নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী বাংলা সাপ্তাহিক ঠিকানার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এবং সাবেক সংসদ সদস্য এম এম শাহীনের একটি ফেসবুক পোস্টের সূত্র টেনেই দ্বৈত নাগরিকদের রাজনীতি ও সংসদ সদস্য হওয়া নৈতিকভাবে কতটা যৌক্তিক, তা নিয়েই আজকের আলোচনা। প্রখ্যাত সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এম এম শাহীন তাঁর মন্তব্যে বলেছেন, ‘প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দ্বৈত নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত সাংবিধানিক জটিলতার অবসান। বছরের পর বছর কখনো লিখিত প্রস্তাবে, কখনো ব্যক্তিগত সাক্ষাতে, আবার কখনো প্রকাশ্য বক্তব্যে আমি সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ রহিত বা সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছি। এই দাবির পেছনে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও রয়েছে। প্রায় ৪৬ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করলেও আমি তা এখনো গ্রহণ করিনি। কারণ, একদিকে সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের শপথ করব, অন্যদিকে সাংবিধানিক বিধান লঙ্ঘন করে দেশের আইনপ্রণেতা হওয়ার চেষ্টা করব— এটি কখনোই আমার বিবেক সায় দেয়নি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ খোলা রাখতেই ৫০ বছর আগে থেকে আমাকে সেই সুযোগ ত্যাগ করতে হয়েছে। ১৯৯১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন নির্বাচনে এই বিধান একাধিক প্রার্থীর জন্য আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি করেছে। মামলা হয়েছে, প্রার্থীদের আদালতে যেতে হয়েছে; কোথাও রায় এসেছে, কোথাও বিষয়টি দীর্ঘদিন ঝুলে থেকেছে। অথচ একটি সুস্পষ্ট সাংবিধানিক সংশোধনীই এই সমস্যার স্থায়ী ও আইনসম্মত সমাধান দিতে পারত। আমি বরাবরই বিশ্বাস করি, দেশে জন্মগ্রহণকারী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সামর্থ্যকে যত দ্রুত দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যাবে, বাংলাদেশ তত বেশি উপকৃত হবে।’ এখন প্রশ্ন হলো- দেশের রাজনীতিতে প্রবাসীদের জন্য সাংবিধানিক তালা বিষয়টি কি শুধু দ্বৈত নাগরিকত্বের সমস্যা নাকি রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতাই রাজনৈতিক অধিকারের মূল মানদণ্ড নির্ধারণ করে, তা নিশ্চিত করা। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত লাখো বাংলাদেশি অর্থনীতি, ব্যবসা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও জনকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তাঁরা বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন, আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেন এবং সংকটের সময় সহায়তার হাত বাড়ান। অথচ দেশের রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তাঁদের অংশগ্রহণের প্রশ্নে সংবিধানের একটি বিধান বড় ধরনের সীমারেখা তৈরি করে রেখেছে কেন? এমন প্রশ্ন করাটা বর্তমানে প্রাসঙ্গিক। সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে অথবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার বা স্বীকৃতি দিলে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়ার জন্য অযোগ্য হবেন।’ তবে ৬৬(২ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশি নাগরিকত্বে জন্ম নেওয়া কোনো ব্যক্তি বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জনের পর তা ত্যাগ করলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই অযোগ্যতা প্রযোজ্য হবে না।’ অর্থাৎ বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো মূলত একটি ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে— একজন সংসদ সদস্যের আনুগত্য হতে হবে এককভাবে বাংলাদেশের প্রতি। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থের প্রশ্নে এই যুক্তির গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একুশ শতকের বাস্তবতায় বিদেশে বসবাসকারী বা বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণকারী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তিকে রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ অযোগ্য করে রাখাই কি একমাত্র সমাধানের পথ? আমরা যদি সংবিধান প্রণয়নকালের সময়টিতে ফিরে যাই, অর্থাৎ ১৯৭২ সালে, তাহলে দেখব তখনকার সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন বাংলাদেশের বাইরে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের সংখ্যা, বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থা, দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রচলন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের অর্থনৈতিক ভূমিকা আজকের পর্যায়ে ছিল না। বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকৃত। একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তি বিদেশে দীর্ঘদিন বসবাস করে সেখানকার নাগরিকত্ব অর্জন করলেও তার ভাষা, পরিবার, সংস্কৃতি, সম্পদ, সামাজিক যোগাযোগ এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট থাকতে পারে। নাগরিকত্বের কাগজ বদলালেই জন্মভূমির প্রতি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা বিলীন হয়ে যায়— এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সব সময় মেলে না। আর এখানেই সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া প্রবাসী মানেই বিদেশের প্রতি আনুগত্যশীল— এই ধারণা কতটা যৌক্তিক, সেই বিষয়েও আইনজ্ঞদের পরামর্শ চাওয়া যেতে পারে। যদিও বাংলাদেশের সংবিধানের ভাষায় বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জন এবং বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার বা স্বীকৃতি— দুটি বিষয় পাশাপাশি রাখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এগুলোর প্রকৃতি এক নয়। কোনো দেশে নাগরিকত্ব পাওয়া অনেক সময় দীর্ঘদিনের বসবাস, চাকরি, পরিবার, ব্যবসা কিংবা আইনগত প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। নাগরিকত্ব গ্রহণের অর্থ সব সময় রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তন নয়। একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন এবং যে দেশে বসবাস করছেন সেখানে নাগরিক হিসেবে তাঁর আইনগত অধিকার ভোগ করতে পারেন। তাই বিদেশি নাগরিকত্বকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক অবিশ্বস্ততার প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা কতটা যুক্তিসংগত— এ প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানকে দীর্ঘদিন ধরে প্রধানত রেমিট্যান্সের পরিমাণ দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এটি বাস্তবতার একটি অংশ মাত্র। প্রকৃত অর্থে প্রবাসীদের মধ্যে রয়েছেন আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, আইনজীবী, গবেষক, অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন পেশার দক্ষ মানুষ। তাঁরা যে দেশগুলোতে বসবাস করেন, সেসব দেশের প্রশাসন, প্রযুক্তি, ব্যবসা ও নাগরিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তাঁদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নীতি প্রণয়নে কাজে লাগানো গেলে তা দেশের জন্য সম্পদ হতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, নগর ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মতো ক্ষেত্রে প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হতে পারে। আর এই সুযোগ কাজে লাগানোর অন্যতম ভিত্তি হলো জনগণের প্রতিনিধিত্ব নির্বাচিত হওয়া। বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি অংশ যদি দেশের নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার বা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত বলেই মনে করেন অভিজ্ঞমহল। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন— প্রবাসীদের সংসদে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার অর্থ বিদেশি রাষ্ট্রের স্বার্থকে বাংলাদেশের সংসদে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া নয়— এমন ভ্রান্ত ধারণাও পরিহার করা উচিত। বরং এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে কঠোর স্বচ্ছতা ও স্বার্থসংঘাত নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। যেমন : * বিদেশি সরকারের কোনো পদে থাকা ব্যক্তি সংসদ সদস্য হতে পারবেন না; * বিদেশি সরকারের কাছ থেকে সরাসরি আর্থিক সুবিধা গ্রহণকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ থাকবে; * বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ স্বার্থসংঘাত থাকলে তা প্রকাশ বাধ্যতামূলক হবে; * প্রার্থীর সম্পদ, নাগরিকত্ব ও বিদেশি আর্থিক সম্পর্কের পূর্ণ ঘোষণা দিতে হবে; * জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পদে অতিরিক্ত যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকতে পারে। এদিকে বর্তমান সংবিধানে ৬৬(২ক) যুক্ত হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই বিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশি নাগরিকত্বে জন্ম নেওয়া কোনো ব্যক্তি বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জনের পর তা ত্যাগ করলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ৬৬(২)(গ)-এর অযোগ্যতা আর প্রযোজ্য থাকে না। অর্থাৎ সংবিধান প্রণেতারা পরবর্তীকালে স্বীকার করেছেন, বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জনকারী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তির রাজনৈতিক যোগ্যতার প্রশ্নটি একেবারে অনমনীয় নয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে— বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করলেই যদি রাজনৈতিক অধিকার ফিরে আসে, তাহলে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের জন্য আরও আধুনিক, বাস্তবসম্মত ও সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি করা যাবে না কেন? উল্লেখ্য, ২০২৬ সালে দ্বৈত নাগরিকদের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মহল থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে ৬৬(২)(গ)-এর ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। একই সময়ে দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া এবং আনুগত্যের প্রশ্নে আইনগত ব্যাখ্যা নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। এমনকি নির্বাচন কমিশনের প্রার্থিতা যাচাই নিয়েও ২০২৬ সালে অভিযোগ ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করা এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সেই নাগরিকত্ব ত্যাগ সম্পন্ন হওয়ার মধ্যে পার্থক্য নিয়ে। এসব বিষয় দেখিয়ে দেয়, বর্তমান বিধান শুধু রাজনৈতিক নেতাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাধাই তৈরি করছে না; এর ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ নিয়েও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হচ্ছে। তাহলে কি ৬৬(২)(গ) পুরোপুরি বাতিল বা রহিত করতে হবে? তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা ‘রহিত’ শব্দটির পরিবর্তে পুনর্গঠনের পক্ষে অভিমত দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে একটি আধুনিক বিধান হতে পারে— বিদেশি নাগরিকত্ব থাকা মানেই সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্যতা সৃষ্টি হবে না; বরং প্রার্থীকে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ, বিদেশি রাষ্ট্রের সরকারি পদ থেকে বিচ্ছিন্নতা, বিদেশি সরকারের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ না করা এবং সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাত প্রকাশের বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে সংশ্লিষ্টদের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য যাচাই-বাছাই, সম্পদের পূর্ণ বিবরণীর ঘোষণা, বিদেশি অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিরসনের সুস্পষ্ট বিধানে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে এই আইন পুনর্গঠন করা উচিত। কারণ, প্রবাসীদের কাছ থেকে রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রত্যাশা করা হয়ে থাকে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণের প্রশ্নে দরজা অনেকটাই রুদ্ধ। এই মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখা উচিত, প্রবাসী মানেই বিদেশি নয়। আবার প্রবাসী হলেই তিনি বাংলাদেশের স্বার্থের প্রতি অনুগত, এমন নিশ্চয়তাও নেই। তাই পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়; আচরণ, আনুগত্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে রাজনৈতিক যোগ্যতা নির্ধারণ করাই আধুনিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মাপকাঠি হওয়া উচিত। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ৬৬(২)(গ) সংস্কারের ক্ষেত্রে কয়েকটি নীতি বিবেচনা করা যেতে পারে : * প্রথমত, শুধু বিদেশি নাগরিকত্বকে সংসদ সদস্য হওয়ার স্বয়ংক্রিয় অযোগ্যতার কারণ না করা। * দ্বিতীয়ত, বিদেশি সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সামরিক বা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে থাকা ব্যক্তির জন্য পৃথক অযোগ্যতা রাখা। * তৃতীয়ত, বিদেশি সরকার বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। * চতুর্থত, প্রার্থীর সব নাগরিকত্ব, পাসপোর্ট, বিদেশি সম্পদ ও আর্থিক স্বার্থ প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা। * পঞ্চমত, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থসংঘাত দেখা দিলে তা নিরসনের জন্য স্বাধীন যাচাই-ব্যবস্থা তৈরি করা। * ষষ্ঠত, নির্বাচন কমিশনের কাছে নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত নথি যাচাইয়ের একটি নির্দিষ্ট ও সময়সীমাবদ্ধ প্রক্রিয়া রাখা। * সপ্তমত, সংবিধানের ভাষা এমনভাবে সংশোধন করা, যাতে ‘বিদেশি নাগরিকত্ব’ এবং ‘বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য’কে একই অর্থে ব্যাখ্যা করার সুযোগ কমে যায়। মোদ্দাকথা, সংবিধান কোনো স্থির পাথরের ফলক নয়; সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে জনগণের অধিকার, রাষ্ট্রের প্রয়োজন এবং গণতন্ত্রের কাঠামোও পর্যালোচনা করতে হয়। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ আর ২০২৬ সালের বাংলাদেশ এক নয়। আজকের বাংলাদেশ একটি বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অর্থনীতি, পরিবার, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক যোগাযোগের মাধ্যমে গভীরভাবে যুক্ত। তাই প্রবাসীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্নটি আর কেবল ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব’ বিতর্ক হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আসলে বাংলাদেশি পরিচয়, গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতার নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বিষয়টি ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রবাসী ও প্রবাস-অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এখন প্রয়োজন সেই সম্পৃক্ততাকে আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের এই সাংবিধানিক বাধাটিরও একটি ন্যায়সংগত ও স্থায়ী সমাধান। লেখক : ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক সবুজ বাংলা