সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণের নির্দেশনা থাকলেও নওগাঁর বদলগাছীতে তা যথাযথভাবে মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকসংকটে থাকা বিদ্যালয় থেকে বদলি, একই শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন করেও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের বঞ্চিত করা এবং নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই এক শিক্ষিকাকে দ্বিতীয়বার প্রশাসনিক শাস্তিমূলক বদলির মতো ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে পুরো প্রক্রিয়া। এ নিয়ে স্থানীয় শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তির দায়িত্বে থাকা কমিটির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের প্রকাশিত নোটিশে শিক্ষক বদলির আবেদনের ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। শর্ত অনুযায়ী, চাকরিতে যোগদানের পর ন্যূনতম দুই বছর এবং বর্তমান বিদ্যালয়ে তিন বছর পূর্ণ না হলে কোনো সহকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে বদলির জন্য বিবেচনা করা যাবে না। পাঁচজন বা তার কম শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন—এমন বিদ্যালয় থেকে বদলির আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। একই বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক আবেদন করলে জ্যেষ্ঠতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। তবে অভিযোগ উঠেছে, বদলির চূড়ান্ত তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে এসব শর্তের ব্যত্যয় ঘটেছে। প্রকাশিত তালিকা ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বক্তব্যে অন্তত তিনটি বিষয়ে গুরুতর অসংগতি সামনে এসেছে। শিক্ষকসংকটে থাকা বিদ্যালয় থেকেও বদলি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ফয়জাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র তিনজন শিক্ষক কর্মরত ছিলেন। অন্যদিকে রনাহার, পরশুরামপুর ও উত্তর শ্যামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংখ্যা ছিল চারজন করে। নীতিমালায় পাঁচজন বা তার কম শিক্ষক কর্মরত থাকা বিদ্যালয় থেকে বদলির আবেদন গ্রহণের সুযোগ না থাকলেও এসব বিদ্যালয় থেকে আবেদন গ্রহণ ও বদলির আদেশ কার্যকর করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া উত্তর সাদিশপুর ও জগপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে দুজন করে শিক্ষক বদলি করা হয়েছে। এতে বিদ্যালয় দুটিতে শিক্ষকসংকট আরও বাড়ার পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শিক্ষকসংকটে থাকা বিদ্যালয়গুলো থেকে বদলির আবেদন কীভাবে গ্রহণ করা হলো এবং কোন বিবেচনায় সেগুলো অনুমোদন পেল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শূন্য পদে জ্যেষ্ঠদের বাদ, অগ্রাধিকার পেলেন কনিষ্ঠরা বদলির তালিকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি অসন্তোষ দেখা দিয়েছে শূন্য পদে শিক্ষক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। বারাতৈল, নিহনপুর, রামশাপুর, বালুভরা, চাঁপাডাল, বামনপাড়া ও থুপশহরসহ কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্য পদের বিপরীতে একাধিক শিক্ষক আবেদন করেছিলেন। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এসব পদের কয়েকটিতে জ্যেষ্ঠ আবেদনকারীরা সুযোগ পাননি। তাঁদের বাদ দেওয়ার কারণ কিংবা নির্বাচিত শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ভিত্তি সম্পর্কেও স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বারাতৈল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি শূন্য পদকে কেন্দ্র করে এ অসংগতির অভিযোগ আরও স্পষ্ট হয়েছে। ওই পদের বিপরীতে সাতজন শিক্ষক আবেদন করেন। তাঁদের মধ্যে শেরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল মতিন ছিলেন জ্যেষ্ঠতম। তিনি ২০০৩ সালের ১৬ জুন চাকরিতে যোগ দেন এবং ২০১২ সাল থেকে বর্তমান বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন। দীর্ঘদিনের চাকরির অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে বদলি করা হয়নি। পরিবর্তে ২০২৩ সালে কোলার পালশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করা সহকারী শিক্ষিকা মাহজাবিন নাজনীনকে বারাতৈলে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে। আব্দুল মতিন জানান, তাঁর বাড়ি থেকে বর্তমান কর্মস্থলের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। যাতায়াতের ভোগান্তি কমাতে বাড়ির কাছের বারাতৈল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্য পদে তিনি আবেদন করেছিলেন। কিন্তু ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের বদলির আদেশ দেখে তিনি ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হয়েছেন। তিনি বলেন, মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি উপজেলার স্কাউট কমিশনার হিসেবেও কাজ করছেন। তাঁর দাবি, বদলির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করা হলে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তাঁকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ছিল। শূন্য পদে জ্যেষ্ঠ আবেদনকারীকে বাদ দিয়ে কনিষ্ঠ শিক্ষককে বদলি করার ক্ষেত্রে কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা। তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই দ্বিতীয়বার বদলি বদলগাছীতে শিক্ষক বদলি নিয়ে আরেকটি অভিযোগ উঠেছে সহকারী শিক্ষিকা শারমিন সুলতানাকে ঘিরে। তাঁর ক্ষেত্রে নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই দ্বিতীয়বার প্রশাসনিক শাস্তিমূলক বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে প্রশাসনিক শাস্তি হিসেবে তাঁকে নালুকাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শহরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। তিন বছর পর তিনি হাটশাপিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান। এরপর ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তাঁকে আবারও প্রশাসনিক শাস্তিমূলক বদলি করে উত্তর রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে তাঁর ইনক্রিমেন্ট স্থগিত রাখার কথাও জানা গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আগের বদলির পর নির্ধারিত তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁকে দ্বিতীয়বার বদলি করা হয়েছে। বদলির আদেশের ১৯ নম্বর ক্রমিকে তাঁর নাম রয়েছে। তবে শারমিন সুলতানা দাবি করেন, তিনি উপজেলা পর্যায়ে বদলির জন্য কোনো আবেদন করেননি। সরাসরি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিলেন এবং সেখান থেকেই তাঁর বদলির ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিষয়টি জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারাও অবগত আছেন বলে জানান তিনি। তাঁর বদলির ক্ষেত্রে কোন বিধান অনুসরণ করা হয়েছে এবং প্রশাসনিক শাস্তিমূলক বদলির সিদ্ধান্ত কী প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। কমিটির সুপারিশে বদলি, দায় নিচ্ছেন না কেউ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে সদস্যসচিব করে গঠিত ‘আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণ কমিটি’র সুপারিশের ভিত্তিতে আটজন শিক্ষককে বদলি এবং ১১ জনকে প্রতিস্থাপনের আদেশ জারি করা হয়। তবে বদলি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা গেছে। বদলগাছী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. সাইদুর রহমান কিছু ক্ষেত্রে নীতিমালা লঙ্ঘনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে এ জন্য নিজের দায় অস্বীকার করে তিনি বলেন, যাচাই-বাছাই কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই বদলিগুলো সম্পন্ন হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ছোটখাটো ভুল-বোঝাবুঝি থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কমিটির সভাপতি ইসরাত জাহান ছনি বলেন, তাঁরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে বদলি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা করেছেন। কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা অগোচরে ঘটেছে। কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে বিষয়টি তদন্ত করা হবে। অন্যদিকে নওগাঁ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সায়েদুল ইসলাম দাবি করেন, উপজেলা কমিটি নীতিমালা অনুসরণ করেই কাজ করেছে। নীতিমালা অমান্য করে কোনো বদলি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা কমিটির সঙ্গে কথা বলতে হবে বলে জানান তিনি। এদিকে অনুমোদিত শূন্য পদ থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি বদলির আদেশে ‘প্রতিস্থাপন সাপেক্ষে’ শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ অন্য শিক্ষক যোগদান না করা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত করা হবে না। এতে বদলির আদেশ কার্যকর করার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিতের দাবি শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্দেশ্য হলো বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকসংখ্যার ভারসাম্য বজায় রাখা, শিক্ষকদের যৌক্তিক আবেদন বিবেচনা করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বদলগাছীর সাম্প্রতিক বদলি প্রক্রিয়ায় উত্থাপিত অভিযোগগুলো এসব উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে শিক্ষকসংকটে থাকা বিদ্যালয় থেকে বদলি, জ্যেষ্ঠ আবেদনকারীদের উপেক্ষা এবং নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই দ্বিতীয়বার বদলির অভিযোগের যথাযথ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আবেদন যাচাই-বাছাই কমিটি কী কী মানদণ্ডে আবেদন মূল্যায়ন করেছে, কোন যুক্তিতে নির্দিষ্ট শিক্ষককে নির্বাচিত করেছে এবং বাদ পড়া আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশের দাবি উঠেছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বদলির নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। নীতিমালার ব্যত্যয় প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এতে শিক্ষকদের মধ্যে সৃষ্ট অসন্তোষ দূর হবে এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বদলি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।