প্রকাশ :: ... | ... | ...

ঢাকা-দিল্লি কূটনৈতিক মহারণ কোন পথে?


সংযুক্ত ছবি

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক যখন রাজনৈতিক আস্থার সংকট, ক্ষমতা ছেড়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু, সীমান্তসহ একাধিক অমীমাংসিত প্রশ্নে টানাপোড়েন চলছেই। প্রতিবেশী দু’দেশের কূটনৈতিক মহারণের ঠিক একই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে চীন। বিশেষ করে জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এবং পরবর্তী সময়ে প্রতিরক্ষা, অবকাঠামো, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতা নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। ফলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের হিসাব-নিকাশে এখন আর শুধু দু’দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়- এ যেন ‘বেইজিং ফ্যাক্টর’। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর তার প্রত্যর্পণ চেয়ে দিল্লির কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা। কিন্তু দিল্লি বরাবরই এই ইস্যুতে চুপ থেকেছে, সাড়া দেয়নি। চলতি বছরের ৫ আগস্ট দিল্লিতে হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্যের পর দু’দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। ঢাকা এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি জোরালো করেছে। এর প্রতি-উত্তরে ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তারা আইনি প্রক্রিয়ার আলোকে পর্যালোচনা করছে। এরই মধ্যে দু’দশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতের ঢাকাস্থ হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। বিষয়টি এমন যেন, দিল্লি একদিকে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে শেখ হাসিনা ও দেশটির জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতেও অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে। অন্যদিকে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি’র একপক্ষীয় কূটনৈতিক মন্তব্যও দু’দেশের সম্পর্কের বিষয়ে বেশ কৌতুহল যোগাচ্ছে। রাজনীতি-কূটনীতিতে তাঁর এখন তেমন প্রভাব না থাকলেও সিকি-মাধুলির মতো হঠাৎ জ্বলে ওঠার ভূমিকায় আওয়ামী লীগের অকৃত্রিম বন্ধুর পরিচয় দিয়েছেন। ঢাকা-দিল্লির সাম্প্রতিক সম্পর্ক নিয়ে রীতিমতো বড় আওয়াজ দিয়েছেন সিক্রি। শেখ হাসিনার দ্রুত দেশে ফেরার প্রক্রিয়া বাংলাদেশ-ভারত সরকারের আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যে বিএনপি সরকারকে ঘিরে সরাসরি প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তার অভিযোগ, বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ভারতবিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়া হচ্ছে, অথচ প্রয়োজনের জায়গায় ভারতের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করছে ঢাকা। তার মতে, এ ধরনের কৌশল সফল হোক বা না হোক, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্তই চালানো সম্ভব। ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির ওয়েবসাইটে গত ২৪ আগস্ট এক কলামে এসব কথা লিখেছেন বীণা সিক্রি। ‘এ স্নাব গন টু ফার? দ্য স্টোরি অব বাংলাদেশ পিএম’স স্টলড ইন্ডিয়া ভিজিট’ শিরোনামের লেখায় তিনি মূলত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৩ থেকে ২৫ আগস্টের সম্ভাব্য ভারত সফর স্থগিত হওয়া, দু’দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গ এবং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট নিয়ে ভারতের অবস্থান তুলে ধরেছেন। বীণা সিক্রির ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের সফরকে কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার মহড়া পর্যায়ে গিয়ে তা বাতিল হওয়া নজিরবিহীন ধরনের ঘটনা। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ঢাকা-দিল্লির এ টানাপোড়েনের আসল সূত্রপাত দিল্লিতে নয়, বেইজিংয়ে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম বড় বিদেশ সফর করেন চীন। গত ২২ থেকে ২৬ জুনের সফরে দু’দশের মধ্যে ১৫টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি এবং একটি যৌথ বিবৃতি স্বাক্ষর হয়েছে। সেখানে অবকাঠামো, বিনিয়োগ, তিস্তা, মোংলা বন্দর, বাণিজ্য ও যোগাযোগ অন্তর্ভুক্ত। দিল্লির অস্বস্তি এখানেই। তিস্তা ও মোংলা ভারতের কাছে শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা, বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং চীনের কৌশলগত উপস্থিতির প্রশ্ন। চীনের সঙ্গে এসব প্রকল্পে বাংলাদেশের আগ্রহকে ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখেছেন সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক বীণা সিক্রি। চীন-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সমঝোতা বেইজিং ফ্যাক্টরের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক সম্ভবত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। গত দুই দশক ধরে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে যুদ্ধজাহাজ, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে। ২০১৯-২০২৩ সময়ে বাংলাদেশের অস্ত্র আমদানির প্রায় ৭৩ শতাংশই চীন থেকে এসেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের উদ্ধৃত তথ্য জানিয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ বড় খবর, বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে জে-১০সিই যুদ্ধবিমান ও আক্রমণকারী হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার দিকে এগোচ্ছে। সরকারি একটি প্যানেল এ বিষয়ে চুক্তির খসড়া তৈরির কাজ করছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। সম্ভাব্য যুদ্ধবিমান সংখ্যা ২৪ পর্যন্ত হতে পারে, যদিও চূড়ান্ত সংখ্যা, মূল্য ও সরবরাহের সময়সূচি এখনো নির্ধারিত হয়নি। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকায়নের পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ নিরাপত্তা সমীকরণেও এর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং একই সঙ্গে চীন-ভারত নিজেদের মধ্যেও দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি হয়নি। তবে ২০২০ সালে চীন-ভারত সীমান্ত সংঘাতের পর বর্তমানে দু’দেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। ২৫ আগস্ট বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছে। দু’পক্ষই সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগোনোর কথা বলেছে। ফলে ভারত থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরে নিয়ে ‘চীন ব্লক’ এ বাংলাদেশের অবস্থান নেওয়া অতিরঞ্জিত ঝুঁকির সম্ভাবনা রয়েছে। বরং ঢাকার উচিত ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য শক্তিধর দেশের সঙ্গে একই সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতিতে কাজ করা। কারণ, বাংলাদেশের জন্য ভারতকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দু’দেশের সীমান্ত, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পানি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংযোগ-সবই পরস্পরনির্ভর। একইভাবে ভারতের পক্ষেও বাংলাদেশকে চীনের দিকে পুরোপুরি ঠেলে দেওয়া কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক নয়। এ কারণেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনের মধ্যেও দু’দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বরং চীনের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতা দিল্লির জন্য একটি নতুন বাস্তবতা-যেখানে বাংলাদেশকে শুধু প্রতিবেশী হিসেবে নয়, বরং নিজের কৌশলগত স্বার্থসম্পন্ন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। ঢাকার সামনে যে চ্যালেঞ্জ বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো- চীনকে উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজে লাগানো, ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা। নিরাপত্তা ও কূটনীতির ভাষায় এটি অনেকটা ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’। বাংলাদেশের জন্য চীন কোনো ভারতের বিকল্প নয়, আবার ভারতও চীনের বিকল্প নয়। প্রত্যেক দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ। সৌদ আরব-তুরস্ক-পাকিস্তান সামরিক জোটে উদ্বেগ ভারতের সৌদ আরব-তুরস্ক-পাকিস্তান সামরিক জোট গঠন আসলে ভারতের জন্য এক বিশাল কৌশলগত মাথাব্যথা। এর মাঝে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই জোট গঠনকে স্বাগত জানানোয় সাধারণ মাথাব্যথা তীব্র মাইগ্রেনে পরিণত হয়েছে। এ বছর ভারত রাশিয়ার সঙ্গে রেলোস চুক্তি করেছে সৈন্য, যুদ্ধজাহাজ, জঙ্গি বিমানসহ সামরিক জোট গঠনের জন্য। বাংলাদেশ হলো এখন তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত ‘ট্রাম্প কার্ড’। বাংলাদেশকে মুসলিম সামরিক জোট, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন থেকে দূরে রাখতে ভারত ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে। চীন সফর করেছেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বহুল আলোচিত অজিত দোভাল। মস্কোতে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। সেপ্টেম্বরে ভারতে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসের সম্মেলন। এতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনের অংশগ্রহণের ব্যাপারে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে দিল্লি। বাংলাদেশকেও কাছে পাবার প্রত্যাশা। যে কারণে ভরসা দিয়ে বলা হচ্ছে, ঢাকাকে দিল্লি এমন কিছু দেবে, যা বাংলাদেশ কখনো ভাবতেও পারছে না। অনেকটা শেখ হাসিনার সেই উক্তি ‘ভারতকে এত কিছু দেওয়া হয়েছে, যা তারা আজীবন মনে রাখবে’র মতো কপি পেস্ট। মোদ্দাকথা, বেইজিং ফ্যাক্টরকে ঢাকার দিল্লিবিরোধী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ককে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের স্বার্থে কাজে লাগিয়ে দিল্লির সঙ্গে সমান্তরালভাবে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা গেলে সেটিই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বাস্তববাদী কৌশল। বর্তমান বাস্তবতায় ঢাকা কীভাবে দিল্লি ও বেইজিং দুই শক্তির মাঝখানে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখবে সেটিই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। লেখক : ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক সবুজ বাংলা