প্রকাশ :: ... | ... | ...

ইয়েমেনে হুতিদের উত্থান : মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি


সংযুক্ত ছবি

ইয়েমেনে হুতিদের সাম্প্রতিক দ্রুত উত্থানকে শুধু একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সামরিক সাফল্য হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য ধরা পড়বে না। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, হুতিরা এখন ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব, সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠছে। এর মধ্যেই হুতিরা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা- মোখা বন্দর এবং বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি কয়েকটি কৌশলগত দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ফলে লোহিত সাগর থেকে এডেন উপসাগরে প্রবেশের অন্যতম সামুদ্রিক পথটি হুতিদের সামরিক সক্ষমতার আরও কাছাকাছি চলে এসেছে। হুতিদের এমন বিস্ময়কর উত্থানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহের ভবিষ্যৎ নিয়েই আজকের আলোচনা। প্রথমমত. ইরানের মদদপুষ্ট ইয়েমেনের হুতিদের অবিশ্বাস্য উত্থানে বদলাচ্ছে যুদ্ধের মানচিত্র। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আর শুধু স্থলভাগের যুদ্ধ নয়। সমুদ্রপথ, বন্দর, দ্বীপ, তেল পাইপলাইন এবং জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামো এখন যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ- বাব আল-মান্দাবের মতো সংকীর্ণ সমুদ্রপথের কাছে হুতিদের অবস্থান শক্তিশালী হলে ইউরোপ-এশিয়া বাণিজ্যপথ এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহনের ওপর প্রচণ্ড চাপ বাড়তে পারে। লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বিস্তৃত হবে। দ্বিতীয়ত. সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর জন্যও বড় পরীক্ষা। হুতিদের সাফল্য সৌদি আরবের জন্য ভয়ঙ্কর বার্তা। কারণ- দীর্ঘ সময় ধরে সৌদি আরব ইয়েমেনে সশস্ত্র হুতিদের মোকাবিলায় স্থানীয় মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল ছিলো। কিন্তু হুতিদের সাম্প্রতিক সাফল্যে, সেই হুতি বিরোধী মিত্ররাও এখন তাদের সমর্থন জানাচ্ছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের অগ্রগতিতে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি মিত্রদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়েছে এবং হুতিরা কৌশলগত এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। একই সময়ে সৌদি আরব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সরঞ্জাম নিয়েও চাপের মুখে পড়েছে বলে এমন তথ্য প্রকাশ করেছে এপি। এখানে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে— সৌদি আরব নিজের নিরাপত্তার জন্য কতটা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করবে এবং কতটা নিজস্ব আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলবে। তৃতীয়ত. হুতিদের বিস্ময়কর উত্থানে ইরানের প্রভাবের নতুন মাত্রা পেয়েছে। কারণ- হুতিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বহুদিনের। তেহরান হুতিদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলেও হুতিদের সব সিদ্ধান্ত যে সরাসরি ইরানের নির্দেশে হয়— এমন সরলীকরণও ঠিক নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে হুতিদের সাফল্য ইরানের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করছে। কারণ একদিকে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব। অন্যদিকে বাব আল-মান্দাবের কাছে হুতিদের শক্ত অবস্থান। এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথ একই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে। এ কারণেই হুতিদের উত্থানকে অনেক বিশ্লেষক ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের বৃহত্তর সাফল্য হিসেবে দেখছেন। চতুর্থত. হুতিদের এমন উত্থান এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ভূমিকায় শঙ্কা তৈরি হয়েছে। হুতিদের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেও তাদের স্থায়ীভাবে দুর্বল করা যায়নি। বরং বছরের পর বছর যুদ্ধের মধ্যেও হুতিদের জনবল, অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতা বেড়েছে বলে জানিয়েছে পশ্চিমা গণমাধ্যম এপি। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব আবারও হুতিদের দমনে ওয়াশিংটনের সহায়তা পেতে চায়। রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি নেতৃত্ব হুতিদের নিয়ন্ত্রণে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সহায়তা চেয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে— যুক্তরাষ্ট্র কি আগের মতো আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রধান গ্যারান্টর থাকবে, নাকি সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা কৌশল নতুন করে নির্ধারণ করবে? পঞ্চমত. হুতিদের উত্থানের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। হুতিদের নিয়ন্ত্রিত বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ দীর্ঘ হতে পারে, পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে এবং তেলের বাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে হুতিদের বিস্ময়কর উত্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাতের জেরে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ফলে সৌদি তেল অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং বিকল্প রপ্তানি পথের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এর অর্থ হলো— মধ্যপ্রাচ্যের একটি স্থানীয় সংঘাত শেষ পর্যন্ত জ্বালানি, পরিবহন ব্যয়, আমদানি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ষষ্ঠত. হুতিদের উত্থান ইয়েমেনের যুদ্ধ আবার আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখানেই। রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ইয়েমেনের সংঘাত বহু বছর ধরে চললেও সাম্প্রতিক হুতিদের উত্থান এটিকে আবার বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের কেন্দ্রে নিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, হুতিদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা ও সামুদ্রিক প্রবেশপথের নিয়ন্ত্রণ বাড়লে সৌদি আরব, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা বাড়তে পারে। এতে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমাধানের পথ আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর এর সবচেয়ে বড় মানবিক মূল্য দিতে হচ্ছে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষকে। সাম্প্রতিক সংঘাতে লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যেখানে দীর্ঘদিনের যুদ্ধের কারণে খাদ্য ও মানবিক সংকট আগে থেকেই তীব্র। মোদ্দাকথা, হুতিদের বর্তমান উত্থান মধ্যপ্রাচ্যে মূলত একটি পরিবর্তিত বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে— কোনো রাষ্ট্রের সামরিক শক্তির পাশাপাশি অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীও এখন একটি দেশের সীমান্তের বাইরে গিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বাব আল-মান্দাবের মতো একটি কৌশলগত সমুদ্রপথের কাছে হুতিদের শক্ত অবস্থান সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। এর সঙ্গে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, সৌদি নিরাপত্তা উদ্বেগ, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার যুক্ত হওয়ায় ইয়েমেনের সংঘাত এখন আর শুধু ইয়েমেনের বিষয় থাকছে না। অর্থাৎ, হুতিদের উত্থানের সবচেয়ে বড় বার্তা হলো— মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য সমুদ্রপথ, বন্দর ও অরাষ্ট্রীয় শক্তির হাতেও নির্ধারিত হচ্ছে। লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক সবুজ বাংলা।