প্রকাশ :: ... | ... | ...

বাংলাদেশে ৩৯০ কোটি টাকা অনুদান দেবে কানাডা


সংযুক্ত ছবি

★ কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরও সহায়তা দিচ্ছে কানাডা ★ স্বাধীনের পর এ পর্যন্ত ৬৩০ কোটি কানাডিয়ান ডলারেরও বেশি উন্নয়ন সহায়তা দিয়েছে কানাডা “বাংলাদেশ স্বাধীনের পর দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় নতুন এ বিনিয়োগ ঘোষণা দু’দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে” — রণদীপ সারাই, কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের কৃষি, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সংস্কার ও বেসরকারি খাতের উন্নয়নে চারটি নতুন উদ্যোগে ৪ কোটি ৫০ লাখ কানাডিয়ান ডলার অনুদান ঘোষণা করেছে কানাডা। বাংলাদেশ সফরকালে এ ঘোষণা দেন কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাই। ঘোষিত এ অর্থের পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৯০ কোটি টাকা। কৃষিতে উদ্ভাবন, ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন, অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশাধিকার বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে এ অর্থ সহায়তা করবে। বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রিত শরণার্থী শিবিরে থাকা মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের শিক্ষা-খাদ্য ও জীবনমান উন্নয়নে ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬০ কোটি কানাডিয়ান ডলারের সহায়তা দিয়েছে কানাডা। দেশটির আন্তর্জাতিক উন্নয়নরবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাইয়ের মতে, বাংলাদেশ স্বাধীনের পর দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় নতুন এ বিনিয়োগ ঘোষণা দু’দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাই গত ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করেন। এ সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে কানাডা ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা এবং দু’দেশের জনগণের জন্য উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করা। সফরকালে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ, গবেষণা কার্যক্রম, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা এবং বেসরকারি খাতের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। পাশাপাশি দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন। ঘোষিত নতুন অনুদানের মধ্যে বায়োএন্টারপ্রাইজ কানাডাকে দেয়া হবে ১ কোটি ৮০ লাখ কানাডিয়ান ডলার। কানাডার কৃষি খাতের উদ্ভাবকদের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য খাতের সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। একই পরিমাণ, অর্থাৎ ১ কোটি ৮০ লাখ কানাডিয়ান ডলার দেয়া হবে কোওয়াটার ইন্টারন্যাশনালকে। এ অর্থের মাধ্যমে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা সহজ করা, ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন এবং কানাডাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সংস্কারে অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ এগিয়ে নিতে বিশ্বব্যাংককে ৫০ লাখ কানাডিয়ান ডলার অনুদান দেয়া হবে। অন্যদিকে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং বেসরকারি খাতের বিকাশে সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশন বা আইএফসিকে দেয়া হবে ৪০ লাখ কানাডিয়ান ডলার। এই চারটি উদ্যোগের মাধ্যমে কানাডা বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং দু’দেশের মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সফরকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিনের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাই। বৈঠকগুলোতে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, জ্বালানি ও জলবায়ু অর্থায়নে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট এবং এর টেকসই সমাধানে বাংলাদেশ, কানাডা ও অন্যান্য অংশীদারের যৌথ প্রচেষ্টার গুরুত্ব নিয়েও উভয় পক্ষ মতবিনিময় করে। বাংলাদেশ সফরের অংশ হিসেবে ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাকের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিদর্শন করেন প্রতিমন্ত্রী সারাই। সেখানে তিনি দেখেন, কানাডার সহায়তায় তরুণ-তরুণীরা, বিশেষ করে নারীরা, কীভাবে বিভিন্ন দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন। কানাডা, ব্র্যাক ও অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তর একটি উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই উদ্যোগে কানাডা ৪ কোটি ৪০ লাখ কানাডিয়ান ডলার সহায়তা দিয়েছে, যা গত পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। ঢাকায় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) হাসপাতাল পরিদর্শনকালে কানাডার সহায়তায় পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রমের অবদান সম্পর্কে অবগত হন প্রতিমন্ত্রী সারাই। এসব গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার সাশ্রয়ী ও জীবনরক্ষাকারী সমাধান তৈরি হচ্ছে, যা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লাখো মানুষের জীবনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। এমনকি এসব উদ্ভাবনের সুফল কানাডাতেও পৌঁছেছে। বর্তমানে আইসিডিডিআর,বির প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কানাডা ১ কোটি ৫০ লাখ কানাডিয়ান ডলার অনুদান দিয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া কানাডাই একমাত্র দেশ, যারা প্রতিষ্ঠানটিকে এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। এ ছাড়া যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা ও ঘাটতি নিয়ে প্রয়োজনীয় গবেষণার জন্য আইসিডিডিআর,বিকে আরও ২ কোটি ৪০ লাখ কানাডিয়ান ডলার সহায়তা দিয়েছে কানাডা। সফরের অংশ হিসেবে কক্সবাজারে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিজ দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রতিমন্ত্রী সারাই। সেখানে তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য কানাডার সহায়তায় পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে সরাসরি অবগত হন। ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত কানাডা ৬০ কোটি কানাডিয়ান ডলারেরও বেশি সহায়তা দিয়েছে, যা শিক্ষা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও জীবিকার সুযোগ সম্প্রসারণে অবদান রাখছে। কক্সবাজারে সফরকালে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন প্রতিমন্ত্রী। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ, কানাডা ও আঞ্চলিক অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়। দীর্ঘস্থায়ী এ সংকট মোকাবিলায় যৌথ প্রচেষ্টা এবং শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা অব্যাহত রাখার গুরুত্ব আলোচনায় উঠে আসে। এরপর কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্রের (সিমিট) একটি প্রদর্শনী কেন্দ্রও পরিদর্শন করেন প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাই। সেখানে তিনি গবেষণাভিত্তিক কৃষি কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকরা কীভাবে ফসলের উৎপাদন বাড়াচ্ছেন, খাদ্যের চাহিদা পূরণে অবদান রাখছেন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করছেন, তা প্রত্যক্ষ করেন। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষিকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে উদ্ভাবনী পদ্ধতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে সিমিট বায়োএন্টারপ্রাইজ কানাডার সঙ্গে কাজ করবে। ঢাকায় গিলডান অ্যাকটিভওয়্যার বাংলাদেশ লিমিটেডও পরিদর্শন করেন প্রতিমন্ত্রী সারাই। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে কানাডার বৃহত্তম বিনিয়োগকারী। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে দু’দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে। এ সময় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বাংলাদেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার গুরুত্বও আলোচনায় স্থান পায়। সফরকালে প্রতিমন্ত্রী সারাই সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন, মানুষ, গবেষণা ও নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবনে বিনিয়োগ কীভাবে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং শরণার্থী সহায়তা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে কানাডার সহযোগিতার কার্যক্রম বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে দেশটিতে ৬৩০ কোটি কানাডিয়ান ডলারেরও বেশি উন্নয়ন সহায়তা দিয়েছে কানাডা। পাশাপাশি দু’দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০২৫ সালে ৪০০ কোটি কানাডিয়ান ডলার ছাড়িয়েছে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় নতুন এ বিনিয়োগ ঘোষণা দু’দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে দু’দেশের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সম্পদ কাজে লাগিয়ে যৌথভাবে নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে সহায়তার পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সফর শেষে প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায় অংশ নিতে থাইল্যান্ডের উদ্দেশে যাত্রা করেন।