প্রকাশ :: ... | ... | ...

নাব্যতা সংকটে বাড়ছে ভাঙন, মহাপরিকল্পনার অপেক্ষায় তিস্তাপাড়ের মানুষ


সংযুক্ত ছবি

চার দশক ধরে তিস্তা নদীতে বড় ধরনের কোনো খনন হয়নি। বছরের পর বছর বালু ও পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে নদীর তলদেশ। এতে নাব্যতা ও পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় উজানের ঢল নামলেই অল্প সময়ের মধ্যে ফুলে-ফেঁপে ওঠে নদী। সৃষ্টি হয় তীব্র স্রোত ও ঘূর্ণিস্রোত, আর সেই আঘাতে প্রতিবছর বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙন ঠেকাতে দীর্ঘদিন ধরে কুড়িগ্রামের তিস্তা তীরে জিও ব্যাগ ফেলে অস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলা হলেও অনেক স্থানে তা টিকছে না। গত এক দশকে এ অঞ্চলে ব্লক পিচিংসহ বড় ধরনের স্থায়ী তীর প্রতিরক্ষা কাজও হয়নি। ২০১৯ সালে নদী খনন, বাঁধ সংস্কার ও তীর রক্ষায় প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হওয়ায় সেটি স্থগিত হয়ে যায়। এরপর একাধিক জরিপ ও আশ্বাস মিললেও মাঠপর্যায়ে মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, আশির দশকে নীলফামারীর ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের সময় সীমিত পরিসরে খনন হয়েছিল। এরপর কুড়িগ্রাম অংশসহ তিস্তায় উল্লেখযোগ্য কোনো খনন প্রকল্প নেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় নদীর তলদেশে বালু-পলি জমে গভীরতা কমেছে। ফলে বর্ষায় উজান থেকে পানি নামলেই দ্রুত তীরবর্তী এলাকায় চাপ সৃষ্টি হয়। আবার পানি কমে গেলে বিভিন্ন স্থানে চর ও ডুবোচর জেগে ওঠায় স্বাভাবিক প্রবাহও ব্যাহত হচ্ছে। ২০১৯ সালে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে প্রায় ৪০ কিলোমিটার নদী খনন, বাঁধ সংস্কার ও সিসি ব্লক দিয়ে তীর প্রতিরক্ষার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়। সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু একই সময়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হওয়ায় প্রকল্পটির কার্যক্রম আর এগোয়নি। ফলে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার বড় পরিসরের খনন এবং স্থায়ী তীর রক্ষা—দুটিই অনিশ্চয়তায় পড়ে আছে। লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তা সেতু এলাকা থেকে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার বজরা পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটারজুড়ে তিস্তা প্রবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম অংশের প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাকে ভাঙনপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ থেকে পানি ছাড়ার পর ডালিয়া ব্যারাজের গেট খুলে দিলে নদীর পানির চাপ হঠাৎ বেড়ে যায়। নাব্যতা হারানো তিস্তায় সেই পানি দ্রুত তীরের দিকে ধাক্কা দিয়ে ভাঙন ত্বরান্বিত করে। ২০২২ সালের হড়পা বানে তিস্তাপারের বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। ভাঙন প্রতিরোধে বর্তমানে কুড়িগ্রাম অংশে সাড়ে ১৪ কিলোমিটারজুড়ে জিও ব্যাগ বসানো হয়েছে। তবে প্রবল স্রোত ও ঘূর্ণিস্রোতে অনেক স্থানে জিও ব্যাগ ধসে তীর ও বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সম্প্রতি রাজারহাট উপজেলার বুড়িরহাট এলাকায় জিও ব্যাগ ধসে একটি ক্রসবাঁধের প্রায় ৪০ মিটার অংশ ভেঙে যায়। এতে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয়দের মধ্যে। বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের কালিরহাট এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল আলম, নিবাসচন্দ্র ও সিদ্দিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন নদী খনন না হওয়ায় তিস্তার গভীরতা কমে গেছে। পানি বাড়লেই স্রোতের চাপ তীরে এসে পড়ে এবং প্রতিবছর নতুন নতুন এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। পাড়ামৌলা গ্রামের রহিমা বেগম বলেন, “নদীটা খুঁড়ি বান্ধার ব্যবস্থা করলে হামার থাকার ব্যবস্থা হইল হয়।” নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে তিনি এখন অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে ক্রসবাঁধের নিচে বসবাস করছেন। বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম বলেন, ২০০০ সাল থেকে ইউনিয়নের সাতটি মৌজায় প্রায় দেড় হাজার পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। প্রতিবছরই নতুন পরিবার ভাঙনের কবলে পড়ছে। তিনি বলেন, “মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সময় লাগলে অন্তত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী তীর প্রতিরক্ষা কাজ জরুরি। তা না হলে আরও বহু পরিবার বসতভিটা ও কৃষিজমি হারাবে।” কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “বর্তমানে সাড়ে ১৪ কিলোমিটার এলাকায় জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলছে। আপাতত স্থায়ী তীর প্রতিরক্ষা বা নদী খননের কোনো পরিকল্পনা নেই।” তিনি আরও বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নদীর দুই পাড় সুরক্ষিত করে ভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে।” চার দশক ধরে খনন না হওয়ায় তিস্তায় যেমন নাব্যতা সংকট বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে নদীভাঙনের ঝুঁকিও। তিস্তাপাড়ের মানুষের প্রশ্ন—মহাপরিকল্পনার অপেক্ষা আর কতদিন, স্থায়ী সমাধান কবে?