রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গুপ্তদলের নেতারা বিএনপিকে নসিহত করছেন। সেই গুপ্তদের বলবো, বিএনপিকে নসিহত না করে আগে নিজেদের ঘরের দিকে নজর দিন। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেলে ফেনীর পরশুরাম উপজেলায় ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে স্থানীয় গ্রামবাসীদের আয়োজিত এক জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জনসমাবেশে বিএনপি দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, জনগণের প্রয়োজন অনুধাবন করেই বিএনপি খালের উন্নয়ন ও খনন কর্মসূচি শুরু করেছে। যেসব উদ্যোগে অধিকাংশ মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন হয়, বিএনপি সব সময় সে ধরনের কর্মসূচিতেই প্রাধান্য দেয়। সরকারের বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতায় এসে প্রথম সাত দিনেই বর্তমান সরকার ১৩ লাখ কৃষকের কৃষিঋণ মওকুফ করেছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও তাদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে চালু করা হয়েছে ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থা, যা বাংলাদেশে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের চিন্তায় ছিলো না। এছাড়া গত ১৭ বছর ধরে বন্ধ থাকা বিভিন্ন কলকারখানা পুনরায় চালু করা হচ্ছে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আহবান করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। চিকিৎসাসেবার মান বাড়াতে আগামী পাঁচ বছরে দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। বিগত শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৭ বছর দেশে আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত করেছে স্বৈরাচারী সরকার। তবে আইন যে সকলের জন্য সমান, বর্তমান সরকার সেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাতেই কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রসঙ্গে সতর্ক করে তিনি বলেন, কিছু দল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে পুঁজি করে দেশে অরাজকতা তৈরির পাঁয়তারা করছে। একাত্তরের ইতিহাস এবং যেভাবে তারা আমাদের মা-বোনদের ওপর নির্যাতন করেছিলো, দেশের মানুষ তা ভোলেনি; এখন তারা আবারও সেই পুরনো রূপ ধারণ করছে। এখন সময় এসেছে সজাগ ও সতর্ক হওয়ার। যেকোনো মূল্যে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিভ্রান্তকারীদের চক্রান্ত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। বিএনপির প্রতিটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি মূলত এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনেরই কর্মসূচি। এর আগে, দুপুরে পরশুরাম উপজেলার উপকণ্ঠ ও খোয়াইঘাট মুহুরী ব্রিজ এলাকায় প্রকল্পটির ফলক উন্মোচন করে ফেনীতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও সেচ সুবিধা সম্প্রসারণে ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প পুনর্বাসন (১ম পর্যায়)’ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনের পর স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং সেখানে বৃক্ষরোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে, গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা অনুমিত ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন, ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং ৭৭টি ইনলেট নির্মাণ করা হবে। পরবর্তী পর্যায়ে মুহুরী ও কহুয়া নদীতে নতুন বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি সিলোনিয়া নদীতে বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ফেনী সফর ঘিরে আরও কয়েকটি কর্মসূচি রয়েছে। পরশুরামে প্রকল্প উদ্বোধনের পর তিনি ফুলগাজীতে বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। পরে ফুলগাজী জেলা পরিষদ ডাকবাংলো পরিদর্শন করবেন। সেখানে ছাদভিত্তিক (রুফটপ) সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলার সরকারি ভবনগুলোতে মোট ৯৬২ দশমিক ৫ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ছাগলনাইয়ায় ৪১৫ কিলোওয়াট, পরশুরামে ২৯৮ কিলোওয়াট এবং ফুলগাজীতে ২৪৯ কিলোওয়াট ক্ষমতার ব্যবস্থা রয়েছে। বিকেলে ফুলগাজী সরকারি পাইলট হাইস্কুল মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণের পাশাপাশি মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম এবং অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্মানী প্রদান করা হয়। ফুলগাজীতে মোট ৫১০ জন ফ্যামিলি কার্ড এবং পুরো জেলায় ৭ হাজার ৬৪৩ জন কৃষক কার্ড পাবেন। এছাড়া ফুলগাজীর ২৩৮ জন ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও পুরোহিতকে সম্মানী দেওয়া হবে। এর আগে, বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে সড়কপথে ঢাকার গুলশানের বাসভবন থেকে পরশুরামের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। দুপুর সোয়া একটার দিকে তিনি ফেনীতে পৌঁছান। নির্ধারিত কর্মসূচি শেষে সন্ধ্যায় তার ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের মধ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী এবং ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আউয়াল মিন্টু, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন এবং সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নানা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাবা ইস্কান্দার মজুমদারের গ্রামের বাড়ি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুরে। ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত ফেনী-১ আসনের সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। ১৯৯১ সাল থেকে এ আসনে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।