প্রকাশ :: ... | ... | ...

জলবায়ু ঝুঁকি নিয়েই এখনও  বসবাস করছেন উপকূলবাসী


সংযুক্ত ছবি

অর্থের অভাবে নয়, জীবিকা-পৈত্রিক ভিটার টানে বসবাস গত ৫০ বছরে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে ১৬৭টি প্রাণহানি ৭ লাখ ১৮ হাজার, বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা বেড়েছে লাখ লাখ অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি ৩৫ হাজার কোটি টাকা “জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকা মানেই মানুষের অসহায়তা নয়; স্থানান্তর কিংবা থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে জীবিকা, সামাজিক সম্পর্ক, স্থান-পরিচয় ও ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষার সমন্বিত ফল হিসেবে দেখতে হবে” — সহযোগী অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ মল্লিক, আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ “উপকূলীয় অঞ্চলে থেকে যাওয়া মানেই নিরাপদ থাকা নয়। বারবার দুর্যোগে সম্পদ, সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা কমে যেতে পারে। আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কতার পাশাপাশি মানুষের ভবিষ্যৎ বেছে নেয়ার সুযোগকেও গুরুত্ব দিতে হবে” — মো. নাসিফ আহসান, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, খুবি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ ব্যাপকভাবে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এমন ধারণা প্রচলিত থাকলেও বাস্তবতা আরও জটিল। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার মতো ঝুঁকির মধ্যেও অনেক মানুষ নিজেদের বসতভিটায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তবে জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যেই এখনও বসবাস করছেন উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ পরিবার। সরকারের তরফ থেকে বারবার তাদের নিরাপদে সরে যেতে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, সতর্কবার্তা বা পূনর্বাসনে সুযোগ দিলেও স্বেচ্ছায় কেউ অন্যত্র যেতে চাইছেন না। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, গত ৫০ বছরে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙনসহ দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েে ছ ১৬৭টি। এতে প্রাণহানির ঘটেছে ৭ লাখ ১৮ হাজার। বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা বেড়েছে লাখ লাখ। লাখ লাখ হেক্টর ফসলি জমি নষ্টসহ অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। গবেষকরা বলছেন, এর পেছনে শুধু অর্থের অভাব নয়; ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক, জীবিকা, সামাজিক বন্ধন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের প্রত্যাশাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাদের আশঙ্কা, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১১% ভূখণ্ড প্লাবিত হতে পারে, যার ফলে প্রতি ৭ জনের মধ্যে ১ জন মানুষ জলবায়ু শরণার্থীর শিকার হতে পারেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে গত ৫০ বছরে প্রলয়ঙ্কারী ও সাধারণ মিলিয়ে অসংখ্য ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হেনেছে। যার মধ্যে ১৯৬০ থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ছোট-বড় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও কালবৈশাখীর সংখ্যা ১৬৭টিরও বেশি। কেবল বিগত এক শতাব্দীতে (১০০ বছরে) ৫৮টি প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় এবং ৫০ বছরে ৫৩টি বড় ধরনের বন্যা দেশকে বিপর্যস্ত করেছে। বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার উন্নতির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে প্রাণহানি ব্যাপকভাবে হ্রাস পেলেও ঐতিহাসিকভাবে এটি অত্যন্ত ভয়াবহ। তবে বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। জানা যায়, গত ৫০ বছরে কেবল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাতেই বাংলাদেশে প্রায় ৭ লাখ ১৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। স্মরণকালের ভয়াবহতম দুর্যোগসমূহের মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ও ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি ছিল ১৯৭০ সালের ‘ভোলা ঘূর্ণিঝড়’। ওই ঘূর্ণীঝড়ে প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ নিহত হন। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে প্রাণ হারান ৪ হাজার ২৩৪ জন মানুষ। সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়সমূহের মধ্যে আম্পান, মোখা, রেমাল ছিল আরেক আতঙ্ক। সরকার ও বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর ব্যাপক তৎপরতায় এগুলোতে উন্নত আশ্রয়কেন্দ্র ও দ্রুত স্থানান্তরের কারণে প্রাণহানি ২০ থেকে ৩০ জনের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা বেড়েছে লাখ লাখ। প্রতি বছর গড়ে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশের বেশি মানুষ সরাসরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় আইলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হেনেছিল। ২০০৯ সালের ২৫ মে এটি উপকূলে তাণ্ডব চালায়। ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের প্রধান অঞ্চলসমূহ হচ্ছে- খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা ও বরিশাল। বিশেষ করে সুন্দরবন ও উপকূলীয় জেলাগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় অঞ্চল এবং কলকাতায়ও আঘাত হানে ঘূর্ণীঝড় আইলা। তবে বাংলাদেশে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি ঢুকে বহু পরিবার দীর্ঘদিন বাঁধের ওপর আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেও তাদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে যাননি। গবেষকদের ভাষায়, স্থানটির সঙ্গে মানুষের এক ধরনের ‘টান’ তৈরি হয়েছে, যা সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভবিষ্যৎ-আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক দিয়ে গড়ে উঠেছে। ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৭ লাখ মানুষ সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, শুধুমাত্র ২০২৪ সালের মে থেকে আগস্ট মাসের মধ্যবর্তী সময়ের দুর্যোগগুলোতে (যেমন- ঘূর্ণিঝড় রেমাল ও আকস্মিক বন্যা) দেশের ২৯টি জেলার প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা) সমমূল্যের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্রতিটি বড় ঘূর্ণিঝড়ে লাখ লাখ হেক্টর ফসলি জমি ও চিংড়ি ঘের পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় রেমালের কারণে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৪১ হাজার ২০০ কোটি টাকার ওপর আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে গবেষণা চালিয়েছে দেশি-বিদের্শ বিভিন্ন সংস্থার গবেষক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকগণ। তাদের গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় এই সম্পর্ককে চার ভাগে দেখা হয়েছে। এসব হচ্ছে স্থানভিত্তিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও আকাঙ্ক্ষাভিত্তিক। নিজের গ্রাম, পরিবার ও পরিচিত পরিবেশের প্রতি টান যেমন মানুষকে ধরে রাখে, তেমনি গবাদিপশু, জমি, কাজ ও প্রতিবেশীদের সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, বাঁধ মেরামত ও পারস্পরিক সহযোগিতার মতো স্থানীয় উদ্যোগও মানুষের নিজ এলাকায় থেকে যাওয়ার সক্ষমতা ও ইচ্ছা বাড়ায়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক নেদারল্যান্সের বিখ্যাত উট্রেচট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ মল্লিক বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজন ও পরিবেশগত অভিবাসন নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন। তার গবেষণার মূল বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বলা যায়, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকা মানেই মানুষের অসহায়তা নয়; স্থানান্তর কিংবা থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে জীবিকা, সামাজিক সম্পর্ক, স্থান-পরিচয় ও ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষার সমন্বিত ফল হিসেবে দেখতে হবে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. নাসিফ আহসানও উপকূলীয় বাংলাদেশে জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যেও মানুষের স্বেচ্ছায় স্থানান্তর না করার কারণ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার গবেষণায় দেখা যায়, পরিবেশগত ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মানুষের থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে শুধু বাধ্যতামূলক অবস্থান হিসেবে দেখা যায় না; এর পেছনে একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করে। তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন, থেকে যাওয়া মানেই নিরাপদ থাকা নয়। বারবার দুর্যোগে সম্পদ, সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা কমে যেতে পারে। তাই জলবায়ু অভিযোজন নীতিতে শুধু বাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র ও আগাম সতর্কতার পাশাপাশি জীবিকা, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সক্ষমতা এবং মানুষের নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেয়ার সুযোগকেও গুরুত্ব দিতে হবে। গবেষকদের আশঙ্কা, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১১% ভূখণ্ড প্লাবিত হতে পারে, যার ফলে প্রতি ৭ জনের মধ্যে ১ জন মানুষ জলবায়ু শরণার্থীর শিকার হতে পারেন।