সুবাদার ইসলাম খান যখন ১৬১০ সালে ঢাকাকে বাংলার রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন দিল্লি ও লখনৌ থেকে অনেক নামী বাবুর্চি, কারিগর ও মোঘল রাজপুরুষেরা এখানে এসে বসতি স্থাপন করেন। তারা সঙ্গে করে নিয়ে আসেন মোঘলাই রন্ধনশৈলী, যা পরবর্তীতে ঢাকার নিজস্ব আবহাওয়া ও রুচির সঙ্গে মিলেমিশে এক নতুন রূপ লাভ করে পুরান ঢাকা শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা এক অনন্য আহার সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন শহরটির অলিগলিতে জমা হয়ে আছে মোঘল, সুবাধি ও ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রন্ধনশিল্পের ইতিহাস। ঢাকাইয়া খাবারের ঘ্রাণ ও স্বাদ কেবল খিদে মেটায় না, তা মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় এক রাজকীয় অতীতে। সকালের সূর্য ওঠার আগে থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত পুরান ঢাকার বাতাস মশলার সুবাস, ঘিয়ের মৌ মৌ গন্ধ এবং মাংসের ধোঁয়ায় ভারী হয়ে থাকে। এখানকার রান্নাবান্না ও আতিথেয়তার ধরণ পুরোপুরি ভিন্ন, যেখানে প্রতিটি খাবারের রেসিপি বংশপরম্পরায় গোপন ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে সংরক্ষিত হয়ে আসছে। পুরান ঢাকার খাবারের সূচনা মোঘল শাসনামলে। সুবাদার ইসলাম খান যখন ১৬১০ সালে ঢাকাকে বাংলার রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন দিল্লি ও লখনৌ থেকে অনেক নামী বাবুর্চি, কারিগর ও মোঘল রাজপুরুষেরা এখানে এসে বসতি স্থাপন করেন। তারা সঙ্গে করে নিয়ে আসেন মোঘলাই রন্ধনশৈলী, যা পরবর্তীতে ঢাকার নিজস্ব আবহাওয়া ও রুচির সঙ্গে মিলেমিশে এক নতুন রূপ লাভ করে। এই মোঘলাই খাবারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সুগন্ধি মশলা, ঘি, জাফরান, বাদাম এবং ধীর আঁচে মাংশের সিদ্ধকরণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঢাকাইয়া খাবার রাজপ্রাসাদের সীমানা ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ঘর এবং রাস্তার ধারের দোকানে রূপ নেয়। আজ পুরান ঢাকা মানেই মসলাদার বিরিয়ানি, চাপ, কাবাব, বোরহানি এবং ঐতিহ্যবাহী নানা পদের সুস্বাদু এক মহোৎসব। সকালের সূচনাতেই পুরান ঢাকা যেন অন্য এক রূপ ধারণ করে। লালবাগ, চকবাজার বা নাজিমুদ্দিন রোডের গলিগুলোতে ভোর হতেই ছড়িয়ে পড়ে ঘি ও গরম পরোটার ঘ্রাণ। পুরান ঢাকার প্রাতরাশ বা সকালের নাস্তা অন্যান্য এলাকার চেয়ে একদম আলাদা। এখানকার ঐতিহ্যবাহী সকালের খাবার বলতে বোঝায় নরম খাস্তা পরোটা, লুচি এবং তার সঙ্গে দেওয়া হয় ঘন ও মসলাদার নেহারি বা পায়া। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গরুর বা খাসির হাড় ধীর আঁচে ফুটিয়ে এই নেহারি তৈরি করা হয়, যার মধ্যে থাকে মজ্জা বা নেহারির আসল নির্যাস। এছাড়া আটার হালুয়া, ছোলার ডাল, ভাজাপোড়া পরোটা এবং সুস্বাদু মগজ ভূনার মেলবন্ধন সকালের নাস্তাকে করে তোলে জমকালো। সকালের এই ভারী ও রাজকীয় খাবারের পেছনে রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্য, যখন মানুষ কঠিন পরিশ্রম করার আগে পর্যাপ্ত শক্তি সঞ্চয়ের জন্য সকালে এমন রিচফুড গ্রহণ করত। পুরান ঢাকার খাবারের আলোচনা কখনোই বিরিয়ানি ছাড়া সম্পূর্ণ হতে পারে না। এখানকার কাচ্চি বিরিয়ানি এবং মোরগ পোলাও ঢাকাই খাবারের মুকুটমণি। চকবাজার, বংশাল, নাজিরাবাজার কিংবা তাতীবাজারের দিকে পা বাড়ালেই প্রতিটি মোড়ে চোখে পড়বে বিশাল বিশাল তামার ডেকচি। কাচ্চি বিরিয়ানির বিশেষত্ব হলো চাল ও কাঁচা মাংস একসঙ্গে খাসির চর্বি, ঘি, মেওয়া, আলু এবং বিশেষ গোপন মসলা দিয়ে ঢেকে ডেকচির মুখ আটা দিয়ে বন্ধ করে ধীর আঁচে বা দমে রান্না করা হয়। ঢাকাই কাচ্চির প্রতিটি কামড়ে পাওয়া যায় সুগন্ধি খাসির মাংসের তুলতুলে নরম ভাব এবং ঘি-মাখানো আলু ও চালের নিখুঁত সমন্বয়। কাচ্চির পাশাপাশি পুরান ঢাকার মোরগ পোলাও অত্যন্ত জনপ্রিয়, যেখানে খাঁটি দেশি মুরগির সঙ্গে বাসমতি বা সুগন্ধি চিনির গুঁড়া চাল, ঘি এবং মাওয়া ব্যবহার করে একটি মিষ্টি ও মসলাদার সুবাস তৈরি করা হয়। পুরান ঢাকার বিরিয়ানির পাশাপাশি পুরান ঢাকার তেহারিও এক অনন্য বিশ্বকোষ। বিশেষ করে পুরান ঢাকার সরিষার তেলের গরুর তেহারির কোনো তুলনা নেই। নাজিরাবাজারের নান্না মিয়ার তেহারি কিংবা রায়সাহেব বাজারের বিরিয়ানির দোকানগুলোতে ছোট ছোট গরুর মাংসের টুকরো দিয়ে সরিষার তেলে ঝাল ঝাল চালের তেহারি রান্না করা হয়। এই তেহারিতে যে তীব্র ঝাঁঝাল সরিষার তেল এবং কাঁচামরিচের সুবাস থাকে, তা সাধারণ বিরিয়ানি থেকে একে একদম আলাদা করে তোলে। সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী কিন্তু পরম সুস্বাদু আহার হিসেবে তেহারি পুরান ঢাকায় দিনরাত সমানে বিক্রি হয়। পুরান ঢাকার বিরিয়ানি বা তেহারির স্বাদকে পূর্ণতা দেয় ঐতিহ্যবাহী পানীয় বোরহানি ও মাঠা। দই, পুদিনা পাতা, ধনেপাতা, বিট লবণ, সরিষা বাটা এবং বিভিন্ন পাচক মসলা দিয়ে তৈরি বোরহানি কেবল পানীয় নয়, এটি ভারী খাবার দ্রুত হজম করতে সাহায্য করে। বরফকুচি দিয়ে মাটির কাপে পরিবেশন করা এই বোরহানি বা লাবাং পুরান ঢাকার মোঘলাই ভোজের এক অপরিহার্য অংশ। এছাড়া লালবাগের শাহি মাঠা এবং লাচ্ছি পুরো ঢাকায় বিখ্যাত। মিষ্টান্ন ও রিচ খাবারের পর ঠান্ডা মাঠার চুমুক মানুষকে এক অনন্য তৃপ্তি দেয়। দুপুরের রোদ গড়িয়ে বিকেল হতেই পুরান ঢাকার রূপ বদলাতে শুরু করে। বিশেষ করে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে চকবাজার, নাজিরাবাজার এবং বাহাদুর শাহ পার্কের আশপাশের এলাকাগুলো ধোঁয়াটে ও সুবাসিত কাবাবের স্বর্গে পরিণত হয়। রাস্তার ধারে সারি সারি অঙ্গার বা কয়লার উনুন জ্বলে ওঠে। সেখানে কাঠের শিকের গায়ে পেঁচানো থাকে কিমা করা মাংস, যা তৈরি করে সুস্বাদু সিক কাবাব, জালি কাবাব, সুতি কাবাব এবং হাড়ি কাবাব। বিশেষ করে সুতি কাবাবের ঐতিহ্য অত্যন্ত প্রাচীন। সুতো দিয়ে কাঠকয়লার ওপর পেঁচিয়ে ধীর আঁচে পোড়ানো মাংসের এই কাবাব অত্যন্ত রসালো ও তুলতুলে হয়। গরম গরম চাপ, জালি কাবাব এবং তার সঙ্গে রুটি বা নান খাওয়ার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে ভিড় জমায়। সন্ধ্যার নাস্তায় কিংবা মোঘলাই ভোজের মাঝে মগজ ফ্রাই, গরুর চাপ এবং গুড়দা ভাজা পুরান ঢাকার তরুণদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশাল বিশাল চ্যাপ্টা লোহার তাওয়ার ওপর ঘিয়ে ভেজে তৈরি করা হয় গরুর বা খাসির চাপ। সাথে দেওয়া হয় বিশেষ ধরণের চাটনি, শসা ও পেঁয়াজের সালাদ। চাপের মচমচে ভাব এবং ভেতরে মাংসের নরম রসে ভরা অংশটির মোহই আলাদা। নাজিরাবাজারের বিসমিল্লাহ কাবাব বা নবাবপুরের পুরানো দোকানগুলোতে গেলে বোঝা যায় কাবাব প্রস্তুত করা কেবল রান্না নয়, এটি এক ধরনের পরিবেশন শিল্প। কাবাবিয়ারা যেভাবে হাতের নৈপুণ্যে শিকে মাংস গেঁথে তা আগুনে পোড়ান, তা দেখলে যেকোনো ভোজনরসিকের ক্ষুধা বহুগুণ বেড়ে যায়। পুরান ঢাকার ভোজন সংস্কৃতির আরেকটি বিশাল দিক হলো মিষ্টি ও পিঠা-পুলি। বিরিয়ানি বা কাবাব পর্ব শেষ করার পর এখানকার মানুষ মিষ্টি না খেলে ভোজন সম্পূর্ণ হয়েছে বলে মনে করে না। পুরান ঢাকার শাহী জিলিপি, ছানার মিষ্টি, রসমলাই, রাবড়ি এবং কাঁচাগোল্লা বিখ্যাত। বিশেষ করে রমজান মাসে বা বিশেষ উৎসবে তৈরি বিশাল আকৃতির শাহী জিলিপি পুরান ঢাকার এক নিজস্ব ঐতিহ্য। ডালিয়া বা ময়দা দিয়ে তৈরি এই জিলিপি ঘিয়ে ভেজে রসে ডোবানো হয়, যার প্রতিটি প্যাঁচ স্বাদে ভরপুর। এছাড়া সেখানকার গাঢ় দুধের তৈরি রাবড়ি, যা মাটির পাত্রে জমাট বেঁধে পরিবেশন করা হয়, তা মুখে দিলেই মিলিয়ে যায়। শুধু মিষ্টিই নয়, ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার বাকরখানি এখানকার সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কথিত আছে, আগা বাকের ও খনি বেগমের ভালোবাসার গল্প থেকে এই বাকরখানির নামকরণ হয়েছিল। ময়দা, ঘি, চর্বি এবং দুধের বিশেষ খামির তৈরি করে তন্দুরে সেঁকে এই শুকনা বাকরখানি তৈরি করা হয়। পুরান ঢাকার মানুষের কাছে সকালের বা বিকালের চা মানেই বাকরখানি। নিমকপোড়া বাকরখানি, মিষ্টি বাকরখানি, পনির বাকরখানি কিংবা কিমা বাকরখানি—প্রতিটি ধরণের আলাদা ভক্ত রয়েছে। পুরান ঢাকার গলিগুলোতে হাঁটলেই দেখা যায় ছোট ছোট তন্দুর চুলার পাশে কারিগরেরা পরম দক্ষতায় বাকরখানি বানিয়ে তা কয়লার আগুনে সেঁকছেন। রমজান মাস এলেই পুরান ঢাকার আহার সংস্কৃতি এক অলৌকিক ও জমকালো রূপ লাভ করে। চকবাজারের ইফতারি বাজার পুরো উপমহাদেশেই এক নামে পরিচিত। ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভইরা নিয়া যায়’ নামক সুপরিচিত ও ঐতিহাসিক ইফতার পদটি রমজানের পুরান ঢাকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। খাসির কলিজা, মগজ, সুতি কাবাব, ডিম, চিড়া, ডাল, ঘি এবং বহুবিধ গোপন মসলা একসঙ্গে হাত দিয়ে চটকে ঠোঙায় করে এই খাবার বিক্রি করা হয়। এছাড়া শাহী জিলিপি, আস্ত খাসির রোস্ট, সুতি কাবাব, পেস্তা বাদামের শরবত, পনিরের সমুচা এবং নানাবিধ ফলমূল দিয়ে চকবাজারের রাস্তাগুলো পরিণত হয় এক বিরাট ভোজনমেলায়। রমজানের বিকেলে চকবাজারের অলিগলিতে মানুষের ঢল নামে কেবল এই শাহী ইফতারির স্বাদ নিতে। পুরান ঢাকার খাবারের ঐতিহ্য কিন্তু কেবল রেস্তোরাঁকেন্দ্রিক নয়, এটি ওখানকার পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাব যুক্ত। এখানকার বিয়ে, আকিকা, খাৎনা বা যেকোনো সামাজিক উৎসবে রান্নার জন্য ডাক পড়ে ঐতিহ্যবাহী বাবুর্চিদের। রাজ্জাক বাবুর্চি বা মাতাব্বারের মতো নামী বাবুর্চি পরিবারগুলো বংশপরম্পরায় এই মোঘলাই রান্নার ধারা টিকিয়ে রেখেছে। তারা তন্দুর ও কাঠের আগুনে বিশালাকার তামার ডেকচিতে যেভাবে একসঙ্গে শত শত মানুষের বিরিয়ানি বা জর্দা রান্না করেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ঢাকার বিয়ের বিরিয়ানি, জর্দা, ফিরনি এবং খাসির রেজালার স্বাদ সাধারণ যেকোনো হোটেলের খাবারের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও রাজকীয়। পুরান ঢাকার প্রতিটি গলিরই নিজস্ব কিছু বিখ্যাত খাবার এবং খাবারের ব্র্যান্ড রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নাজিরাবাজার মানেই হাজীর বিরিয়ানি, বিসমিল্লাহর চাপ এবং বিউটি লচ্ছির ডেরা। আবার লালবাগ মানেই শাহি মাঠা ও বিরিয়ানি। তাতীবাজার ও শাঁখারীবাজার এলাকা আবার তাদের মিষ্টি এবং নিরামিষের জন্য বিখ্যাত। শাঁখারীবাজারের ভেজিটেরিয়ান খাবার, যেমন ডালপুরি, কচুরি, আলু কষা এবং মিষ্টির দোকানগুলো শত বছর ধরে তাদের আলাদা ঐতিহ্য বজায় রেখেছে। সেখানকার জিলিপি ও ঐতিহ্যবাহী ছানার মিষ্টির স্বাদ মোঘলাই মাংসের ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রশান্তি দেয়। খাবারের পাশাপাশি পুরান ঢাকার পান সংস্কৃতির কথা না বললে এই লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ভরপেট বিরিয়ানি বা কাবাব খাওয়ার পর এক খিল পান মুখে দেওয়া ঢাকাইয়াদের পুরোনো অভ্যাস। সাধারণ পান নয়, এখানকার পান হতে হবে বিশেষ সাজের। শাহি পান, সাঁচি পান, মিষ্টি পান কিংবা জর্দা পানের দোকানগুলোতে রাত অবধি ভিড় লেগে থাকে। সুপারি, চুন, লবঙ্গ, এলাচ, জর্দা, মিষ্টি মশলা, নারিকেলের গুঁড়ো এবং কখনও কখনও খাঁটি সোনার বা রূপার পাতলা তবক দিয়ে সাজানো হয় এই পান। পানের এই মিষ্টি সুবাস এবং চিবোনোর ঐতিহ্য ঢাকাইয়া আতিথেয়তারই এক চমৎকার বহিঃপ্রকাশ। আধুনিকতার ছোঁয়ায় পুরো ঢাকা শহর যখন ফাস্টফুড, ক্যাফে এবং আন্তর্জাতিক খাবারের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে, তখনো পুরান ঢাকা নিজের শেকড় ও ঐতিহ্যকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। এখানে পি পিৎজা বা বার্গারের দোকান থাকলেও মানুষ দিনশেষে হাজীর বিরিয়ানি, নান্নার তেহারি কিংবা বিসমিল্লাহর কাবাবের দিকেই ছুটে যায়। পুরান ঢাকার বাবুর্চিরা এখনো আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতি বা রেডিমেড মসলার ওপর নির্ভর করেন না। তারা হাত দিয়ে মেপে, নিজস্ব প্রক্রিয়ায় কাঠকয়লা ও তন্দুরের আগুনে ঐতিহ্য ধরে রেখে রান্না করেন। এই নিষ্ঠা ও বিশুদ্ধতাই পুরান ঢাকাকে খাবারের রাজধানী হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে। পুরান ঢাকার খাবারের আবেদন শুধু ঢাকাবাসীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তা আন্তর্জাতিকভাবেও পরিচিত লাভ করেছে। বিদেশ থেকে আগত পর্যটকরা বাংলাদেশে এলে পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার বা চকবাজারে ঢুঁ মারাকে অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করেন। বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ফুড ব্লগাররা পুরান ঢাকার খাবারের স্বাদ ও তৈরির প্রক্রিয়া দেখে মুগ্ধ হন। এর কারণ হলো, এখানকার খাবার কেবল ক্ষুধা মেটায় না, এটি একটি সংস্কৃতি ও প্রাচীন ইতিহাসের গল্প বলে। একটি ডেকচির ঢাকনা খুললেই যে ধোঁয়া ও সুবাস বের হয়, তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে চারশত বছরের পুরনো ঢাকা শহরের ইতিহাস। পুরান ঢাকার ভোজনরসিক মানুষের মন ও রূপ বিশাল। এখানকার রন্ধনশিল্পের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হলো ঢাকার মানুষের মেহমানদারির মানসিকতা। তারা নিজেরা যেমন খেতে ভালোবাসেন, তেমনি অন্যকে খাইয়ে আনন্দ পান। ঢাকাইয়াদের কাছে খাবার কেবল বেঁচে থাকার প্রয়োজন নয়, এটি জীবনের উৎসব ও আনন্দের প্রধান মাধ্যম। যেকোনো আনন্দঘন মুহূর্তে, ঈদের উৎসবে বা পারিবারিক মিলনমেলায় পুরান ঢাকার প্রতিটি ঘরে ঘরে তৈরি হয় শাহী সব আয়োজন। খাবারের এই প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্য পুরান ঢাকাকে পুরো উপমহাদেশের মধ্যে এক অনন্য ও গৌরবময় স্থান এনে দিয়েছে। পরিশেষে বলা যায়, পুরান ঢাকা হলো স্বাদের এক জাদুকরী শহর। বুড়িগঙ্গার সমীরণে যেমন ইতিহাস ভেসে বেড়ায়, তেমনি পুরান ঢাকার বাতাসে ভেসে বেড়ায় ঘি, মসলা ও রান্নার এক সম্মোহনী সুবাস। নেহারি থেকে শুরু করে বিরিয়ানি, কাবাব, বাকরখানি, রাবড়ি কিংবা পান—প্রতিটি পদের পেছনে রয়েছে নিষ্ঠা, ঐতিহ্য এবং বংশানুক্রমিক ভালোবাসা। সময়ের পরিবর্তন হলেও পুরান ঢাকার এই ভোজন ঐতিহ্য ম্লান হয়নি, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে এটি আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। যত দিন ঢাকা শহর থাকবে, তত দিন পুরান ঢাকার এই শাহী আহারের ঐতিহ্য বাংলা ও বাঙালির গর্ব হয়ে টিকে থাকবে।