★ পরিবারে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী নাহিদুর রহমান তুহিন, তার স্ত্রী ও দুই কন্যা। আগুনে ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও নিখোঁজ এই চারজনের অবস্থান সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রকাশিত হতাহতদের তালিকাতেও তাদের নাম নেই। এতে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটছে স্বজনদের। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিখোঁজ নাহিদুর রহমান (৪১) যশোরের মনিরামপুর পৌরসভার মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে। তিনি ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি এবং দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানাকে (৩) নিয়ে রাজধানী ঢাকায় বসবাস করতেন। রিসোর্টের বুকিং নথি অনুযায়ী, গত ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত দুই রাতের জন্য নাহিদুর রহমান তুহিনের নামে ২০২ নম্বর সুপার ডিলাক্স কক্ষটি বুক করা হয়েছিল। ১৮ অক্টোবর দুপুর ১টায় তাদের রিসোর্ট ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। বুকিংয়ের একটি বিলের কপিও রয়েছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে হাসপাতাল, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেও পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাননি স্বজনেরা। নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স জানান, তার ভাই গত শুক্রবার কক্সবাজার যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। গত শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর পেয়ে তিনি নাহিদুর রহমান তুহিনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেন। কিন্তু ভাই কিংবা তার পরিবারের অন্য কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। পরে গত শনিবার সন্ধ্যায় তিনি নিজেই কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন। জাহিদুর বলেন, আমরা দুই ভাই। মা নেই। অসুস্থ বাবা আমাদের সঙ্গে গ্রামে থাকেন। বাবা এখনো নাহিদুরের খবর জানেন না। তারা বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন, সেটিও নিশ্চিত হতে পারিনি। আমরা খুব উদ্বেগের মধ্যে আছি। নাহিদুর রহমান তুহিনের কর্মস্থল গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা রকিবুজ্জামান জানান, তিনি বর্তমানে চীনে রয়েছেন। অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর তিনি ও প্রতিষ্ঠানের অন্যরা নাহিদুর রহমান তুহিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু কেউই তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। পরিবারের সদস্যরা জানান, নাহিদুর রহমান তুহিন মাভাবিপ্রবির ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের (২০০৪-০৫) শিক্ষার্থী ছিলেন। বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত নাহিদুরের পরিবারের নিখোঁজ হওয়ার খবরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও তার বন্ধুদের মধ্যেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। নাহিদুরের চার বন্ধুও ঘটনাস্থলে গেছেন। তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নাহিদুর রহমান তুহিন ও তার পরিবারের সন্ধানে প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। কিন্তু হাসপাতাল ও প্রশাসনসহ রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কেউই এখনও তাদের কারও অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য জানাতে পারছে না। এতে নাহিদুর রহমান তুহিন আদৌ বেঁচে আছে নাকি আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাঁই হয়েছে, তা নিয়ে গোটা পরিবারসহ সাবেক বন্ধু-বান্ধব ও অফিস কলিগরা দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছেন। এদিকে যশোরের মনিরামপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ছবি প্রকাশ করে উদ্বেগ ও সমবেদনা জানাচ্ছেন। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন উখিয়া উপজেলার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস। প্রথমে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে শৌচাগার থেকে আরও চারজনের মরদেহ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। ১০ মরদেহ শনাক্ত হয়েছে স্বজনদের প্রাথমিক দাবির মাধ্যমে। তাদের মধ্যে নেই নাহিদুর রহমান তুহিন ও তার স্ত্রী-সন্তান। তবে আনুষ্ঠানিক শনাক্ত হবে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করে। তারপরেই বোঝা যাবে মরদেহের আসল পরিচয়। রোববার (১৮ অক্টোবর) এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) ফিরোজ কবির গণমাধ্যমকে বলেন, কারোর পরিচয়ই আসলে নিশ্চিত হয়নি। ডিএনএ টেস্টের আগে সেটা সম্ভবও নয়। যাদের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো পরিবারের দাবি। সবার পরিচয় নিশ্চিত হতে কিছুটা সময় লাগবে। ফায়ার সার্ভিসও জানিয়েছে, আগুনে মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় চেহারা দেখে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন। এ কারণে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। ফলে নিখোঁজ নাহিদুর রহমান তুহিন ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহগুলোর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে রিসোর্ট মালিকসহ কয়েকজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছে। এতে রিসোর্টের রেস্টুরেন্ট ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মো. মান্নান। রিসোর্টের মালিক নিয়াজ মোরশেদ ও তানভীরকেও অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নাহিদুর ও তার স্ত্রী-সন্তান জীবিত আছেন, নাকি অগ্নিকাণ্ডে তাদের কোনো ক্ষতি হয়েছে- এ বিষয়ে এখনও কোনো সংস্থাই নিশ্চিত তথ্য জানাতে পারেনি। তাই উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত না পর্যন্ত অপেক্ষার প্রহর গুনছে স্বজনেরা।