কিছু রাজনৈতিক দল ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসনের সঙ্গে সংশি¬ষ্ট শক্তিগুলোকে আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসার সুযোগ করে দিতে পারে। গতকাল শনিবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। তারেক রহমান বলেন, আগের স্বৈরশাসনের সময়ে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী গোপনে সক্রিয় ছিল এবং পরবর্তী সময়ে তাদের কয়েকজন নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকারও করেছেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এমন কি হতে পারে যে স্বৈরশাসনের সময়ে যারা আত্মগোপনে ছিল, এখন সেই গোপন নেটওয়ার্কের ভেতর থেকেই তারা এই অরাজকতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে? তিনি বলেন, যদি তা-ই হয়, তাহলে যারা আত্মগোপনে রয়েছে, তারা আসলে সেই স্বৈরশাসনকে আবার সামনে নিয়ে আসার জন্য কাজ করছে। জাতীয়তাবাদী শক্তি এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, কে কার দায়িত্ব নিচ্ছে এবং কে কাকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে—তা জনগণের সামনে স্পষ্ট করতে হবে। তিনি বলেন, আসুন, আমরা জনগণকে আরও সচেতন করি। কে কার দায়িত্ব নিচ্ছে এবং কে কাকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরি। তারেক রহমান আরও অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে কিছু রাজনৈতিক শক্তি পরস্পরকে রক্ষা করেছে। এই রাজনীতি জনগণের সামনে উন্মোচন করতে হবে। জনগণের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে। ১৯৭১, ১৯৮৬, ১৯৯৬ এবং গত দেড় দশকের বিভিন্ন সময়ের প্রসঙ্গ উলে¬খ করে তিনি বলেন, এসব শক্তি বিভিন্ন রূপে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তাই আজ আমাদের তাদের রাজনীতি জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। জনগণের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে ভোগান্তির জন্য জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি দেশের চলমান সংকটকে কাজে লাগিয়ে বিভ্রান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকটে যারা কষ্ট পাচ্ছেন, তাদের সবার কাছে দলের পক্ষ থেকে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। তারেক রহমান বলেন, তার সরকার অর্থনীতি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে আগের স্বৈরশাসন এবং অর্ন্তর্বতী সরকার—উভয়ের কাছ থেকে নানান সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। তিনি বলেন, স্বৈরশাসন কিংবা অর্ন্তর্বতী সরকার—যেখান থেকেই আমরা সমস্যাগুলো উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে থাকি না কেন, সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি। বিভিন্ন খাতের সমস্যার কারণে জনগণ ভোগান্তিতে রয়েছে স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, আমরা লক্ষ্য করছি, কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি এসব সমস্যাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। আর এই বিভ্রান্তির মধ্য দিয়ে তারা দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তারেক রহমান বলেন, তার সরকার গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক নৈতিকতা সমুন্নত রাখবে। তিনি বলেন, কেউ যদি অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে সেই অরাজকতা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, দেশের আইনেই তা স্পষ্টভাবে বলা আছে। তাই সরকার হিসেবে নয়, শুধু সরকার হিসেবেও নয়—জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, সবাইকে নিজ নিজ সীমার মধ্যে থাকতে হবে। জ্বালানি সংকটই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেশের সবচেয়ে জরুরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে জ্বালানি সংকটকে উলে¬খ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, আগের সরকার বা অর্ন্তর্বতী সরকারের কাছ থেকে পাওয়া সমস্যাগুলোকে নিজেদের ব্যর্থতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে চায় না তার সরকার। তার ভাষায়, আমরা শুধু এসব সমস্যাকে অজুহাত হিসেবে তুলে ধরতে চাই না। বরং জনগণের সামনে বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরার পাশাপাশি এমন ব্যবস্থা নিতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে মানুষকে এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে না হয়। তারেক রহমান বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সক্ষমতা তৈরির জন্য বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ইতোমধ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে সময় লাগে, আবার তা বাস্তবায়ন করতেও কিছুটা সময় প্রয়োজন। ভবিষ্যতে সম্ভাব্য বৈশ্বিক সংকটের বিষয়টি মাথায় রেখেই সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান তিনি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিএনপির অঙ্গীকার তারেক রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিএনপি দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় ধারাবাহিকভাবে কাজ করে আসছে। তিনি বলেন, আমরা এখনো দৃঢ়ভাবে এ বিশ্বাসে বিশ্বাসী। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিএনপির লাখো নেতাকর্মী জীবন দিয়েছেন বলেও উলে¬খ করেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, বিএনপি এমন একটি মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে মানুষ কোনো বাধা ছাড়াই নিজেদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ৫ দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবারের এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। গত মঙ্গলবার কর্মসূচি শুরু হয়ে গতকাল শনিবারের আয়োজনের মধ্য দিয়ে তা শেষ হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, সাবেক বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং দেশের ও দলের জন্য জীবন উৎসর্গকারীদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর বিএনপির দলীয় সংগীত পরিবেশন এবং দলের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।