প্রকাশ :: ... | ... | ...

এখনও অধরা ৩ জঙ্গিসহ পলাতক ৬০০ কারাবন্দি


সংযুক্ত ছবি

★ হন্যে হয়ে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ★ শনাক্ত হয়নি তিন জঙ্গির পরিচয় ★ উদ্ধার হয়নি লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র, পুরষ্কার ঘোষণা “অপরাধীরাও বাইরে, অস্ত্রও বাইরে, এটা আতঙ্কের ব্যাপার। এসব অস্ত্র ছিনতাই, রাহাজানি ও খুনের মতো অপরাধে ব্যবহার হতে পারে। দ্রুত অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা প্রয়োজন” — জহিরুল হক জুয়েল, এপিপি, নরসিংদী জেলা আদালত “লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে এবং পলাতক জঙ্গিসহ কারাবন্দিদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি গ্রেপ্তার অভিযান চলছে” — মাসুদ হাসান জুয়েল, জেলার (লজিস্টিক ও মিডিয়া), কারা অধিদপ্তর ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন চালাকালে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালানো হয়। এ সময় ৬৯০ জন বন্দি পালিয়ে যান। এসব বন্দিদের মধ্যে ৯০ জন ধরা পড়লেও বাকিরা এখনও অধরা। সবচেয়ে বেশি বন্দি পালিয়ে গেছে নরসিংদী কারাগার থেকে। পলাতক ৯ জঙ্গির মধ্যে ৬ জন ধরা পড়লেও ৩ জন এখনও পলাতক। তাছাড়া তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। তবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা সম্ভাব্য স্থানে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি পলাতক বন্দিদের হন্যে হয়ে খুঁজছে। এছাড়া জুলাই আন্দোলন চলাকালে থানা ও কারাগার ভেঙে অস্ত্রাগার থেকে লুট করা হয়ে বিপুল সংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র। তবে লুণ্ঠিত সব আগ্নেয়াস্ত্র এখনও উদ্ধার করা হয়নি। এই মধ্যে লুণ্ঠিত অস্ত্রের সন্ধানে তথ্যদাতার জন্য পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়েছে। নরসিংদী জেলা আদালতের এপিপি বলছেন, অপরাধীরাও বাইরে, অস্ত্রও বাইরে, এটা আতঙ্কের ব্যাপার। এসব অস্ত্র ছিনতাই, রাহাজানি ও খুনের মতো অপরাধে ব্যবহার হতে পারে। দ্রুত অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা প্রয়োজন। তবে কারা কর্মকর্তারা বলছেন, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে এবং পলাতক জঙ্গিসহ কারাবন্দিদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রতিদিনই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধরা পড়ছে অপরাধী। দেশের ৬৮ কারাগারে এখন ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দি রয়েছে। তবে পলাতকদের নিয়ে উদ্বিগ্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পলাতক বন্দিদের মধ্যে ৬০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, ৩ জন জঙ্গি ও অন্যান্যরা হত্যা, ডাকাতি, ধর্ষণ, মাদক, নারী নির্যাতন ও সন্ত্রাস দমন আইনের মামলার আসামী। পলাতকদের মধ্যে ১৬৬ জনের পরচিয় এখনো মেলেনি। কারণ নরসিংদী কারাগারে হামলার সময় রেকর্ড ও ডাটাবেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে মোট পালিয়েছিল ২২৪৭ জন বন্দি। পলাতক ৯ জঙ্গির মধ্যে ৩ জন এখনও পলাতক রয়েছে। তাদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা। জানা গেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সুযোগে পালিয়ে যাওয়া ২ হাজার ২৪৭ বন্দির মধ্যে এখনো ৬০০ জন অধরা রয়ে গেছেন। এর মধ্যে নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে পালানো ১৬৬ জনের পরিচয় সংক্রান্ত তথ্যই এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কারাগারের সার্ভার, ডেটাবেস ও গুরুত্বপূর্ণ নথি পুড়ে যাওয়ায় তাদের শনাক্ত করতে হিমশিম কারা কর্তৃপক্ষ। পলাতকদের মধ্যে তিনজন জঙ্গি রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের অবস্থানও এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এখনো নরসিংদী থেকে লুট হওয়া ২৭টি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কারও ঘোষণা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কারাগার সূত্র বলছে, বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের বেশির ভাগই বিভিন্ন মামলার সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন আসামি। পলাতকদের গ্রেপ্তারের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। তাদের তথ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ। পুলিশ কর্মকর্তারা বরছেন, কারাগার থেকে পালানো বন্দিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে বিশেষ ইউনিট কাজ করছে। তারা বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছে। পলাতকদের ধরতে বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। তবে পলাতক বন্দির সংখ্যার পাশাপাশি নরসিংদীতে উদ্বেগ বাড়িয়েছে কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার না হওয়ার বিষয়টি। স্থানীয় কারা ও পুলিশের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সময় বিপুলসংখ্যক বন্দি পালিয়ে যান। একই সময় কারাগারের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়। ওই সময় পালিয়ে যাওয়া ৮২৬ বন্দির মধ্যে ৪৮৬ জন আত্মসমর্পণ করেছেন। পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে ১৭৩ জনকে। এখনও ১৬৬ জন পলাতক রয়েছেন। কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, অগ্নিসংযোগে নথিপত্র পুড়ে যাওয়ায় বন্দিদের জামিন, সাজা ও মামলার তথ্য যাচাইয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। আদালত থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে। নরসিংদী কারাগার থেকে লুট হওয়া ৮৫টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ৫৮টি উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে ৫৩টি অস্ত্র ও ১ হাজার ৬৯৮ রাউন্ড গুলি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখনো ২৭টি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার হয়নি। পলাতক বন্দিদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে। কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের পাশাপাশি অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি অংশ বাইরে থাকার বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নরসিংদীর চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও সহিংসতায় কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। নরসিংদী কোর্টের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) জহিরুল হক জুয়েল বলেন, অপরাধীরাও বাইরে, অস্ত্রও বাইরে, এটা আতঙ্কের ব্যাপার। এসব অস্ত্র ছিনতাই, রাহাজানি ও খুনের মতো অপরাধে ব্যবহার হতে পারে। দ্রুত অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা প্রয়োজন। এদিকে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকেও পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের বড় একটি অংশ এখনও অধরা। কারা অধিদপ্তরের জেলার (লজিস্টিক ও মিডিয়া) মাসুদ হাসান জুয়েল জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে ওই কারাগার থেকে ২০২ বন্দি পালিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ৭৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখনো পলাতক ১২৮ জন। পলাতকদের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত, জঙ্গি ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন বলে কারা সূত্র জানিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে। কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত গুরুতর। বিদ্রোহের সময় বন্দিরা কারাগারের দেয়াল ভেঙে ও টপকে পালানোর চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালালে প্রাণহানি ঘটে। এ ঘটনায় কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের তৎকালীন জেলার মোহাম্মদ লুৎফর রহমান পলাতক ২০২ জন বন্দিকে আসামি করে গাজীপুর কোনাবাড়ী থানায় মামলা করেছিলেন। পলাতক জঙ্গিদের বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, কারাগার থেকে মোট ৯ জন তালিকাভুক্ত জঙ্গি পালিয়ে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে ৬ জনকে পুরনায় আটক করা হয়েছে। এদের একজন জুয়েল 'ওস্তাদ' জামিনে বের হয়েছিলেন। সম্প্রতি তাকে পুলিশ আবার গ্রেপ্তার করেছে। তবে এখনও তিনজন জঙ্গি পলাতক রয়েছে। বর্তমানে কারাগারের যে অবস্থা, তাতে কাউকে একেবারে সম্পূর্ণভাবে পৃথক করে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কারা সূত্র জানায়, গত এক বছরে বিভিন্ন অভিযানে তিন হাজারের অধিক মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। শুরুর দিকে সংখ্যাটি অনেক বেশি ছিল। ধীরে ধীরে এখন বিচ্ছিন্নভাবে এ ধরনের ঘটনা কমে এসেছে। কারাগারে চিকিৎসক সংকট রয়েছে। মোট ১৫১টি চিকিৎসক পদ রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র দুজন চিকিৎসক পোস্টেড আছেন। অন্যান্য কারাগারে অস্থায়ীভাবে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে চিকিৎসক দেয়া হচ্ছে। তারা অন্য জায়গায় কর্মরত থাকেন। ফলে তারা কারাগারে ফুলটাইম সময় দিতে পারেন না। এ কারণে সমস্যা হয়। কারা কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, বর্তমানে কারাগারে মোট ৩৭৯ জন বিদেশি বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে ১৭০ জনের সাজা শেষ হয়ে গেছে এবং তারা নিজ নিজ দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন। তাদের বিভিন্ন দূতাবাস ও সরকারের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। ধাপে ধাপে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গত দুই বছরে ১৭ জন বিদেশি বন্দির মরদেহ ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি মরদেহ ভারতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বাকিগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে। সাধারণত তিন মাস পর মরদেহের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে তাদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে এ ধরনের তিনটি মরদেহ বিভিন্ন হিমাগারে সংরক্ষিত আছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। সরকার সিদ্ধান্ত দিলে তাদের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেহেতু তাদের পরিবার বা সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে কেউ মরদেহ নিতে আসছে না, তাই নিয়ম অনুযায়ী পরিচয় ও তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। দেশের কারাগারগুলোতে মোট ৪৫ হাজার বন্দি ধারণ ক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে বন্দির সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। এতে বন্দি নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে কারারক্ষীদের।