রাব্বুলের জোড়া গোলের ঝলকে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা দল। শুক্রবারের (৪ সেপ্টেম্বর) শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে ত্রিশাল উপজেলা দলকে ২–১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নের মুকুট পরেছে তারা। নির্ধারিত ৭০ মিনিটের লড়াইয়ে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠা ম্যাচে ঈশ্বরগঞ্জের হয়ে দুই গোল করেন ১১ নম্বর জার্সিধারী রাব্বুল। ত্রিশাল একটি গোল শোধ করলেও শেষ পর্যন্ত সমতায় ফিরতে পারেনি। ময়মনসিংহ জেলা স্টেডিয়ামে বিকেল ৪টায় শুরু হওয়া ফাইনাল ঘিরে দুপুরের পর থেকেই স্টেডিয়াম এলাকায় বাড়তে থাকে দর্শকদের উপস্থিতি। ম্যাচ শুরুর আগেই গ্যালারির বড় একটি অংশ পূর্ণ হয়ে যায়। বাঁশি বাজার পর দুই দলের সমর্থকদের স্লোগান, করতালি ও উল্লাসে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। শুরু থেকেই ম্যাচে ছিল সমানে সমান লড়াই। ঈশ্বরগঞ্জ ও ত্রিশালের খেলোয়াড়েরা মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। কখনো ঈশ্বরগঞ্জের আক্রমণ, কখনো ত্রিশালের পাল্টা আক্রমণ—প্রতিটি মুহূর্তেই তৈরি হচ্ছিল উত্তেজনা। শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরগঞ্জের আক্রমণভাগের কার্যকর ফিনিশিংই ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয়। ঈশ্বরগঞ্জের ১১ নম্বর জার্সিধারী রাব্বুল ছিলেন ফাইনালের নায়ক। দলের আক্রমণভাগে বারবার ত্রিশালের রক্ষণভাগে চাপ তৈরি করেন তিনি। সুযোগ কাজে লাগিয়ে করেন দুটি গোল। তার জোড়া গোলেই শিরোপার লড়াইয়ে এগিয়ে যায় ঈশ্বরগঞ্জ। ত্রিশালও হাল ছাড়েনি। পিছিয়ে পড়ার পর আক্রমণের ধার বাড়িয়ে একটি গোল শোধ করে তারা। ফলে ম্যাচের শেষ দিকে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। সমতা ফেরাতে মরিয়া হয়ে ওঠে ত্রিশাল, অন্যদিকে ব্যবধান ধরে রাখতে রক্ষণে জমাট হয়ে যায় ঈশ্বরগঞ্জ। শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল না হওয়ায় ২–১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ঈশ্বরগঞ্জ। উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন দলের খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও সমর্থকেরা। ফাইনাল দেখতে বিকেল থেকেই ময়মনসিংহ জেলা স্টেডিয়ামে ভিড় করতে শুরু করেন ক্রীড়াপ্রেমীরা। ম্যাচ শুরু হওয়ার পর কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় গ্যালারি। দুই দলের সমর্থকদের আলাদা আলাদা উল্লাসে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। কেউ প্রিয় দলের পতাকা নিয়ে এসেছেন, কেউবা খেলোয়াড়দের নাম ধরে স্লোগান দিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গ্যালারি থেকে উঠে এসেছে করতালির ঝড়। মাঠের ২২ খেলোয়াড়ের লড়াইয়ের সঙ্গে গ্যালারির দর্শকরাও যেন হয়ে উঠেছিলেন ম্যাচের অংশ। ফাইনাল শেষে বিজয়ী ঈশ্বরগঞ্জ ও রানার্সআপ ত্রিশাল দলের হাতে ট্রফি তুলে দেওয়া হয়। দুই দলের মধ্যে মোট এক লাখ ৫০ হাজার টাকার পুরস্কারও বিতরণ করা হয়। পুরস্কার বিতরণ করেন ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যেও আলো ছড়িয়েছেন কয়েকজন খেলোয়াড়। পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য মারুফ নির্বাচিত হয়েছেন টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড়। সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার পেয়েছেন স্বাধীন। আর ফাইনালে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে ম্যাচসেরার পুরস্কার পেয়েছেন কাইসার। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুর রহমানের সভাপতিত্বে ফাইনাল ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে গেস্ট অফ ওনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনের সংসদ সদস্য ডা. মো. মাহাবুবুর রহমান, ঈশ্বরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ, ফুলবাড়িয়া আসনের সংসদ সদস্য মুহাঃ কামরুল হাসান মিলন, সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান রোকন, জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব এ.কে.এম মাহবুবুল আলম এবং সদস্য এনামুল হক আকন্দ লিটন। এ সময় জেলা ক্রীড়া অফিসার আল আমিন, বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সদস্য হারুন অর রশীদ, শহীদুল আমীন খসরুসহ জেলা প্রশাসন ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ফাইনালে দুই দলের খেলোয়াড়, কোচ, ম্যানেজার, ক্রীড়াপ্রেমী দর্শক ও গণমাধ্যমকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন। শিরোপা জয়ের আনন্দে তখন ঈশ্বরগঞ্জ শিবিরে উৎসবের আমেজ। খেলোয়াড়দের অনেকেই ট্রফি হাতে নিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন। মাঠের লড়াইয়ের পর পুরস্কার মঞ্চেও ফুটে ওঠে তাদের দীর্ঘ প্রতিযোগিতার সাফল্যের আনন্দ। টুর্নামেন্টের সামগ্রিক পারফরম্যান্সেও আলো ছড়িয়েছেন কয়েকজন খেলোয়াড়। পুরো প্রতিযোগিতায় অসাধারণ নৈপুণ্যের স্বীকৃতি হিসেবে রাব্বুল নির্বাচিত হয়েছেন টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড়। অন্যদিকে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার পেয়েছেন স্বাধীন। আর ফাইনালে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে ম্যাচসেরা নির্বাচিত হয়েছেন ফাহাদ। ‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহযোগিতায় গত ২৫ আগস্ট শুরু হয় জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬। এবারের আসরে ময়মনসিংহ সদর উপজেলাসহ জেলার মোট ১৪টি দল অংশ নেয়। উদ্বোধনী ম্যাচে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা ও গৌরীপুর উপজেলা দল মুখোমুখি হয়। শুরু থেকেই প্রতিযোগিতাটি ঘিরে জেলা স্টেডিয়ামে দর্শকদের আগ্রহ দেখা যায়। আয়োজকদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল তরুণদের মাঠমুখী করা এবং খেলাধুলার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি ও সুস্থ বিনোদনের পরিবেশ তৈরি করা। টুর্নামেন্টের উদ্বোধন হয়েছিল ২৫ আগস্ট ময়মনসিংহ জেলা স্টেডিয়ামে। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতায় ১৪টি দল অংশ নেয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও বিপুলসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতি ছিল। ঈশ্বরগঞ্জের জন্য এই শিরোপা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ২০২৫ সালের জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপেও তারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল; সেবার ফাইনালে তারাকান্দাকে ২–০ গোলে হারিয়েছিল দলটি। ঈশ্বরগঞ্জ টানা দুই আসরে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপের চ্যাম্পিয়ন হলো। এটি শুধু একটি টুর্নামেন্টের শিরোপা নয়, স্থানীয় ফুটবলে ঈশ্বরগঞ্জের ধারাবাহিক শক্তিমত্তারও প্রমাণ। এক বছর আগে তারাকান্দাকে হারিয়ে যে দলটি শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছিল, এবার ত্রিশালকে হারিয়ে সেই সাফল্য ধরে রাখল তারা। আর দুই আসরের মাঝখানে বদলেছে প্রতিপক্ষ, বদলেছে ম্যাচের গল্প—কিন্তু বদলায়নি ঈশ্বরগঞ্জের শিরোপার ক্ষুধা। দীর্ঘ প্রতিযোগিতার পর ফাইনালে এসে ত্রিশালের সামনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে নিল ঈশ্বরগঞ্জ। রাব্বুলের জোড়া গোল, সতীর্থদের লড়াকু ফুটবল এবং সমর্থকদের অবিচল সমর্থন—শুক্রবারের সন্ধ্যাটি হয়ে থাকল ঈশ্বরগঞ্জের। শেষ বাঁশির পর যখন ঈশ্বরগঞ্জের খেলোয়াড়েরা ট্রফি হাতে উল্লাসে মাতলেন, তখন তাদের আনন্দে মিশে গেল একটি বাড়তি গর্ব—এটি শুধু একটি ফাইনাল জয় নয়, এটি শিরোপা ধরে রাখার সাফল্য।