ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার উচাখিলা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ‘কাচারি বাড়ি’ এখন অস্তিত্ব সংকটে। একসময় যে কাচারি বাড়ি ছিল এ অঞ্চলের ভূমি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসস্থল এবং সাধারণ মানুষের ভূমিসেবা পাওয়ার অন্যতম আশ্রয়স্থল, কালের বিবর্তনে সেটিই এখন পরিণত হয়েছে অযত্ন-অবহেলার এক চিত্রে। ১ একর ১৯ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উচাখিলা ভূমি অফিসের কার্যক্রম পরিচালনায় কাচারি বাড়িটি। দৃষ্টি নন্দিত সেই ঘর-বাড়ি এখন আর নেই। ভূমিকর আদায়ের পুরোনো কাঠের কাচারি ঘরটি ভেঙে পড়ে আছে। সীমানা নির্ধারণের পুরোনো পিলারগুলোর অনেকগুলোও দৃশ্যমান নয়। কাচারির সংলগ্ন বিভিন্ন অংশে গড়ে উঠেছে নানা স্থাপনা। কোথাও দখল করে কাঠের ব্যবসা, কোথাও বসছে ছাগলের হাট। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই সুযোগে রাতের আঁধারে পুকুরঘাট এলাকায় বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। অথচ, এই কাচারি বাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে উচাখিলা ও আশপাশের এলাকার দীর্ঘ ইতিহাস। স্থানীয় প্রবীণদের কাছে এটি শুধু একটি ভূমি অফিস নয়; এটি সময়ের স্মৃতি, স্থানীয় প্রশাসনিক ঐতিহ্যের অংশ এবং কয়েক প্রজন্মের মানুষের পরিচিত একটি স্থান। ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। ইউনিয়নগুলো হলো- ঈশ্বরগঞ্জ সদর, সোহাগী, সরিষা, আঠারবাড়ী, জাটিয়া, মাইজবাগ, মগটুলা, রাজিবপুর, উচাখিলা, তারুন্দিয়া ও বড়হিত। এসব ইউনিয়নের মধ্যে ৮টিতে নিজস্ব ভূমি অফিস ভবনে তহশিলদারি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে জাটিয়া, ঈশ্বরগঞ্জ ও রাজিবপুর ইউনিয়নে নিজস্ব ভূমি অফিস ভবন না থাকায় পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের ভূমি অফিস কিংবা যৌথ ব্যবস্থাপনায় ভূমিসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নিজস্ব ভবন না থাকায় এসব ইউনিয়নের সাধারণ মানুষকে ভূমিসেবা নিতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে নিজস্ব ভূমি অফিস স্থাপনের দাবিও রয়েছে তাদের। তবে উচাখিলা ইউনিযনের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে ভূমি অফিসের নিজস্ব জায়গা রয়েছে পর্যাপ্ত। রয়েছে ১ একর ১৯ শতাংশ জমি। কিন্তু এত বিশাল সম্পত্তির মালিক হয়েও ভূমি অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ছোট্ট একটি টিনশেড ঘরে। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি যেন ‘বাতির নিচে অন্ধকার’। স্থানীয় সূত্র ও প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর ১৯৫০ সালের দিকে জনগণের কাছ থেকে ভূমি কর আদায়ের উদ্দেশ্যে উচাখিলা বাজারের উত্তর পাশে কাচারি বাড়িটি গড়ে তোলা হয়। সেসময় কাচারি বাড়িতে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের ব্যবস্থাও ছিল। ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা নিতে উচাখিলা ছাড়াও আশপাশের এলাকার মানুষ এখানে আসতেন। কাচারি বাড়িকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল একটি সুন্দর পরিবেশ। ছিল বড় পুকুর, পুকুরপাড়জুড়ে বড় বড় গাছ, কাঠের তৈরি নান্দনিক ঘর এবং সুপেয় পানির জন্য নলকূপ। প্রবীণদের স্মৃতিতে, তিন দশক আগেও আশপাশের মানুষের বিশুদ্ধ পানির অন্যতম উৎস ছিল কাচারি বাড়ির টিউবওয়েল। দিনের বিভিন্ন সময়ে সাধারণ মানুষের সরব উপস্থিতিতে মুখর থাকত পুরো এলাকা। সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। উচাখিলা ভূমি অফিসের দক্ষিণ পাশে ছিল মূল কাচারি ভবন। কাঠের তৈরি ঐতিহ্যবাহী সেই ঘরটি এখন আর নেই। ভেঙে পড়ে আছে তার ধ্বংসাবশেষ। কাচারি বাড়ির উত্তর-পূর্ব দিকে রয়েছে বড় একটি পুকুর। পুকুরপাড়ে ছিল বেশ কয়েকটি বড় গাছ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে সেসব গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। তবে কারা গাছগুলো কেটেছে কিংবা কীভাবে সেগুলো অপসারণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে স্থানীয়ভাবে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, পুকুরের উত্তর পাশে একের পর এক স্থাপনা গড়ে উঠছে। কাচারি বাড়ির জায়গার সীমানা নির্ধারণে একসময় যে পিলারগুলো ছিল, সেগুলোর অনেকগুলো এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পশ্চিম পাশে সীমানা প্রাচীরের নামে যে ইটের গাঁথুনি রয়েছে, সেটিও এখন জরাজীর্ণ। বিভিন্ন জায়গা থেকে ইট খুলে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উচাখিলা বাজারের দক্ষিণ পাশে কাচারি বাড়ির বিশাল জায়গার একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে কাঠের ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। আবার শনি ও বুধবার উচাখিলা সাপ্তাহিক হাটের দিন কাচারি বাড়ির জায়গায় বসে ছাগলের হাট। রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির এমন ব্যবহারে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাদের প্রশ্ন—১ একর ১৯ শতাংশ সরকারি জমি থাকা সত্ত্বেও কেন সেই জায়গায় একটি আধুনিক ভূমি অফিস ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে না? কেন ঐতিহাসিক কাচারি বাড়ির অবশিষ্ট স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না? বর্তমানে কাচারি বাড়ির পশ্চিম ও উত্তর দিকের একটি কোণায় ছোট্ট টিনশেড ঘরে ভূমি অফিসের কার্যক্রম পরিচালনা করতে নানা সমস্যাও হচ্ছে। তথ্য সংরক্ষণের সুব্যবস্থা না থাকায় সেবা প্রত্যাশীদের ফিরে যেতে হচ্ছে। ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্টরা আন্তরিক সেবা প্রদানের চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। চরম ঝুঁকিতে উচাখিলা ভূমি অফিস। রাস্তার পাশে সীমানা প্রাচীরবিহীন ভূমি অফিসটি অরক্ষিত অবস্থায় এই ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে। কারণ সেখানে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাও। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য এমন ভুতুরে পরিবেশ নিরাপদ ও উপযুক্ত নয়। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। নেই কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা। ফলে কাচারির বিশাল পুকুর ও খোলা জায়গাকে ঘিরে রাতের বেলায় নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। রাতের অন্ধকারে কাচারির পুকুরঘাট এলাকায় মাদকসেবীদের নিয়মিত আড্ডা বসে। এছাড়া, কাচারি বাড়ির দক্ষিণ, পূর্ব ও উত্তর দিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব জমি এখন উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে। আর সেই সুযোগে একটি শ্রেণির মানুষের নজর পড়েছে সরকারি কাচারি বাড়ির জমির দিকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কেউ কেউ কাচারি বাড়ির সীমানা ঘেঁষে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি কিনছেন এবং ভূমি অফিসের জায়গা দিয়ে চলাচলের পথ হিসেবে ব্যবহার করছেন। এতে ভবিষ্যতে সরকারি সম্পত্তির সীমানা নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের দাবি, উচাখিলা ভূমি অফিসের সুরক্ষায় তার চারদিকে স্থায়ী সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা জরুরি। স্থানীয়দের অভিমত, উচাখিলা কাচারি বাড়ি শুধু একটি ভূমি অফিসের জায়গা নয়। স্থানীয়দের কাছে এটি ব্রিটিশ-পরবর্তী ভূমি প্রশাসনের স্মৃতিবাহী একটি স্থাপনা। দীর্ঘ সময় ধরে এই জায়গায় সরকারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষ এই কাচারি বাড়ির সঙ্গে পরিচিত। স্থানীয়দের মতে, পুরোনো কাঠের ভবনটি আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলেও কাচারি বাড়ির সমস্ত জায়গা সংরক্ষণ করা সময়ের দাবি। পুরোনো স্থাপনার ইতিহাস সংগ্রহ করে একটি স্মারক স্থাপনা নির্মাণ, পুকুর ও পুকুরপাড় সংরক্ষণ, চারিদিকে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ এবং একটি আধুনিক ইউনিয়ন ভূমি অফিস ভবন তৈরি করা হলে এই ভূমি অফিসে সরকারি সেবা আরও গতিশীল হবে। এতে একদিকে সাধারণ মানুষের ভূমিসেবা পাওয়ার ভোগান্তি কমবে, অন্যদিকে সরকারি সম্পত্তি থাকবে সুরক্ষায়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট ভূমি প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ দ্রুত উচাখিলা কাচারি বাড়ির জমি সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন। সরকারি সম্পত্তির সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ ব্যবহার বন্ধ, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, আলোর ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুরোনো কাচারি বাড়ির ইতিহাস সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া নেবেন। তাদের মতে, ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার অন্য কয়েকটি ইউনিয়নে যেখানে ভূমি অফিসের নিজস্ব জায়গা ও ভবনের সংকট রয়েছে, সেখানে উচাখিলায় পর্যাপ্ত সরকারি জমি থাকা সত্ত্বেও ছোট্ট টিনশেড ঘরে বিপুল সংখ্যক মানুষের ভূমি অফিসের কার্যক্রম চলা সত্যিই দুঃখজনক। তাছাড়া শত বছরের পুরোনো এই কাচারি বাড়ির দিকে এখনই নজর দেওয়া না হলে একসময় হয়তো উচাখিলা থেকে হারিয়ে যাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন। সরকারি সম্পত্তি ও স্থানীয় ঐতিহ্য—দুটিই রক্ষায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ চান এলাকাবাসী। কাচারি বাড়ির বিষয়ে কথা হলে উচাখিলা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (নায়েব/তহশিলদার) সাইফুল ইসলামের বলেন, প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষের ভূমি সেবা দিয়ে যাচ্ছি। তবে বাজারের কাছে উন্মুক্ত পরিবেশে উচাখিলা ভূমি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণ নিয়ে খুবই চিন্তিত থাকতে হয়। ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের জন্য বরাদ্দের বিষয়টি আমরা মৌখিকভাবে জানিয়েছি।