জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে শুক্রবার প্রথমবারের মতো ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান —পিএমও
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেওয়ার পর নিউইয়র্ক ছাড়ার আগে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করে তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। গত শুক্রবার নিউইয়র্কে জেপিমরগ্যান চেজের আয়োজিত প্রাতরাশ বৈঠকে শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সামনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে ব্ল্যাকরক, পিমকো, টিপিজি, জেন স্ট্রিট, ম্যাককুয়ারি, গোল্ডেনট্রি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, মেটলাইফসহ বিভিন্ন আর্থিক ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ স্বল্পমেয়াদি লেনদেন নয়, দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব চায়। বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। ‘বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত’— ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে এ বার্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগের জন্য আস্থা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে তার সরকার কাজ করছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যও তুলে ধরেন তিনি। বাংলাদেশের ১৮ কোটির বেশি মানুষের অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ কর্মশক্তি এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানকে বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত উৎপাদন, বিনিয়োগ ও সেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। পোশাক ও উৎপাদনশিল্প বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত শক্তি হলেও জ্বালানি, অবকাঠামো, লজিস্টিকস, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, জলবায়ু অর্থায়ন, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবাকে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। রাজনীতিতে আসার আগে ব্যবসায় থাকার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য শুধু নীতি ঘোষণা যথেষ্ট নয়, এর কার্যকর বাস্তবায়নও প্রয়োজন। তিনি বলেন, আপনারা জানতে চান—নিয়মকানুন পূর্বানুমানযোগ্য কি না, বিনিয়োগ সুরক্ষিত কি না, পুঁজি কার্যকরভাবে স্থানান্তর করা যায় কি না এবং মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়া যায় কি না। এগুলো যৌক্তিক প্রশ্ন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নীতির মাধ্যমে আস্থা তৈরি করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের কিছু উদ্বেগের বিষয়ও তুলে ধরে তিনি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সহজ করা, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদার, কর ও ভ্যাট প্রশাসনের উন্নয়ন, মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। # সরাসরি বিনিয়োগের পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণের ঘাঁটি হিসেবেও বাংলাদেশকে বিবেচনার আহ্বান # নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সহজ করা, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদার, কর ও ভ্যাট প্রশাসনের উন্নয়ন, মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি # জেপিমরগ্যান চেজের কো-প্রেসিডেন্ট ও কনজ্যুমার অ্যান্ড কমিউনিটি ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান নির্বাহী ট্রয় রোরবগের সঙ্গে পৃথক বৈঠক # জাতিসংঘে প্রথম ভাষণ শেষে নিউইয়র্ক ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে সরাসরি বিনিয়োগের পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণের ঘাঁটি হিসেবেও বাংলাদেশকে বিবেচনার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তারেক রহমান বলেন, আমরা স্বল্পমেয়াদি লেনদেন চাই না। আমরা দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব চাই, যা উভয় পক্ষের জন্য মূল্য সৃষ্টি করবে। তিনি আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো—আরও বিনিয়োগ, আরও বাণিজ্য, আরও কর্মসংস্থান, আরও প্রযুক্তি এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব। জেপিমরগ্যানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ওয়াল স্ট্রিটের বৈঠকের আগে জেপিমরগ্যান চেজের কো-প্রেসিডেন্ট ও কনজ্যুমার অ্যান্ড কমিউনিটি ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান নির্বাহী ট্রয় রোরবগের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। জেপিমরগ্যানের বিবৃতি অনুযায়ী, বৈঠকে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও পুঁজিপ্রবাহ, আর্থিক বাজারের উন্নয়ন, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, পণ্যের মূল্য এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের প্রথম সার্বভৌম বন্ড ইস্যুতে জেপিমরগ্যানের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, এ উদ্যোগ বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার আরও কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে। রোরবগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দিয়ে দেশটির প্রতি জেপিমরগ্যানের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে দেশের প্রবেশাধিকার আরও শক্তিশালী করতে ব্যাংকটির বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ও দক্ষতা কাজে লাগানোর কথাও জানান তিনি। চার দিনের সফরে ৩০ আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদি আমিন জানিয়েছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে চার দিনের নিউইয়র্ক সফরে তারেক রহমান ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। এসব বৈঠক ও কর্মসূচিতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক শান্তির বিষয় গুরুত্ব পায়। মাহদি আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী আটটি জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি, চারটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্ট এবং ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেন। শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্কের সঙ্গে বৈঠকে মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সঙ্গেও বৈঠক করেন তারেক রহমান। তিনি কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব আলোচনায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষা, জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয় গুরুত্ব পায়। তিন দেশই প্রধানমন্ত্রীকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে বলে জানান মাহদি আমিন। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিব, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার এবং মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেন। রোহিঙ্গা সংকট এবং মিডওয়াইফারি ও মা, নবজাতক ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বাংলাদেশ দুটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্ট আয়োজন করে। জলবায়ু কার্যক্রম, ন্যায়সংগত রূপান্তর এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়েও বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানও সফরকালে আটটি উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং চারটিতে বক্তব্য দেন। এর মধ্যে ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নারী নেতাদের প্ল্যাটফর্ম, ফার্স্ট স্পাউসেস ডায়ালগ এবং মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্ট। মাহদি আমিন বলেন, সব মিলিয়ে চার দিনের এই সফরে প্রধানমন্ত্রী এবং তার প্রতিনিধিদলের সদস্যরা প্রায় ৮০টি কর্মসূচিতে বিভিন্নভাবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তুলনামূলকভাবে ছোট একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে সফরটি পরিচালনা করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সীমিত সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে প্রতিটি বৈঠকে বাংলাদেশের স্বার্থ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। জাতিসংঘ অধিবেশন শেষে ঢাকার পথে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ শেষে পাঁচ দিনের সফর পূর্ণ করে দেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী এমিরেটসের একটি ফ্লাইট স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৩০ মিনিটে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রওনা হয়। সফরসঙ্গী হিসেবে তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও রয়েছেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী। ফ্লাইটটির নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, গতকাল শনিবার রাত আটটায় দুবাইয়ে যাত্রাবিরতি করবে। সেখান থেকে রাত দুইটায় যাত্রা করে আজ ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল আটটা ৪০ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।