প্রকাশ :: ... | ... | ...

ঘুষের খনি লালবাগের হোল্ডিং ট্যাক্স ও ভূমি অফিস!


সংযুক্ত ছবি

* ছয় মাসেও মেলেনি জমির সীামান নির্ধারণ-নামজারি পত্র * বৈধ কাজেও দাবি করা হয় লাখ-লাখ টাকার উৎকোচ * ঘুষসহ দুদকের হাতে ধরা সার্ভেয়ার আসাদুল * ডিএসসিসির অঞ্চল-৩ এ হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে চলছে প্রকাশ্যে ঘুষগ্রহণ প্রশাসনের তদারকির অভাবে দেশের অধিকাংশ ভূমি অফিসেই চলছে অবৈধ আর্থিক লেনদেন। শুধু তাই নয়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক অফিসগুলোতেও রাজস্ব আদায়ে প্রকাশ্যে চলছে মোটা অংকের ঘুষবাণিজ্য। এতে সেবাপ্রত্যাশীরা ওইসব চক্রের কবলে পড়ে একদিকে যেমন প্রতারিত হচ্ছেন, অন্যদিকে আর্থিকভাবেও ক্ষতির মুখে পড়ছেন। রাজস্ব আদায়ে অনিয়ম রোধে অনলাইন কার্যক্রম চালু হলেও অজ্ঞাত কারণে অধিকাংশ সময়ই সার্ভার ডাউন বা নেট না থাকার অজুহাত তুলে ধরা হচ্ছে। এতে নিয়মিত সাধারণ গ্রাহকরাও স্বাচ্ছন্দে সরকার নির্ধারিত ফি প্রদান করতে পারছেন না। কেউ অনলাইনে সরকার নির্ধারিত ফি অনলাইনে পেমেন্ট করলেও ওই ফাইলে সই আনতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন হরহামেশা। অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নানা কৌশলে ভুল বা কাগজপত্র সঠিক নয় উল্লেখ করে সই না দিয়েই সেবাপ্রত্যাশী নগরবাসীকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। আবার কখনও কখনও নিজস্ব নিয়োজিত দালালের মাধ্যমে মোটা অংকের ঘুষবাণিজ্যের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে কাজ করে দিচ্ছেন ঘুষকাণ্ডে জড়িত কর্মকর্তারা। এভাবেই চলছে ডিএনসিসি-ডিএসসিসি’র আঞ্চলিক অফিসসহ ভূমি অফিস। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কামরাঙ্গীরচরের বাসিন্দা মনির হোসেন। তিনি বলেন, বড়গ্রাম এলাকায় তার একখন্ড জমির ওপর সম্প্রতি ৬ তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। জমি কেনার পর থেকেই তিনি নিয়মিতভাবে ডিএসসিসি’র অঞ্চল-৩ এর পিলখানা রোডের ২ নম্বর গেট সংলগ্ন বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স অফিসে গিয়ে বাড়ির রাজস্ব দিয়ে আসছিলেন। তবে অফিসের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের নানা প্রশ্নের মুখে পড়েন। তারা তাকে জানায়, বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স বছরে লাখ টাকার ওপরে আসবে। তবে এটা কমানোর সুযোগও রয়েছে। যদি রাজি হন, তাহলে তার নিয়োজিত দালালের সঙ্গে তাকে কথা বলতে বলেন। রেভিনিউ সুপারভাইজার (বাহাতি) জাহেদুর রহমান জাহিদ ওরফে জাহিদুল ইসলাম জহির তাকে জানান, এক লাখ টাকা ঘুষ দিলে তার বাৎসরিক হোল্ডিং ট্যাক্স কমিয়ে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকায় করে দেওয়া সম্ভভ হবে। এরপর তিনি নিরুপায় হয়ে দেনদরবারের মাধ্যমে ৮০ হাজারে সেই ঘুষের টাকা পরিশোধ করে নিজের কাজ বাগিয়ে নেন। তবে এ বিষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। শুধু বলেন, এই চোরের দেশে সরকারি চাকরিজীবিরা আর ভালো হবে না, তাদের বেতন বাড়লেও ঘুষ খাওয়া কমেনি। এগুলো রুখবে কে? ওনাদের কর্মকাণ্ড দেখবে কে? বরং অভিযোগ দিতে গেলে উল্টো আরও ফাঁদে পড়তে হবে। এই হলো দেশের সরকারি অফিসের হালচাল। এদিকে, জমির সীমানা নির্ধারণ ও নামজারি করে দেওয়ার জন্য এক লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার সময় ঢাকার লালবাগ রাজস্ব সার্কেলের সার্ভেয়ার মোহাম্মদ আসাদুল ইসলামকে হাতেনাতে আটক করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঘুষসহ আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম। তিনি বলেন, আটক সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে ৮০ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ ছিল। আজ অভিযানে এক লাখ টাকা ঘুষসহ ওই সার্ভেয়ারকে আটক করা হয়েছে। দুদক সূত্রে জানা যায়, অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক মো. মনিরুল ইসলাম ঢাকা জেলার লালবাগ থানাধীন চর-কামরাঙ্গী মৌজার বিভিন্ন দাগে অবস্থিত মোট ২৮২ শতাংশ জমির মালিকদের কাছ থেকে নিবন্ধিত অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি গ্রহণ করেন। ওই জমির সীমানা নির্ধারণ, সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তির সীমানা পৃথকীকরণ এবং স্কেচম্যাপ প্রস্তুতের জন্য গত ২৭ এপ্রিল ঢাকা জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেন তিনি। পরে প্রায় ছয় মাস ধরে লালবাগ রাজস্ব সার্কেলে একাধিকবার যোগাযোগ করেও জমির সীমানা নির্ধারণের কাজ সম্পন্ন করতে পারেননি মনিরুল ইসলাম। একপর্যায়ে তাকে ওই কার্যালয়ের সার্ভেয়ার মোহাম্মদ আসাদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। দুদক জানায়, অভিযোগ অনুযায়ী, জমির সীমানা নির্ধারণ ও নামজারি সম্পন্ন করে দেয়ার বিনিময়ে সার্ভেয়ার আসাদুল ইসলাম ৮০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। পরে অভিযোগকারী বিষয়টি দুদককে অবহিত করেন এবং ঘুষ দাবির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে হাতেনাতে আটক করার জন্য ফাঁদ অভিযান পরিচালনার অনুরোধ জানান। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দুদকের ঢাকা-১ জেলা কার্যালয়ের একটি বিশেষ দল গতকাল পরিকল্পিত ফাঁদ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের একপর্যায়ে এক লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের সময় সার্ভেয়ার মোহাম্মদ আসাদুল ইসলামকে হাতেনাতে আটক করা হয়। দুদক জানায়, আটক সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে কমিশনের ঢাকা-১ জেলা কার্যালয়ে মামলা দায়ের এবং তাকে আদালতে সোপর্দ করার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া আরও অন্যান্য সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে কোনো সেবাপ্রত্যাশীরা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা দালালের মাধ্যমে অহেতুক হয়রানি, অবৈধ লেনদেনের শিকার হয়ে থাকেন, এমন অভিযোগ পেলে অবশ্যই গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারির বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে প্রস্তুত রয়েছে দুদক।