প্রকাশ :: ... | ... | ...

গতি ফিরছে শিল্প উৎপাদনে


সংযুক্ত ছবি

“গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া বা সরবরাহ বন্ধ থাকার সময়ে উৎপাদন সচল রাখতে জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়েছে। এতে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যবস্থাপনাতেও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে” — শহীদ রেজা শিমুল, চেয়ারম্যান, রেজা গ্রুপ “চলমান সংকট দ্রুত কেটে যাবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানি তেলের দাম আবারও সমন্বয় করে আগের পর্যায়ে বা তার চেয়েও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে” — অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতিতে দেশের শিল্পকারখানায় আবারও উৎপাদনের গতি ফিরতে শুরু করেছে। গত কয়েক মাসে গ্যাস সংকটে যে উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা পুষিয়ে নিতে উদ্যোক্তারা বাড়তি কর্মঘণ্টা ও ছুটির দিনে উৎপাদনসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। সচল রাখা হচ্ছে শিল্প কারখানার উৎপাদন। ফলে সংকটের ধাক্কা সামলে শিল্পকারখানাগুলো ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক উৎপাদনের ধারায় ফিরছে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের চাপ ও সরবরাহে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হওয়ায় গ্যাসনির্ভর শিল্পে স্বস্তি ফিরছে। এতে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে সংকটের সময়ে তৈরি হওয়া ঘাটতি দ্রুত কাটিয়ে উঠতে অনেক কারখানায় এখন নিয়মিত সময়ের বাইরেও অতিরিক্ত উৎপাদন চালানো হচ্ছে। এদিকে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলছেন, চলমান সংকট দ্রুত কেটে যাবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানি তেলের দাম আবারও সমন্বয় করে আগের পর্যায়ে বা তার চেয়েও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। শিল্পোদ্যোক্তাদের কথা বিবেচনায় রেখেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশে বর্তমানে দৈনিক মোট গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ থেকে ৩৮৬০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে মোট সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২৫৮ থেকে ২৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে দৈনিক সামগ্রিক গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১২২ থেকে ১২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০-৩৮৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে মোট সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২৫৮-২৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে ঘাটতি প্রায় ১২২-১২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (চাহিদার প্রায় ৩২%) দেশীয় ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১,৬০৫-১,৬১০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি। আমদানি ও সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৯৮০-৯৮৩ মিলিয়ন ঘনফুট। সংকটময় সময়ের পর সম্প্রতি এলএনজি আমদানি ও সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় শিল্প খাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা উন্নতি হয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, গত চার মাসে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। তবে সামগ্রিকভাবে দেশজুড়ে গ্যাসের যে সামগ্রিক ঘাটতি রয়েছে, তার পূর্ণ সমাধান এখনো হয়নি এবং বিভিন্ন কারখানায় মাঝেমধ্যে গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকারের পরিকল্পনায় কাজ করছে পেট্রোবাংলা। শিল্পোদ্যোক্তা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রভাব পড়েছিল দেশের শিল্প, কৃষি ও জনজীবনে। বিশেষ করে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের বাড়তি জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয়ও বহন করতে হয়েছে। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় পোশাক ও টেক্সটাইল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রেজা গ্রুপের চেয়ারম্যান শহীদ রেজা শিমুল বলেন, বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় উৎপাদন পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। গ্যাসের চাপ কম থাকা ও সরবরাহে বিঘ্নের কারণে যে উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে শিল্পোদ্যোক্তারা এখন নানা উদ্যোগ নিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, উৎপাদন ঘাটতি পুষিয়ে নিতে কারখানায় প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করানো হচ্ছে। পাশাপাশি শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও উৎপাদন চালু রাখা হচ্ছে। এভাবে বাড়তি উৎপাদনের মাধ্যমে গ্যাস সংকটের সময়ে তৈরি হওয়া ঘাটতি যতটা সম্ভব পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। রেজা গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া বা সরবরাহ বন্ধ থাকার সময়ে উৎপাদন সচল রাখতে জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়েছে। এতে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যবস্থাপনাতেও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। এখন গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় সেই বাড়তি চাপও কমে আসছে। দেশ গ্রুপ অব কোম্পানিজের পরিচালক ও বিজিএমইএর সহসভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান বলেন, এখন আমাদের উৎপাদন পরিস্থিতি খুব ভালো। সরকার ও ব্যবসায়ীসহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গ্যাস সংকট কাটিয়ে কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক করতে পেরেছি। এদিকে, বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি এস এম ফজলুল হক বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে অতীতে অনেক শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হলেও বর্তমানে গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় কারখানাগুলোতে উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক ভালো হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববাজারে তেল ও জ্বালানি সংকটের কারণে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক রাখা কঠিন হলেও, সরকার বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন খাতে স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে কাজ করছে। সরকার ও শিল্প মালিকদের যৌথ প্রচেষ্টায় অল্প সময়ের মধ্যেই শিল্প খাতে উৎপাদন পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। শিল্প-কারখানা সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ পরিস্থিতির বর্তমান উন্নতি অব্যাহত থাকলে শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন আরও বাড়বে। একই সঙ্গে সংকটের সময়ে তৈরি হওয়া উৎপাদন ঘাটতিও ধীরে ধীরে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। সরকার ও শিল্প মালিকদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অল্প সময়ের মধ্যেই শিল্প খাতে স্বাভাবিক উৎপাদন পরিবেশ পুরোপুরি ফিরে আসবে বলে আশা করছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, চলমান সংকট দ্রুত কেটে যাবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানি তেলের দাম আবারও সমন্বয় করে আগের পর্যায়ে বা তার চেয়েও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। শিল্পোদ্যোক্তাদের কথা বিবেচনায় রেখেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক রাখা হয়েছে।