প্রকাশ :: ... | ... | ...

থমথমে মিরপুর-গাজীপুর, অস্থির সাভার-আশুলিয়া


সংযুক্ত ছবি

* নারায়ণগঞ্জে পুলিশি তৎপরতায় রাস্তায় নামতে পারেনি শ্রমিকেরা * সড়ক অবরোধের চেষ্টা, বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, শতাধিক কারখানা বন্ধ * শিল্পাঞ্চলঘিরে ২৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন, মাঠে রয়েছে এসআরবি ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে গত কয়েকদিনের চলমান আন্দোলন ঘিরে এখনও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক অসন্তোষ রেেয়ছে। সরকারের মজুরি বোর্ডের আশ্বাসে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের অনেক পোশাক কারকানার শ্রমিকেরা কাজে যোগদান করেছেন। তবে শ্রমিকদের বিক্ষোভে চরম অস্তির হয়ে উঠেছে সাভার-আশুলিয়া ও হেমায়েতপুর। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সশস্ত্র ও সতর্ক প্রহরায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে রাজধানীর মিরপুর-পল্লবী ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল এলাকা। মহাসড়ক-সড়কে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ, বিজিবি, এসআরবি, আনসার প্লাটুনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার ১০ সহস্রাধিক সদস্য। একই সঙ্গে আন্দোলন দমনে বিভিন্ন সড়কে দফায় দফায় মিছিল করেছে বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। এর ফলে ষষ্ঠ দিনের মতো রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের জেলাগুলোর কোথাও কোনো আন্দোলনকারীর উপস্থিতি দেখা যায়নি। তবে দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে অস্থিরতা তৈরি হয় সাভার-আশুলিয়া ও হেমায়েতপুরের শিল্পাঞ্চল এলাকা। এ সময় বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা সড়ক অবরোধ করে যানবাহন চলাচলে বাধা দেয়। এ সময় পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এদিকে গাজীপুরে শ্রমিকরা আবারও সড়কে নেমে বিক্ষোভ-অবরোধ করার চেষ্টা চালিয়েছে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরে মালিকপক্ষ অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অন্তত ৭০টি কারখানা বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বেতন বাড়ানোর দাবিতে চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। পরে সরকারের আশ্বাসে তারা যার যার কাজে ফিরে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়। মিরপুর টানা ষষ্ঠ দিনের মতো গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের বড় কোনো নতুন সড়ক অবরোধ বা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়নি। তবে আগের কয়েকদিনের টানা আন্দোলন, সংঘাত ও পুলিশের ওপর হামলার জের ধরে মিরপুরজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কড়া সতর্কাবস্থানে রয়েছে। গতকাল সকাল থেকেই মিরপুর-১০, ১১, ১২ ও ১৪ নম্বর এলাকা এবং কাফরুল-কচুক্ষেতের প্রধান সড়কগুলোতে শ্রমিকদের তেমন কোনো বড় জমায়েত বা সড়ক অবরোধের খবর পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ পোশাক কারখানা বন্ধ রয়েছে কিংবা শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন অথবা কাজে আসেননি। ফলে মিরপুরের অভ্যন্তরীণ ও প্রধান সড়কগুলোতে যান চলাচল মূলত স্বাভাবিক রয়েছে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গত কয়েকদিনের টানা সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর গতকাল বৃহস্পতিবার মিরপুরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ, র‌্যাব ও যৌথ বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্কাবস্থানে থেকে নিয়মিত টহল দিচ্ছেন এবং কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে মাইকিং করছেন। পুলিশের ওপর হামলা, মারধর ও নাশকতার ঘটনায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মিরপুরের শ্রমিক আন্দোলন ও সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের বা কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীও রয়েছেন। ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গত ৩১ অক্টোবর থেকে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় পোশাকশ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরবর্তী কয়েকদিনে (রোববার, সোমবার ও মঙ্গলবার) এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সড়ক অবরোধ, পুলিশের গাড়িতে আগুন ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। তবে গত বুধবার ও গতকাল বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি অনেকটাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বলেন, সকাল থেকে মিরপুর-১১ নম্বর ও শিয়ালবাড়ী এলাকায় কয়েকবার শ্রমিকরা রাস্তায় নামার চেষ্টা করেছিল। আমরা তাদের বুঝিয়ে সরিয়ে দিয়েছি। এদিকে আন্দোলন ঘিরে মিরপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) ক্রাইম প্রিভেনশন উত্তর মো. মহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। মিরপুর-১, পল্লবীর বিভিন্ন এলাকা, রূপনগর, মিরপুর-১২ ও কাফরুল রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। সব মিলিয়ে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ ফোর্স মোতায়েন রয়েছে। আন্দোলনের নামে যারা দেশকে অস্থিতিশীল করা, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি, সড়ক অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করার চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, যারা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত তাদের অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যাবে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মিরপুরের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) ক্রাইম প্রিভেনশন উত্তর মহিদুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ¦খলা বাহিনীর তৎপরতায় শ্রমিকদের সড়কে নামার সুযোগ হয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। অনেক পোশাক কারখানার শ্রমিক কাজে ফিরে গেছেন এবং কারখানাগুলোতে কাজ চলছে। আশা করি শ্রমিকরা কাজে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন। পুলিশের পাশাপাশি অভিযানে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি), কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে জানিয়ে মহিদুল ইসলাম বলেন, সব ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় রয়েছে। আন্দোলনের নামে সহিংসতাকারীদের সতর্ক করে মহিদুল ইসলাম বলেন, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করা পুলিশের দায়িত্ব। আন্দোলনের নামে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড, কারখানায় আগুন দেওয়া ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবির বিষয়ে শ্রমিক মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়েও কাজ চলছে। প্রকৃত শ্রমিকরা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িত নন। শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে যারা এসব অপরাধ করাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং গার্মেন্টস খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। অপরাধীরা যত শক্তিশালীই হোক বা যত ষড়যন্ত্রই করুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। কেউ যাতে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারে, সে জন্য পুলিশ সতর্ক রয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা। সাভার-আশুলিয়া-হেমায়েতপুর এদিকে টানা পঞ্চম দিনের মতো অস্থিরতা বিরাজ করছে সাভার-আশুলিয়া-হেমায়েতপুর শিল্পাঞ্চল এলাকা। গতকাল বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল থেকেই কাজে যোগ না দিয়ে সড়কে নামার চেষ্টা করেন পোশাক শ্রমিকরা। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতিতে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল মহাসড়ক অবরোধ করতে পারেননি তারা। এদিকে, গাজীপুরে শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে বাইপাইল এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন শ্রমিকরা। এ সময় হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিচারের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা। এদিন সকালে আশুলিয়ার জিরাবো থেকে বাইপাইল পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও অসন্তোষের মুখে অন্তত ৭০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। নিশ্চিন্তপুর এলাকায় পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে বিক্ষোভ মিছিল করেন শ্রমিকরা। এতে কিছু সময়ের জন্য তুমুল উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও বর্তমানে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। এ ছাড়া, শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার অন্যান্য এলাকা জিরানী, পলাশবাড়ী, ইপিজেডসহ সব এলাকার পোশাক কারখানাগুলো সচল রয়েছে। অন্যদিকে, গত বুধবার হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করলেও গতকাল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক অবস্থানের কারণে সেখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। পোশাক কারখানাগুলোতে চলছে উৎপাদন কার্যক্রম, মহাসড়কেও যান চলাচল রয়েছে স্বাভাবিক। এদিকে, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে সাভার মডেল থানায় মামলা করেছে পুলিশ। শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সকালে ৭০টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করলে কিছুটা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। তবে দুপুরের পর থেকে পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে, শিল্পাঞ্চল পরিদর্শনে এসে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মুস্তাফিজুর রহমান জানান, শ্রমিক আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রকৃত শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন এবং সরকার ঘোষিত সময়সীমা মেনে নিয়েছেন। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন তাদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষ, বিক্ষোভ আর একের পর এক কারখানায় ছুটি, সব মিলিয়ে পঞ্চম দিনেও স্বাভাবিক হয়নি সাভার-আশুলিয়ার তৈরি পোশাক শিল্পাঞ্চল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গাজীপুর ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে টানা কয়েক দিনের আন্দোলনের পর গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে শান্ত পরিবেশ ফিরে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল থেকে পোশাকশ্রমিকরা দলবেঁধে স্ব-স্ব কারখানায় কাজে যোগ দিতে শুরু করেছেন। সকাল আটটা পর্যন্ত জেলার ঢাকা-ময়মনসিংহ বা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ও আঞ্চলিক কোনো সড়কে শ্রমিকদের কোনো পিকেটিং বা অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। তবে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শিল্পাঞ্চলজুড়ে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মাঠে মোতায়েন রয়েছেন ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তাদের নেতৃত্বে বিজিবির ১২ প্লাটুন, আনসারের ৫ প্লাটুন এবং এসআরবির ৮ প্লাটুনসহ মোট ২৫ প্লাটুন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও রিসার্চ সেল) মো. আরিফ হোসাঈন জানান, আন্দোলনের নামে যাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও মানুষের জানমালের কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হয়, সে লক্ষ্যে মাঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত টহল ও তদারকি জোরদার করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, ন্যূনতম বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। আন্দোলন চলাকালে পুলিশ বক্স, পুলিশের গাড়ি ও বিভিন্ন কারখানার গুদামে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে শ্রমিক ও পুলিশ সদস্য আহত হন এবং বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে একাধিক কারখানা কর্তৃপক্ষ সাময়িক ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল। এদিকে, তৈরি পোশাকশিল্পে আগামী ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হবে। আর জানুয়ারি থেকে শ্রমিকেরা বাড়তি বেতন হাতে পাবেন। নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা শেষে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এ বি এম শামসুদ্দিন ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার এমনটাই জানিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ-ফতুল্লা ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের চতুর্থ দিনে নারায়ণগঞ্জে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সেইসঙ্গে গার্মেন্টস শ্রমিকরা তাদের কর্মস্থলে যোগ দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল থেকেই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট কাঠেরপুল এলাকায় এই পরিস্থিতি দেখা যায়। ফলে এদিন সকাল থেকেই পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। এদিকে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিএনপি দলীয় নেতাকর্মীরাও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন পয়েন্টে বিএনপির নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছেন। এর আগে গত বুধবার সকালেই শ্রমিকরা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্ক রোড অবরোধের জন্য শিবু মার্কেট কাঠেরপুল এলাকায় জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছিলো। শ্রমিকরা পাল্টা ইটপাটকেল মারলে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এদিন কয়েকজন শ্রমিককে আটক করা হয়। নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী বলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল থেকেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। কোথাও যেন বিশৃঙ্খলার ঘটনা না ঘটে; সেজন্য সকাল থেকেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। আমরা কঠোর অবস্থানে আছি, কোনোভাবেই তাদের রাস্তায় আসতে দিব না। বিজিবি’র ভাষ্য শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবির প্রেক্ষিতে সৃষ্ট শ্রম অসন্তোষের মধ্যে শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্বাভাবিক জনজীবন ও শিল্পকারখানার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মোট ২৪ প¬াটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম এই তথ্য জানান। তিনি জানান, এর মধ্যে সাভারের হেমায়েতপুর, আশুলিয়া ও বাইপাইল এলাকায় ৫ প্লাটুন; গাজীপুরের চৌরাস্তা, ভোগড়া বাইপাস, পোড়াবাড়ি, মাস্টারবাড়ি বিদ্যুৎ এলাকা, তেলিপাড়া, সফিপুর, চন্দ্রা ও কালিয়াকৈর এলাকায় ১৩ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, চাষাঢ়া, ঝালকুড়ি ব্রিজ, বিসিক শিল্প এলাকা ও কাঁচপুর ব্রিজ এলাকায় ৬ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। শ্রমিক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিল্পাঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ বজায় রাখতে বিজিবি পেশাদারত্ব, সংযম ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। মোতায়েনকৃত বিজিবি সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করছেন। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা, জনসাধারণের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি প্রতিরোধে বিজিবির নিয়মিত টহল ও নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান বিজিবি’র জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম।