বাঁ থেকে বিল্লাল হোসেন তালুকদার ও খাজা হাবিবুল্লাল হাবিব
* দলীয় পদ থেকে বহিস্কারের দাবি রাজধানীর মৌচাক এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের রমনা থানার সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন তালুকদার হত্যাকাণ্ডের মামলায় সন্দেহভাজন আসামি সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা খাজা হাবিবুল্লাল হাবিবকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম অভিযুক্ত খাজা হাবিবের জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। বুধবার (১২ আগস্ট) বিকেলে গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শাহ আলম। এদিকে গত ৫ আগস্ট ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু ও সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সাংগঠনিক কার্যক্রমকে গতিশীল করতে সংশোধিত সাংগঠনিক টিম-২ এর টিম প্রধান আ. ন. ম সাইফুল ইসলামের অধীনে বহুল বিতর্কিত খাজা হাবিবকে সদস্য পদে অন্তর্ভুক্ত করায় ক্ষোভে ফুঁসছে ২১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরসহ স্থানীয়রা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের সকল কার্যক্রম থেকে খাজা হাবিবুল্লাহ হাবিবকে দ্রুত অপসারণ ও দলীয় সব পদ থেকে বহিস্কারের দাবি জানিয়েছেন। এ নিয়ে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, খাজা হাবিবুল্লাহ হাবিব ঢাকা দক্ষিণ সিটি কপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং শাহবাগ থানা বিএনপির নেতা। গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাতে গোপন সংবাদে পুরান ঢাকার লালবাগের একটি এলাকা থেকে খাজা হাবিবকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একটি দল। পরদিন শুক্রবার (৭ অগাস্ট) প্রথম প্রহরে তাকে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখায় ডিবি পুলিশ। পরে তাকে রমনা মডেল থানায় নেওয়া হয়। সেখানে দুপুর দেড়টার দিকে থানায় অসুস্থ হয়ে পড়লে হাবিবকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল পড়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমবি) আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি টানা ৫ দিন অধ্যাপক ডা. হাসনুল আলমের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা দেওয়া হয়। বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এরপর চিকিৎসক তাকে ছাড়পত্র দিলে পুলিশ তাকে দুপুরের দিকেই আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা রমনা মডেল থানার পরিদর্শক (অপারেশন্স) আতিকুল আলম খন্দকার। এ সময় হাবিবের পক্ষে তার আইনজীবী ইলতুৎমিশ সওদাগর এ্যানী জামিন চেয়ে শুনানি করেন। শুনানি নিয়ে আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এদিকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি’র দলীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি হাইকমান্ডের নির্দেশে বিএনপি’র দক্ষিণের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে গতিশীল করতে সাংগঠনিক টিম পূর্ণগঠনের নির্দেশনা দেন। সেই নির্দেশনার পর গত সপ্তাহের বুধবার (৫ আগস্ট) ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি’র আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু এবং সদস্য সচিব তানভরি আহমেদ রবিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ৫টি সংশোধিত সাংগঠনিক টিম গঠন করে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের হাজারীবাগ, ধানমন্ডি, কলাবাগান ও নিউমার্কেটে হারুনুর রশিদ হারুনকে টিম প্রধান করে ৬ সদস্যের এক নম্বর টিম ঘোষণা করা হয়। এই টিমের অন্য সদস্যরা হলেন- অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেন সরদার, কে. এম জোবায়ের এজাজ, মামুন আহমেদ, কাবিরুল হায়দার চৌধুরী ও মো. আলম মৃধা। শাহবাগ ও রমনা এলাকায় আ. ন. ম সাইফুল ইসলামকে প্রধান করে ৬ সদস্যের দ্বিতীয় টিম গঠন করা হয়। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন- মকবুল ইসলাম খান টিপু, অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, খাজা হাবিবুল্লাহ হাবিব, মো. উজির হোসেন উজ্জ্বল ও মোজাম্মেল হক মজু। চকবাজার, লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচরে লিটন মাহমুদকে প্রধান করে ৭ সদস্যের টিম গঠন করা হয়। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন- আনোয়ার পারভেজ বাদল, সাইদ হাসান মিন্টু, নাদিয়া পাঠান পাপন, সফিউদ্দিন আহমেদ সেন্টু, শামসুন নাহার ভূঁইয়া ও হাজী টিপু সুলতান। এছাড়া খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা এলাকায় আব্দুস সাত্তারকে প্রধান করে ৭ সদস্যের ৪ নম্বর টিম এবং সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া ও ওয়ারী এলাকায় হাজী মো. মনির হোসেন চেয়ারম্যানকে প্রধান করে ৬ সদস্যের ৫ নম্বর সাংগঠনিক টিম গঠন করা হয়। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সংশোধিত সাংগঠনিক ৫টি টিম গঠনের পর দ্বিতীয় টিমে খাজা হাবিবুল্লা হাবিবকে দলের সদস্য পদে অন্তর্ভূক্ত করায় দক্ষিণ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের তৃণমূলের নেতাকর্মী, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ জনগণের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সংশোধিত সাংগঠনিক টিম ঘোষণার পরদিনই গত বৃগস্পতিবার (৬ আগস্ট) দিবাগত রাতে গোপন সংবাদে ডিএমপি’র ডিবি পুলিশের একটি দল পুরান ঢাকার লালবাগের একটি এলাকা থেকে ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বহুল বিতর্কিত বিএনপি নেতা খাজা হাবিবকে গ্রেপ্তার করে। এরপর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অন্যান্য আসামির দেয়া তথ্যে রাজধানীর মৌচাকের আনারকলি মার্কেটের সামনে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা বিল্লাল হোসেন তালুকদার হত্যাকাণ্ডে খাজা হাবিবের সম্পৃক্ততার তথ্য পায় ডিবি পুলিশ। এরপর বিল্লাল হত্যা মামলায় ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে পরদিন শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকালে রমনা থানায় হস্তান্তর করে। সেখানে হঠাৎ অসুস্থ হলে পুলিশ তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ওইদিনই শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমবি) হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। দলীয় সূত্র আরও জানায়, বিগত ১/১১ এর শাসনামলে যৌথবাহিনীর হাতে বিপুল সংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হন চিহ্নিত চাঁদাবাজ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী সাবেক কাউন্সিলর ও শাহবাগ থানা বিএনপি নেতা খাজা হাবিবুল্লা হাবিব। একই সময় গ্রেপ্তার হন লালবাগ থানা বিএনপি’র সভাপতি আমিনুল ইসলাম আমিন। তৎকালীন সময়ে গোপন সংবাদে যৌথবাহিনীর একটি দল পুরান ঢাকার লালবাগের আজিমপুরের নতুন পল্টন লাইন এলাকায় অভিযান চালায়। সেখান থেকে খাজা হাবিব ও আমিনকে গ্রেপ্তার করে যৌথবাহিনী। তখন তাদের দেওয়া তথ্যে ইরাকী মাঠস্থ ইরাকী কবরস্থানের একটি কবর খুড়ে কবরের ভেতর বিশেষভাবে সংরক্ষিত একটি ট্রাঙ্ক থেকে বিপুল সংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারমূলে জব্দ করা হয়। সেই মামলায় কারাভোগ করেন বিএনপি নেতা খাজা হাবিব ও আমিন। এমন বিতর্কিত ব্যক্তিকে দলে অন্তর্ভূক্ত করায় নেতাকর্মীরা তীব্র প্রতিবাদ জানান। সাংগঠনিক কার্যক্রমকে গতিশীল রাখতে বিতর্কিত এসব নেতাকর্মীকে বাদ দেওয়ার দাবিও জানান। তারা বলেন, ৫ আগস্ট দেশের পটপরিবর্তনের পর থেকেই দখল-চাঁদাবাজি, খুনোখুনিতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন খাজা হাবিব ও আমিনসহ আরও অনেকেই। তাদের অত্যাচারে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ সাধারণ জনগণও চরম আতঙ্কে রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরসহ স্থানীয়রা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের সকল কার্যক্রম থেকে খাজা হাবিবুল্লাহ হাবিবকে দ্রুত অপসারণ ও দলীয় সব পদ থেকে বহিস্কারের দাবি জানিয়েছেন। এ নিয়ে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এদিকে ডিএমপি’র ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, রাজধানীর মৌচাকে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল হোসেন হত্যার ঘটনায় বিএনপি নেতা সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর খাজা হাবিবুল্লাহ ওরফে হাবিবকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবির একটি দল। বিল্লাল হত্যায় ইতোপূর্বে গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া তথ্যে উঠে আসে খাজা হাবিবেবর সম্পৃক্ততার বিষয়টি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন ডিবিপ্রধান। বুধবার (১২ আগস্ট) এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রমনা থানায় যোগাযোগ করা হলে অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইয়াছিন মিয়া ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, মৌচাকের বিল্লাল হত্যা মামলায় খাজা হাবিবকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রমনা মডেল থানার পরিদর্শক (অপারেশন্স) আতিকুল আলম খন্দকার বলেন, বিল্লাল হত্যা মামলায় এরই মধ্যে এজাহারভুক্ত ৯ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা রমনা থানা যুবদলের বহিষ্কৃত আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবুকে এখনো গ্রেফতার করা হয়নি। তিনি বর্তমানে আগাম জামিনে রয়েছেন। সবশেষ খাজা হাবিবকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এর আগে হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ জানিয়েছিল, মৌচাক আনারকলি মার্কেটের সামনের ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদাবাজি নিয়ে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ ও ঘটনার পেছনের বিস্তারিত তথ্য জানতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে ডিবি। নিহতের ভাই ও ছাত্রদলের সাবেক নেতা হেলাল সাদী বলেন, খাজা হাবিবুল্লাহ হাবিব এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন কি না, সে বিষয়ে আমার জানা নেই। তিনি বলেন, তাদের দায়ের করা মামলায় হাবিবের নাম আসামি হিসেবে ছিল না। তবে তদন্তে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেলে সেটি পুলিশের অনুসন্ধানের বিষয়। উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৮ জুন রাত ৮টার দিকে সালিশের কথা বলে মৌচাকের আনারকলি মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় ডেকে নিয়ে বিল্লাল হোসেনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় পরদিন ৯ জুন তার স্ত্রী আম্বিয়া খাতুন পরদিন রমনা মডেল থানায় ২১ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা আরও ৭/৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলা নম্বর- ৭(৬)২৬। মামলায় যুবদলের ২১ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। মামলায় অভিযোগ করা হয়, বিল্লাল খাবার হোটেলের ব্যবসা করতেন। তার ভাগ্নে মোবারক হোসেন আকাশ মৌচাকের আনারকলি মার্কেটে ব্যবসা করেন। আসামি দিদারুল ইসলাম বাবু আনারকলি মার্কেটের ফুটপাত ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ বিল ও ময়লা পরিষ্কারের বিলের নাম করে চাঁদা তুলতেন। এ নিয়ে দিদারুলের সঙ্গে আকাশের বিরোধ চলছিল। ৮ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আকাশের বিষয়ে দিদারুল কথা বলবে জানিয়ে বিল্লালকে আনারকলি মার্কেটের পেছনে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে দিদারুলসহ অন্য আসামিরা রাত পৌনে ৮টার দিকে বিল্লালকে মারধর করে। এক পর্যায়ে দিদারুলের নির্দেশে রিয়াজুল ছুরি দিয়ে বিল্লালের বুকে আঘাত করেন। আকাশকেও মারধর করে আহত করা হয়। আকাশের চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে আসামিরা পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা বিল্লালকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে রাত পৌনে ১০টার দিকে কর্তব্যরত ডাক্তার বিল্লালকে মৃত ঘোষণা করেন।