“এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তায় অবদান রাখবে। পাশাপাশি এটি আরও পরিচ্ছন্ন, টেকসই ও অভিঘাত মোকাবিলায় ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ” — শফিকুল আলম, লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট, আইইইএফএ “বাগেরহাটের রামপালে বিদ্যমান ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি নির্মাণ করা হবে। যা ২০২৮ সাল থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন শুরু হবে” — ইঞ্জিনিয়ার রেজাউল করিম, চেয়ারম্যান, বিপিডিবি চলতি সপ্তাহে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদন পেতে পারে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রস্তাব। অনুমোদিত হলে বাগেরহাটের রামপালে ধাপে ধাপে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। ২ হাজার ৫০২ কোটি ৪০ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে নির্মিতব্য এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা কমাতে ভূমিকা রাখবে। আইইইএফএ’র লিড এনার্জি অ্যানালিস্টদের মতে, এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তায় অবদান রাখবে। পাশাপাশি এটি আরও পরিচ্ছন্ন, টেকসই ও অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষম বিদ্যুৎ খাত গড়ে তোলার পথে ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ হবে। তবে বিপিডিবি’র চেয়ারম্যান বলছেন, এ প্রকল্পটি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অব্যবহৃত ৯১৮ দশমিক ৫ একর জমিতে নির্মাণ করা হবে। যা ২০২৮ সাল থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন শুরু হবে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫০২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। যা রামপালে বিদ্যমান ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে নির্মাণ করা হবে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে প্রকল্প এলাকায় জমি ভরাট ও সীমানা সুরক্ষাসহ গুরুত্বপূর্ণ সাইট উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এতে নতুন স্থানে প্রকল্প নির্মাণের তুলনায় (গ্রিনফিল্ড প্রকল্প) নির্মাণ ব্যয় কমার পাশাপাশি বাস্তবায়নের সময়ও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটিতে প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুতের সম্ভাব্য ট্যারিফ ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা ফেনীর সোনাগাজীতে প্রস্তাবিত ২২০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতি ইউনিট আনুমানিক ৮ টাকা ৮৭ পয়সা ট্যারিফের তুলনায় প্রায় ৪৩ শতাংশ কম। বিপিডিবি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) পরিচালিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহারের ফলে প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। প্রস্তাবিত এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) সাবস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত নতুন ২৩০ কিলোভোল্ট সঞ্চালন ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকল্পটি কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা কমাতেও ভূমিকা রাখবে। সেই সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের ওপর পরিবেশগত চাপ কমাতেও এটি সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বার্ষিক বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের বাংলাদেশের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেই সঙ্গে এটি প্যারিস চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের অঙ্গীকার, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যান (আইইপিএমপি)-২০২৩ বাস্তবায়নেও সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ৯১৮ দশমিক ৫ একর অব্যবহৃত জমিতে প্রস্তাবিত সৌর ফোটোভোলটাইক (পিভি) বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হবে। এর আগে জমিটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অব্যবহৃত জমিতে প্রকল্পটি নির্মাণে পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ব্যবহার করা হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জমিকে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে রূপান্তর বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল জ্বালানি অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তায় অবদান রাখবে। পাশাপাশি এটি আরও পরিচ্ছন্ন, টেকসই ও অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষম বিদ্যুৎ খাত গড়ে তোলার পথে ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। প্রকল্পটির বিষয়ে বিপিডিবির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রেজাউল করিম বলেন, ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি অনুমোদন করেছে। সেই সঙ্গে প্রকল্প প্রস্তাবের বিষয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভাও হয়েছে। বাগেরহাটের রামপালে বিদ্যমান ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি নির্মাণ করা হবে। যা ২০২৮ সাল থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন শুরু হবে। উল্লেখ্য, জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্রের (২০২৬-২০৩০) আওতায় ইতোমধ্যে রুফটপ সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ এবং এই খাতে উদ্যোক্তা ও সেবা প্রদানকারীদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে দেশব্যাপী কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার।