বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আসার অন্যতম প্রধান খাত জনশক্তি রফতানিতে মন্দাবস্থা দেখা দিয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবছরের আট মাসে প্রায় ৩২ শতাংশ রফতানি কমেছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, গত বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে গিয়েছে ৭ লাখ ৩৯ হাজার ৮৭০ জন। এ বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৬৮০ জন গিয়েছে। এ চিত্র থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, জনশক্তি রফতানি খাতটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, জনশক্তি রফতানির প্রধানতম ডেস্টিনেশন মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশেও কমেছে। ২০১৮ সাল থেকে ওমান, বাহরাইন, মালয়েশিয়া, মৌরিতানিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে জনশক্তি রফতানি বন্ধ কিংবা কমে গেছে। এর মধ্যে গত ছয় মাস ধরে চলা ইরানযুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জনশক্তি রফতানি শঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। সেসব দেশ থেকে অনেকে দেশে ফিরে আসছে। ইউক্রেনযুদ্ধের সময় থেকে চলা এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ইরানযুদ্ধ। এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাতে পড়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জনশক্তি রফতানির বাজার সম্প্রসারিত করার নতুন নতুন ডেস্টিনেশন খোঁজার কাজ শুরু করেছে সরকার। জনশক্তি রফতানি কমে যাওয়ার কারণ ইরানযুদ্ধ ও ইউক্রেনযুদ্ধ হলেও কিছু বেসরকারি রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি যথাযথ কাগজপত্র ছাড়া অবৈধভাবে লোক পাঠানোর কারণে দেশগুলোতে বাংলাদেশের ভাবমযার্দা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এর প্রভাব জনশক্তি রফতানিতে পড়ছে। জনশক্তি রফতানি কমে যাওয়ার এই প্রবণতায় রেমিট্যান্স যেমন কম আসছে, তেমনি বেকারত্বের হার বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দেশে যথেষ্ট কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই শ্রমিক শ্রেণীসহ কমশিক্ষিত তরুণদের। ফলে স্বচ্ছল জীবনের আশায় তারা জমিজিরাত, ভিটামাটি বিক্রি করে হলেও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে ছুটে যায়। অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র ও বিপদসঙ্কুল বনজঙ্গল পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে। প্রায়ই এ ধরনের ট্র্যাজিক ঘটনা দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তার উপর অসাধু সিন্ডিকেটের কারণে অনেকে যথাযথ কাগজপত্রের অভাবে বিদেশ গিয়ে গ্রেফতার হয়। তারা সর্বস্ব খুইয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে এই সিন্ডিকেট অন্যতম প্রতিবন্ধক হয়ে রয়েছে। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলের নেতা ডা. শফিকুর রহমানও জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ভাঙার কথা বলেছেন। বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানিকে কেন্দ্র করে যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তা বিলুপ্ত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া গিয়ে জনশক্তি রফতানির প্রতিবন্ধকতা দূর করাসহ রফতানির দ্বার উন্মোচন করে দেয়ার জন্য দেশটির প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানিয়েছেন। মালয়েশিয়া সরকারও তাতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের কারসাজি এখনো কমেনি। এতে জনশক্তি রফতানি পুরোপুরি সচল হয়নি। দেশের অর্থনীতির আরেক প্রধান রফতানি খাত গার্মেন্টেও মন্দাবস্থা চলছে। এ খাতেও ইরানযুদ্ধে সৃষ্ট গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। যদিও বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে কোনো গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়নি। তবে উৎপাদনে ধীর গতি তৈরি হয়েছে। এতে রফতানি কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। ইরানযুদ্ধের কারণে ক্রেতারাও অর্ডার দেয়া নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিল। কেউ কেউ অর্ডার স্থগিত কিংবা পিছিয়ে দিয়েছে। এখন গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট কাটতে শুরু করেছে। দুই-তিন মাস পর এ খাতের অভিঘাতটা বোঝা যাবে। দেখা যাচ্ছে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান দুটি খাত গার্মেন্ট ও জনশক্তি রফতানিতে ঋণাত্মক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করে এগুলোর রফতানির পথ মসৃণ করতে না পারলে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, দ্রুতই ইরানযুদ্ধের অবসান হবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। যুদ্ধে সউদী আরব, কাতার, ওমানসহ অন্যদেশগুলোর স্থাপনা ও ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধ শেষ হলে এসব দেশে বিপুল কর্মযজ্ঞ শুরু হবে। তাতে অনেক শ্রমিক ও লোকবলের প্রয়োজন হবে। এটি বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে নতুন করে চাঙা করতে সহায়তা করবে। এজন্য দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুারোসহ সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে জনশক্তি রফতানির সব ধরনের প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে, যাতে যুদ্ধোত্তর পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার দ্রুত ধরা যায়। শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, নতুন নতুন শ্রমবাজারের সন্ধান করতে হবে। ইউরোপের দেশগুলো এখন শ্রমশক্তি রফতানির বড় বাজারে পরিণত হয়েছে। দেশগুলোতে বয়স্ক লোকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সেখানে শ্রমজীবীর সংখ্যা কমে গেছে। কাজ করার মতো লোকের অভাব দেখা দিয়েছে। সেসব দেশে জনশক্তি রফতানির বড় সুযোগ রয়েছে। জাপান ও চীন বড় শ্রমবাজার হতে পারে। দেশ দুটিতে জন্মহার প্রায় শূন্যতে নেমে আসায় কাজ করার মতো লোকবল কমছে। তবে সবার আগে প্রয়োজন বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারের উপর সমীক্ষা চালানো। দেশগুলোতে কোন কোন খাতে কী ধরনের লোকবল প্রয়োজন, তা নির্দিষ্ট করে সে অনুযায়ী লোকজনকে প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিখিয়ে পাঠালে সহজে দেশগুলোর শ্রমবাজার ধরা যাবে। আমাদের দেশে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত তাদের দেশের স্বার্থরক্ষাসহ ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য যেভাবে সারাদেশ চষে বেড়ান, এ তুলনায় বিদেশে আমাদের রাষ্ট্রদূতরা কিছুই করছেন না। অথচ সংশ্লিষ্ট দেশে জনশক্তি রফতানির বাজার তৈরি করতে, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে তাদের যথেষ্ট করণীয় রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি এ ধরনের নির্দেশনা থাকা জরুরি।