আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের স্কুলগুলোতে নতুন করে সংশোধিত পাঠ্যবই হাতে পাবে শিক্ষার্থীরা। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ইতোমধ্যে জানিয়েছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ছয় শতাধিক পাঠ্যবই সংশোধনের কাজ চলছে এবং এ কাজে যুক্ত হচ্ছেন তিন শতাধিক বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ। চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যোগ হচ্ছে দুটি নতুন বিষয়- ‘আনন্দে শেখা’ এবং ‘সমাজ ও সংস্কৃতি’। পর্যায়ক্রমে সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতেও এসব বিষয় চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে সব শ্রেণিতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিকচর্চাকে বাধ্যতামূলক করার কথাও বলা হচ্ছে। বছরের শুরুতেই শতভাগ শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। নিঃসন্দেহে উদ্যোগগুলো আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে এমন একটি সময়ে এগুলো নেওয়া হচ্ছে, যখন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কয়েক বছর ধরে পাঠ্যক্রম পরিবর্তন নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ২০১২ সালের শিক্ষাক্রম অনুসরণের পর ২০২৩ সালে যোগ্যতাভিত্তিক নতুন শিক্ষাক্রম চালু করা হয়। সেখানে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও কার্যক্রমভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই প্রক্রিয়া থমকে যায় এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর সরকার পুরনো কাঠামোয় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ওপর। অল্প সময়ের ব্যবধানে পাঠ্যক্রম, পাঠ্যবই এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসায় শ্রেণিকক্ষে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। শিক্ষককে কখনও নতুন পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে, আবার কিছুদিন পর পুরনো পদ্ধতিতে ফিরে যেতে হয়েছে। অভিভাবকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে ২০২৭ সালের পাঠ্যবই সংশোধনকে একটি সাময়িক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে এনসিটিবি যখন ২০২৮ সালে আরও বড় পরিবর্তন বা সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষাক্রমের পরিকল্পনার কথা বলছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি আবারও নতুন পরিবর্তনের চক্রে প্রবেশ করতে যাচ্ছে? এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- বই বদলালেই কি শিক্ষার প্রকৃত সংকটের সমাধান হবে? প্রয়োগভাষা ও শিক্ষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা বিবেচনা করলে দেখা যায়, সমস্যার একটি বড় অংশ পাঠ্যবইয়ের ভেতরে নয়, বরং পাঠ্যবইটি কীভাবে পড়ানো হচ্ছে তার মধ্যে। একটি আধুনিক ও আকর্ষণীয় পাঠ্যবই অবশ্যই শিক্ষার্থীর শেখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সেই বই পড়ানোর জন্য শিক্ষক যদি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না পান, শ্রেণিকক্ষে যদি অতিরিক্ত শিক্ষার্থী থাকে কিংবা পরীক্ষায় যদি শেষ পর্যন্ত মুখস্থনির্ভর প্রশ্নই করা হয়, তাহলে বইয়ের মলাট বা বিষয়বস্তু পরিবর্তন করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। ২০২৩ সালের যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এর অনেক ধারণাই ছিল আধুনিক ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক। কিন্তু মাঠপর্যায়ে অনেক শিক্ষক নতুন মূল্যায়নপদ্ধতি ও পাঠদান কৌশল নিয়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ পাননি। একই সঙ্গে অনেক অভিভাবকও নতুন পদ্ধতির উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া বুঝতে সমস্যায় পড়েছিলেন। ফলে একটি ভালো ধারণা বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে বিতর্কিত হয়ে ওঠে। ভবিষ্যৎ শিক্ষাক্রম সংস্কারে তাই শুধু ‘কী শেখানো হবে’ নয়, ‘কীভাবে শেখানো হবে’ এবং ‘কে শেখাবেন’- এই প্রশ্নগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ভাষাশিক্ষার ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও স্পষ্ট। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ইংরেজি ভাষা শিক্ষায় যোগাযোগভিত্তিক পদ্ধতি বা ঈড়সসঁহরপধঃরাব খধহমঁধমব ঞবধপযরহম (ঈখঞ) অনুসরণের কথা বলা হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের শুধু ব্যাকরণ বা শব্দার্থ শেখানো নয়, বরং বাস্তব পরিস্থিতিতে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের দক্ষতা তৈরি করা। কিন্তু অনেক শ্রেণিকক্ষে এখনও শিক্ষককেন্দ্রিক পাঠদান, অনুবাদ, ব্যাকরণচর্চা এবং পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট উত্তর মুখস্থ করার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে পাঠ্যক্রমে যোগাযোগমুখী শিক্ষার কথা থাকলেও বাস্তব শ্রেণিকক্ষে তার প্রয়োগ সীমিত থেকে যায়। নতুন সংশোধনীতে ইংরেজি সংস্করণসহ পাঠ্যবই হালনাগাদ করা হলেও শিক্ষকদের ভাষাগত দক্ষতা, শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার কৌশল এবং বাস্তব যোগাযোগমুখী কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা সমানভাবে জরুরি। একজন শিক্ষার্থী বইয়ে ইংরেজি সংলাপ পড়ে ভাষা শিখবে- এমন ধারণা যথেষ্ট নয়। তাকে সেই ভাষা ব্যবহার করার সুযোগ দিতে হবে; সহপাঠীর সঙ্গে কথা বলা, দলগত আলোচনা, উপস্থাপনা, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব জীবনের পরিস্থিতিতে ভাষা ব্যবহারের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ বই পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষক-প্রশিক্ষণ কাঠামোরও সমান্তরাল পরিবর্তন প্রয়োজন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শহর ও গ্রামের শিক্ষার সুযোগের বৈষম্য। একটি নতুন শিক্ষাক্রমে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, দলগত কাজ কিংবা বিভিন্ন সৃজনশীল কার্যক্রম রাখা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি বিদ্যালয়ে সেই কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, প্রযুক্তি বা শিক্ষা উপকরণ আছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি। ঢাকার একটি বিদ্যালয় এবং প্রত্যন্ত চরাঞ্চল বা পাহাড়ি এলাকার একটি বিদ্যালয় একই বই পেলেই যে একই ধরনের শিক্ষার সুযোগ তৈরি হবে, তা নয়। শিক্ষাক্রমের সাফল্য বিচার করতে হলে তাই বই বিতরণের সংখ্যার পাশাপাশি বাস্তব শিক্ষার পরিবেশের বৈষম্যও দেখতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার প্রশ্নটিও এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ‘আনন্দে শেখা’, ‘সমাজ ও সংস্কৃতি’ কিংবা বাধ্যতামূলক খেলাধুলা শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্য নতুন শিক্ষাক্রমে কতটা প্রতিফলিত হবে, সেটিও ভাবতে হবে। দেশের প্রান্তিক ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ এখনও সীমিত। তাদের জীবন, ভাষা, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা পাঠ্যবই এবং শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমে যথাযথভাবে স্থান না পেলে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার লক্ষ্য পূর্ণতা পাবে না। একইভাবে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিকচর্চা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয় হলেও বাস্তবায়নের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। যে বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নেই, পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই কিংবা সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনার উপকরণ নেই, সেখানে শুধু পাঠ্যক্রমে বিষয়টি বাধ্যতামূলক ঘোষণা করলেই পরিবর্তন আসবে না। নীতির সঙ্গে অবকাঠামো ও অর্থায়নের সামঞ্জস্য থাকতে হবে। সব মিলিয়ে ২০২৭ সালের পাঠ্যবই সংশোধন শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী করার একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু এটিকে সামগ্রিক শিক্ষা সংস্কারের বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ঘন ঘন শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটি স্থিতিশীল কাঠামো তৈরি করা জরুরি। কারণ শিক্ষার পরিবর্তন শুধু বইয়ের পাতায় ঘটে না। সেটি ঘটে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর কথোপকথনে, প্রশ্ন করার স্বাধীনতায়, শেখার আনন্দে, মূল্যায়নের ধরনে এবং একটি শিশুর নিজের ভাষা ও অভিজ্ঞতাকে শ্রেণিকক্ষে সম্মান দেওয়ার মধ্যে। বইয়ের মলাট বদলানো তুলনামূলক সহজ; শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা বদলানো অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ ও পরিশ্রমসাধ্য। আর সেই বাস্তবতা কতটা বদলাতে পারছি- সেখানেই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের সাফল্য বা ব্যর্থতার আসল পরীক্ষা। লেখক : গবেষক ও শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়