আবার মাংসপেশি বেরিয়ে না আসে। তাদের ব্যবহার, আচরণ—সব মিলিয়ে আমি খুবই সন্তুষ্ট। এমন সেবা আমি কল্পনাও করতে পারিনি, বলেন আরিফ। ২০২৩ সালে চীনে করা সেই অস্ত্রোপচারের পর আজও সুস্থ আছেন আরিফ মিহির। তাঁর কাছে চীনের স্বাস্থ্যসেবার স্মৃতি শুধু একটি সফল অপারেশনের গল্প নয়; বরং অসুস্থ অবস্থায় অচেনা মানুষের দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও যত্নের এক গভীর অভিজ্ঞতা। ভাবা যায়! চীনাদের দায়িত্বশীলতা কেমন! আমাদের দেশের হলে কে কার খবর রাখে!—কথার শেষে আরিফের কণ্ঠে মিশে যায় বিস্ময়, কৃতজ্ঞতা আর আবেগ।