প্রকাশ :: ... | ... | ...

কৃষিকে ঘিরেই বদলে গেছে দামাওয়ের অর্থনীতি


সংযুক্ত ছবি

প্রকল্প কর্মকর্তা ওয়েই কথা প্রসঙ্গে জানালেন, দামাওর মডেলে যৌথ খামারের ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় মানুষকে শুধু শ্রমিক হিসেবে নয়, প্রকল্পের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের অংশীদার করার চেষ্টা করা হয়েছে। কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি পর্যটন, আবাসন ও স্থানীয় সেবায় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো হয়েছে। এতে একটি পরিবারের আয়ের উৎস একটিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কৃষির আয় মৌসুমভেদে ওঠানামা করতে পারে। তার সঙ্গে পর্যটন ও সেবাখাত যুক্ত হলে বছরের অন্য সময়েও আয় করার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে কৃষিকে কেন্দ্র করে একটি বহুমুখী আয় কাঠামো গড়ে উঠেছে। দামাওর ক্ষেত্রে অবশ্য এই পরিবর্তনকে শুধু পর্যটনের সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে রয়েছে অবকাঠামো, কৃষি প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ। দামাওর উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় সংস্কৃতিকেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। লি জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য, স্থানীয় উৎসব, শিল্পকলা ও গ্রামীণ জীবনধারাকে পর্যটনের অভিজ্ঞতার অংশ করা হয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিল্পমেলা ও প্রকৃতি-ভিত্তিক শিক্ষাকর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য নতুন আকর্ষণ তৈরি হয়। এখানেও একই নীতি কাজ করছে যা স্থানীয় সম্পদকে একটি মাত্র ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না। সংস্কৃতি শুধু সংরক্ষণের বিষয় নয়, সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি স্থানীয় অর্থনীতিরও অংশ হয়ে উঠছে। দামাওতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বিষয়ে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা কৃষিকাজ, প্রকৃতি ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। কৃষিকে নতুন প্রজন্মের কাছে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পেশা হিসেবে তুলে ধরারও চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর ফলে পর্যটনের সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করে একটি নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করা হয়েছে। প্রায় দুই দশক আগের দামাওর সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। তখন ছিল কাঁচা রাস্তা, সীমিত অবকাঠামো ও ঐতিহ্যনির্ভর কৃষি। এখন সেখানে পরিচ্ছন্ন রাস্তা, পরিকল্পিত সবুজায়ন, আধুনিক কৃষি অবকাঠামো, পর্যটন সুবিধা ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থা। কিন্তু এই পরিবর্তনের মূল বিষয় শুধু রাস্তা, ভবন কিংবা সৌন্দর্যায়ন নয়। এসব অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন কর্মকাণ্ডও তৈরি করা হয়েছে। একটি গ্রাম তখনই অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে। দামাওর মডেলে কৃষিকে পর্যটন, শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করে সেই বহুমুখী কর্মকাণ্ড তৈরির চেষ্টা দেখা যায়। যদিও বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির বাস্তবতা চীনের হাইনানের সঙ্গে এক নয়। জনসংখ্যা, জমির পরিমাণ, প্রশাসনিক কাঠামো, বিনিয়োগ সক্ষমতা ও পর্যটন অবকাঠামোয় রয়েছে বড় পার্থক্য। ফলে দামাওর মডেল হুবহু বাংলাদেশে প্রয়োগের সুযোগ নেই। তবে এর ধারণাগত কিছু দিক বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে। দেশের পাহাড়, চা-বাগান, হাওর, নদীবেষ্টিত গ্রাম, চর ও উপকূলীয় এলাকায় কৃষি ও প্রকৃতিকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় পরিবারের বাড়িকে হোমস্টেতে রূপ দেওয়া, কৃষিপণ্যের সঙ্গে পর্যটনের সংযোগ তৈরি, স্থানীয় খাবার ও সংস্কৃতিকে পর্যটন পণ্যের অংশ করা এবং পরিবেশ রক্ষা করে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার মতো উদ্যোগ বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। শুধু পর্যটনকেন্দ্র বানিয়ে দিলে স্থানীয় মানুষের আয় বাড়বে এমন নিশ্চয়তা নেই। জমি, কৃষি, পানি, পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতির ওপর চাপ তৈরি না করে কীভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো যায় এ নিয়ে বাস্তবমুখি পরিকল্পনা প্রয়োজন। যা দামাও ওশান ইকো-ভিলেজ বাস্তবে পরিণত করে দেখিয়েছে। একই সঙ্গে কৃষিকে ঘিরে বদলেছে দামাওয়ের অর্থনীতিও। দামাওর অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, গ্রামীণ উন্নয়নকে শুধু কৃষি উৎপাদন কিংবা অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্থানীয় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকেও পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে দামাও ওশান ইকো-ভিলেজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ভবন কিংবা সড়ক নয়, মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কেউ ফলের বাগানে কাজ করছেন, কেউ কৃষি প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত, কেউ পর্যটকদের খাবার দিচ্ছেন, কেউ নিজের বাড়িতে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করছেন। আবার কেউ স্থানীয় সংস্কৃতি ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ উন্নয়নের ধারণাটি এখানে শুধু ‘কী তৈরি হলো’—এই প্রশ্নে আটকে নেই; বরং ‘কে এর মাধ্যমে আয় করছে’ এবং ‘স্থানীয় অর্থনীতিতে কী নতুন সুযোগ তৈরি হলো’—এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রকৃতিকেও এখানে শুধু সৌন্দর্য হিসেবে দেখা হয়নি। পাহাড়, জলাধার, কৃষিজমি, ফলের বাগান ও গাছপালাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ করা হয়েছে। ফলে পরিবেশ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে না দেখে একই পরিকল্পনার মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। আধুনিক শহরের বাইরে দামাওতে গিয়ে বোঝা গেল, একটি অঞ্চলের অর্থনীতির পরিবর্তনের গল্প শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা বড় বিনিয়োগের মধ্যে থাকে না। অনেক সময় সেই গল্প লেখা হয় গ্রামের মাটিতে যেখানে কৃষি শুধু ফসল ফলানোর বিষয় নয়, কর্মসংস্থানের ভিত্তি; জমি শুধু উৎপাদনের জায়গা নয়, পর্যটনের সম্পদ; আর স্থানীয় মানুষ শুধু উন্নয়নের সুবিধাভোগী নন, উন্নয়নের অংশীদারও।