টমেটো বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান, সুস্বাদু ও পুষ্টিকর সবজি। এক সময় এটি কেবল শীতকালেই পাওয়া যেত, তবে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির কল্যাণে এখন বছরজুড়েই বাজারে টমেটোর সরবরাহ থাকছে। ভিটামিন 'এ' এবং 'সি'-সমৃদ্ধ এই সবজিটির যেমন রয়েছে ব্যাপক অভ্যন্তরীণ চাহিদা, তেমনি রয়েছে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। সঠিক পরিকল্পনা এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে টমেটো চাষ করলে কম পুঁজিতে বিপুল লাভ করা সম্ভব। প্রান্তিক চাষি থেকে শুরু করে উদ্যোক্তাদের জন্য টমেটো চাষের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের বিস্তারিত তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো: ১. উপযুক্ত মাটি, জলবায়ু ও জমি নির্বাচন টমেটো চাষের সাফল্যের প্রথম শর্ত হলো সঠিক জমি ও মাটি নির্বাচন। * মাটির গুণাগুণ: পানি নিষ্কাশনের চমৎকার সুবিধাযুক্ত উর্বর দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি টমেটো চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। মাটির পিএইচ (pH) মান ৫.৫ থেকে ৬.৮ এর মধ্যে থাকলে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়। * জলবায়ু ও তাপমাত্রা: টমেটো মূলত মৃদু শীতকালীন ফসল। চারা বৃদ্ধির জন্য ২০ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ফলন পরিপক্ব হওয়ার জন্য ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আদর্শ। রাতের তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে বা দিনের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে গেলে পরাগায়ন ব্যাহত হয় এবং ফুল ঝরে পড়ে। ২. মৌসুম ও সময়োপযোগী উন্নত জাতসমূহ বাংলাদেশে মূলত তিনটি মৌসুমে টমেটো চাষ করা যায়। মৌসুম অনুযায়ী জাত নির্বাচন করা জরুরি: * আগাম মৌসুম (আশ্বিন-কার্তিক / সেপ্টেম্বর-অক্টোবর): বারি টমেটো-৪, বারি টমেটো-৫ এবং বিভিন্ন হাইব্রিড জাত। * ভরা বা শীতকালীন মৌসুম (অগ্রহায়ণ-পৌষ / নভেম্বর-ডিসেম্বর): হাইব্রিড বাহুবলি, মালিক ২৭২৮, বিউটিফুল২, বারি টমেটো-২ (রতন),বারি টমেটো-১৪, বারি টমেটো-১৫ এবং রোমা, বাহার, সিনজেনটা-৮২-এর মতো জনপ্রিয় জাত। * গ্রীষ্মকালীন মৌসুম (বৈশাখ-শ্রাবণ / মে-জুলাই): এই সময়ে চাষের জন্য পলিথিনের শেড বা বিশেষ শেড প্রয়োজন হয়। উপযুক্ত জাতের মধ্যে রয়েছে বারি টমেটো-৪, বারি টমেটো-৮, বারি টমেটো-১০, এবং বারি হাইব্রিড টমেটো-৫ ও ১১। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি ও চারা উৎপাদন সুস্থ ও সবল চারার ওপরই নির্ভর করে ভালো ফলন। তাই বীজতলা তৈরিতে বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে। * বীজতলা প্রস্তুতকরণ: রোদযুক্ত এবং উঁচু স্থানে ৩ মিটার দীর্ঘ ও ১ মিটার চওড়া বেড তৈরি করতে হবে। দুটি বেডের মাঝে অন্তত ৬০ সেন্টিমিটার নালা রাখতে হবে পানি নিষ্কাশন ও চলাচলের জন্য। মাটির সাথে পচা গোবর ও সামান্য টিএসপি সার ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। * বীজ শোধন ও বপন: বীজ বপনের আগে প্রোভ্যাক্স বা কার্বেনডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন করে নিলে চারা ধসা রোগ হয় না। বীজ ১-১.৫ সেন্টিমিটার গভীরে লাইনে বপন করতে হবে। * চারার যত্ন: তীব্র রোদ বা বৃষ্টি থেকে চারাকে রক্ষার জন্য ওপরে পলিথিন বা চটের ছাউনি দেওয়া যেতে পারে। বপনের ২৫-৩০ দিন পর (চারার উচ্চতা ১০-১২ সেমি হলে) এটি মূল জমিতে রোপণের উপযোগী হয়। ৪. মূল জমি প্রস্তুত ও সুষম সার ব্যবস্থাপনা টমেটো গাছ মাটি থেকে প্রচুর পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে, তাই জমিতে পর্যাপ্ত সুষম সার দেওয়া আবশ্যক। * জমি তৈরি: মূল জমিকে ৪-৫টি গভীর চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে এবং সমতল করে নিতে হবে। জমি তৈরির সময় একর প্রতি ৪-৫ টন পচা গোবর বা কম্পোস্ট সার দিতে হবে। * রাসায়নিক সার প্রয়োগ (একর প্রতি গড় হিসাব): • ইউরিয়া: ১০০-১২০ কেজি • টিএসপি (TSP): ৮০-১০০ কেজি • এমওপি (MOP): ৮০-১০০ কেজি • জিপসাম: ৩০-৪০ কেজি • বোরন ও দস্তা সার: ৫ কেজি করে। * প্রয়োগ পদ্ধতি: ইউরিয়া ও এমওপি সার সমান ৩ কিস্তিতে দিতে হবে (জমি তৈরির সময়, চারা রোপণের ২১ দিন পর এবং ফুল আসার সময়)। বাকি সব সার জমি তৈরির শেষ চাষের সময় মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। * রোপণ দূরত্ব: তৈরি জমিতে ৬০ সেন্টিমিটার দূর পর পর নালা কেটে লাইন করতে হবে। লাইনে চারা থেকে চারার দূরত্ব হবে ৫০ সেন্টিমিটার। চারা সাধারণত বিকালের নরম রোদে রোপণ করা ভালো। ৫. পরবর্তী পরিচর্যা ও সেচ কৌশল চারা রোপণ করলেই কাজ শেষ নয়, সর্বোচ্চ ফলন পেতে নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন: * সেচ ব্যবস্থাপনা: টমেটো গাছে রসের ঘাটতি হলে ফল ফেটে যায়। চারা রোপণের পর হালকা সেচ দিতে হবে। পরবর্তীতে মাটির আর্দ্রতা বুঝে ১০-১৫ দিন পর পর সেচ দিতে হবে। ফুল আসার পর এবং ফল ধরার পর জমিতে যেন কখনোই জো বা রসের ঘাটতি না হয়। * খুঁটি দেওয়া বা স্ট্যাকিং: টমেটো গাছ দ্রুত বাড়ে এবং ফলের ভারে হেলে পড়ে। ফল মাটিতে ঠেকলে পচন ধরে এবং পোকার আক্রমণ বাড়ে। তাই চারা রোপণের এক মাসের মধ্যে বাঁশের খুঁটি ও সুতা দিয়ে মাচা বা 'টি' আকৃতির সাপোর্ট দিয়ে গাছ সোজা রাখতে হবে। * ডাল ছাঁটাই বা প্রুনিং: গাছের গোড়ার দিকের অপ্রয়োজনীয় চোষক ডাল (Side suckers) ও মরা পাতা নিয়মিত কেটে দিতে হবে। এতে গাছ পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পায় এবং ফলের আকার বড় হয়। ৬. প্রধান রোগবালাই ও সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা (IPM) টমেটো চাষে রোগবালাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে পুরো ফসল নষ্ট হতে পারে। * নাবি ধসা রোগ (Late Blight): কুয়াশাচ্ছন্ন ও ভেজা আবহাওয়ায় এই রোগ বাড়ে। পাতা ও ফলে ভেজা চকোলেট রঙের দাগ পড়ে। প্রতিকারের জন্য ম্যানকোজেব বা মেটালাক্সিল গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন- রিডোমিল গোল্ড) ৭ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। * ঢলে পড়া রোগ (Bacterial Wilt): ব্যাকটেরিয়ার কারণে গাছ হঠাৎ পাতা সবুজ থাকা অবস্থায়ই ঝিমিয়ে পড়ে ও মারা যায়। এর কোনো কার্যকর ওষুধ নেই। আক্রান্ত গাছ তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং জমিতে চুন প্রয়োগ করতে হবে। * ফল ছিদ্রকারী পোকা: এই পোকা ফলের ভেতর ঢুকে কুড়ে কুড়ে খায়। দমনের জন্য জমিতে ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে। আক্রমণ তীব্র হলে স্পিনোস্যাড বা ক্লোরপায়রিফস গ্রুপের বালাইনাশক স্প্রে করতে হবে। * পাতা কোঁকড়ানো রোগ (Leaf Curl): এটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাদা মাছি দ্বারা ছড়ায়। সাদা মাছি দমনের জন্য ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রুপের কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। ৭. ফসল সংগ্রহ, বাজারজাতকরণ ও ফলন * সংগ্রহের সময়: চারা রোপণের ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে জাতভেদে ফল সংগ্রহ শুরু করা যায়। স্থানীয় বাজারের জন্য ফল সামান্য লালচে হলে এবং দূরবর্তী বাজারের জন্য ফল পরিপক্ব সবুজ কিন্তু হালকা হলদে বা গোলাপি ভাব এলে (ব্রেকার স্টেজ) বোঁটাসহ সংগ্রহ করতে হবে। * গ্রেডিং ও প্যাকিং: সংগ্রহের পর ভালো ও দাগহীন টমেটো আলাদা করতে হবে। প্লাস্টিকের ক্যারেটে বা শক্ত কাগজের কার্টনে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন একটির ওপর অন্যটির অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। * ফলন: আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ করলে উন্নত জাতভেদে প্রতি একরে ১২ থেকে ১৮ টন এবং হাইব্রিড জাতে ২০ থেকে ২৫ টন পর্যন্ত টমেটোর বাম্পার ফলন পাওয়া সম্ভব।