প্রকাশ :: ... | ... | ...

দেশের কারাগারগুলোতে বন্দি মায়েদের সঙ্গে রয়েছে ৩০৩ শিশু


সংযুক্ত ছবি

★ বন্দি মায়েদের অনেকেই মাদক মামলার আসামি ★ মায়েদের সঙ্গে কারাগারে থাকা কন্য শিশুর সংখ্যা ১৫৩ ও ছেলে শিশু ১৪৬ ★ সবচেয়ে বেশি শিশু গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে ★ রিটের চূড়ান্ত শুনানি হবে অবকাশকালীন ছুটির পর “কারাগারগুলোতে যে পরিবেশে শিশুরা বড় হচ্ছে সেটি নিতান্তই অসমীচীন। তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে নিশ্চিতভাবে, যা শিশু অধিকার ও মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন” — কামরুন নাহার মাহমুদ দীপা, রিটকারী আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট “শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থে বন্দি মায়েদের সঙ্গে কারাগারে না রেখে পছন্দের নিকটাত্মীয়দের কাছে অথবা সরকারি শিশু পরিবারের কাছে রাখারও সুপারিশ করা হয়েছে” — সমাজসেবা অধিদপ্তর রাজধানী ঢাকা ও গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে এখনও সহাবস্থানে রয়েছে ৩০৩ জন শিশু। কারাগারে বন্দি বেশিরভাগ মায়েরাই দেশের বিভিন্ন এলাকার মাদক মামলার আসামি। বন্দি মায়েদের সঙ্গে কারাগারে থাকা কন্যা শিশুর সংখ্যা ১৫৩ ও ছেলে শিশুর সংখ্যা ১৪৬। সবচেয়ে বেশি শিশু অবস্থান করছে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে। সমাজসেবা অধিদপ্তর বলছে, এসব শিশুর মানসিক বিকাশে শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থে বন্দি মায়েদের সঙ্গে কারাগারে না রেখে পছন্দের নিকটাত্মীয়দের কাছে অথবা সরকারি শিশু পরিবারের কাছে রাখারও সুপারিশ করা হয়েছে। সম্প্রতি হাইকোর্টে দাখিল করা এক প্রতিবেদনে এমনটাই জানিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ৮ মে জাতীয় একটি গণমাধ্যমে কারাগারে শিশুদের শৈশব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদন যুক্ত করে গত ৯ জুন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কামরুন নাহার মাহমুদ দীপা একটি রিট আবেদন করেন। আবেদনের আরজিতে কারাগারে মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুষ্টির বিষয়টি নিশ্চিত করতে কারা কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে নির্দেশনা (রুল বিচারাধীন অবস্থায়) চান রিটকারী ওই আইনজীবী। আদালতে আবেদনের পক্ষে তিনি নিজেই শুনানি করেন। শুনানির সময় তিনি প্রকাশিত প্রতিবেদনটি আদালতে পড়ে শোনান। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী ফারজানা আক্তার ও হোসনে আরা বেগম। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. ফারুক হোসেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ৭৪টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে মায়েদের সঙ্গে ২৯৯ শিশু রয়েছে। এর মধ্যে কন্যাশিশু ১৫৩ জন এবং ছেলেশিশু ১৪৬ জন। এসব শিশুর মায়েদের বেশির ভাগই মাদক মামলার আসামি। এই শিশুদের মায়েদের কেউ সাজা খাটছেন, আবার কারও মামলা রয়েছে বিচারাধীন। রিটকারী অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার মাহমুদ দীপা বলেন, প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনটি হাইকোর্ট গুরুত্ব সহকারে নিয়েছেন। আমরাও বিষয়টির গুরুত্ব শুনানিতে তুলে ধরেছি। তিনি বলেন, কারাগারগুলোতে যে পরিবেশে শিশুরা বড় হচ্ছে সেটি নিতান্তই অসমীচীন। তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে নিশ্চিতভাবে, যা শিশু অধিকার ও মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। অবশ্যই শিশুদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের ওই আইনজীবী বলেন, এ অবস্থা উত্তরণে আমরা হাইকোর্টের নির্দেশনা চেয়েছিলাম। আদালত কারাগারে থাকা শিশুদের যথাযথ নিরাপত্তা, কল্যাণ ও বিকাশের পরিবেশ নিশ্চিতে রুল দিয়েছে। কারাগারে কত শিশু আছে তা দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন আকারে জানাতে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। ওইদিন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফারুক হোসেন বলেছিলেন, যে সব শিশু কারাগারে আছে তারা তো অপরাধী নয়। কিন্তু তাদের থাকতে হচ্ছে আসামিদের সঙ্গে। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে নির্দেশনা রুল দিয়েছেন। কারা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৪টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে মায়েদের সঙ্গে ২৯৯ শিশু (২৬ এপ্রিল, ২০২৬ পর্যন্ত) রয়েছে। এসব শিশুর মায়েদের বেশিরভাগই মাদক মামলার আসামি। এর মধ্যে কন্যাশিশু ১৫৩ জন এবং ছেলেশিশু ১৪৬ জন। এই শিশুদের মায়েদের কেউ সাজা কাটছেন, আবার কারও মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সম্প্রতি কারা অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগের ১৮টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে শিশু রয়েছে ১০০ জন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিভাগের ১২টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে ৯০ জন শিশু রয়েছে। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগের ৮টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে ২৫ জন শিশু রয়েছে। অন্যদিকে সিলেট বিভাগের ৫টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে ১৯ জন শিশু রয়েছে। এ ছাড়াও রংপুর বিভাগের ৮টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে ২৫ জন শিশু, খুলনা বিভাগের ১০টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে ২০ জন শিশু, বরিশাল বিভাগের ৬টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে ৪ জন শিশু এবং ময়মনসিংহ বিভাগের ৪টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে মায়েদের সঙ্গে ১৩ জন শিশু রয়েছে। আর মায়েদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি শিশু রয়েছে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে। এদিকে সোমবার (১২ অক্টোবর) রিটকারী আইনজীবী কামরুন নাহার মাহমুদ দীপা সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবেদন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, হাইকোর্টে জমা দেয়া ওই প্রতিবেদনে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতির মাধ্যমে এসব শিশুদের নিয়মিত খোঁজ-খবর নেয়া হয় এবং খেলনা, পোশাক, শিশুখাদ্যসহ তাদের খোঁজ-খবর রাখা হয়। প্রতিবেদনে এসব শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থে পছন্দের নিকটাত্মীয়দের কাছে অথবা সরকারি শিশু পরিবারের রাখার সুপারিশও করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। এর আগে গত ১৫ জুন দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের সংখ্যা ও তাদের বয়সের বিবরণ জানতে চেয়ে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন চায় হাইকোর্ট। তবে তারা এখনো প্রতিবেদন দাখিল করেনি। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কামরুন নাহার মাহমুদ দীপার দায়ের করা এক রিটের প্রেক্ষিতে ওইদিন বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশের পাশাপাশি রুল জারি করেছিলেন। রুলে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কারাগারে থাকা ওইসব শিশুদের নিরাপত্তা, কল্যাণ, শিক্ষা, সঠিক বিকাশ ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে কেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হবে না। অবকাশকালীন ছুটির পর এই রিটের চূড়ান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।