* একদিনে গেল ৭ প্রাণ, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৫২ * ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকিতে ডিএসসিসি’র ২৯টি ওয়ার্ড * ৪০৩ বাড়িতে মিলেছে এডিসের লার্ভা “ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, কোথাও পানি জমতে না দেওয়া এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সবাইকে সচেতন হতে হবে” — মো. আবদুস সালাম, প্রশাসক, ডিএসসিসি রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই ক্রমেই বাড়ছে প্রাণঘাতী এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। ডেঙ্গুর মশার প্রজনন মৌসুমে সরকারের পক্ষ থেকে তা নির্মূলে নানামূখী উদ্যোগ নিলেও কার্যকর হচ্ছে না। ফলে ডেঙ্গু মশার কামড়ে অস্থির হয়ে উঠছে দেশের কোমলমতি শিশু থেকে শুরু করে নানান বয়সের নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অর্ধেকেরও বেশি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। নগরীর ৭৫টি ওয়ার্ডে পরিচালিত ‘বর্ষাকালীন এডিস লার্ভা জরিপ ২০২৬’-এর ফলাফলে ২৯টি ওয়ার্ডকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জরিপে ৪০৩টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের জনগণই মনে করছে, ডেঙ্গু নির্মূলের দায়িত্ব সাধারণ জনগণের নয়, এর কাজ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ডিএসসিসি-ডিএনসিসি ও পৌরসভা-ইউনিয়নে দায়িত্বরত কর্মকর্তা কর্মচারীদের। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জনবল সংকট, অসচেতনতা ও মশক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উদাসীনতাই ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গত একদিনে সারাদেশে ডেঙ্গুর থাবায় প্রাণ গেছে ৭ জনের। একদিনেই ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৯৬ রোগী। চলতিদ বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৫২ জন। ডিএসসিসি’র প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলছেন, ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, কোথাও পানি জমতে না দেওয়া এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সবাইকে সচেতন হতে হবে। শুধ সরকার নয়, সবার অংশগ্রহণ ও জনসচেতনতাই জরুরি। ডিএসসিসিতে পরিচালিত সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে গত ৮ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিন সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর প্রজনন খুঁজতে একটি জরিপ পরিচালিত হয়। এতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৩৬ জন মাঠকর্মী অংশ নেন। জরিপের আওতায় দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মোট ২ হাজার ২৫৫টি বাড়িতে অনুসন্ধান চালানো হয়। প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে গড়ে ৩০টি করে বাড়ির নমুনা পরীক্ষা করা হয়। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষা করা বাড়িগুলোর মধ্যে ৪০৩টিতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে। স্বতন্ত্র বাড়িতে সর্বোচ্চ ৩১ দশমিক ৩৭ শতাংশ লার্ভা শনাক্ত হয়েছে। জরিপে আরও দেখা গেছে, গত বছর যেসব ওয়ার্ড অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল, সেগুলোর কয়েকটিতে নিবিড় কার্যক্রমের ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে নতুন করে যেসব ওয়ার্ড ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে, সেগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মশকবিরোধী অভিযান জোরদার করা হচ্ছে। ওই জরিপ প্রতিবেদনের ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ জন্য নগরবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, কোথাও পানি জমতে না দেওয়া এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সবাইকে সচেতন হতে হবে। তবে পরিবেশবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিচ্ছন্ন শহর-নগর-গ্রাম। সবখানেই ময়লার ভাগাড়, ডোবা-নালায় ময়লার স্তুপ। সড়কের দু’পাড়েও নোংরা পরিবেশ। এতে মশার প্রজনন মৌসুমে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। দেশের অধিকাংশ জনগণই নাগরিক সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে সরকারকে নিয়মিত পৌরকর, জমির খাজনাদি, নগরবাসী হোল্ডিং ট্যাক্স দিচ্ছেন। কিন্তু সে অনুযায়ী দেশের জনগণ কী সেই নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে? সুতরাং এমনিতেই দেশের মানুষের সচেতনতার বড় অভাব রয়েছে। বাড়ি বাড়ি ঢুকে লার্ভা খুঁজে জরিমানা করলেই ডেঙ্গুরোগ নিয়ন্ত্রণে আনা ও জনসচেতনতা তৈরি করা সম্ভভ নয়। মশা নির্মূলে আলাদা একটি দপ্তরও রয়েছে। সেটা হলো-‘মশক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর’। কিন্তু সেই অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্তদ কর্মকতা বা কর্মচারীরা কী সবখানে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছেন? গ্রাম-নগর থেকে শুরু করে শহরের বিস্তির্ণ জনপদের পাড়া-মহল্লার অলিগলি পর্যবেক্ষণ করে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ডিএসসিসি-ডিএনসিসি, পৌরসভা ও ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। মূলতঃ তাদের উদাসীনতা আর জনগণের অসচেতনতার জন্যই ডেঙ্গু রোগের বিস্তার ঘটছে। পরিবেশবিদদের মতে, শহরের অধিকাংশ স্থানেই সড়কের দুই পাশে ধুলো জমে আর ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়। নগরের অনেক স্থানে দিনের বেলাও মশা নির্মূলে কয়েল জ্বালাতে বাধ্য হচ্ছেন নগরবাসীর অনেকেই। এর ফলে একদিকে মশার কবল থেকে নিজেদের সুরক্ষা দিতে গিয়ে কয়েলের বিষাক্ত ধোঁয়া শ্বাস-প্রশ্বাসে মানবদেহে প্রবেশ করে যেমন অন্যান্য রোগের বিস্তার ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে অর্থেরও অপচয় হচ্ছে। এতে করে মশার কামড়ে অস্থির হয়ে উঠছেন দেশের নানান শ্রেণিপেশার মানুষ। এসব পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা জরুরি। তবে, জনগণকে সম্পৃক্ত করে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন পরিবেশবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত ডেঙ্গু-বিষয়ক নিয়মিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৫৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছরের শুরু থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫২ জনে। আর এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৭১ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৫০ জন ঢাকা বিভাগের। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ২৯৫ জন, বরিশাল বিভাগে ২১৩ জন, খুলনা বিভাগে ২২১ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৪৮ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৮৩ জন, রংপুর বিভাগে ৬৭ জন এবং সিলেট বিভাগে ১৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮০ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫ হাজার ৮৩৯ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন মোট ৪৫২ জন। মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নভেম্বর মাসের প্রথম পাঁচ দিনেই ডেঙ্গুতে ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে অক্টোবর মাসে এ রোগে প্রাণ হারিয়েছেন ১৭৪ জন এবং সেপ্টেম্বর মাসে মারা গেছেন ১৪৮ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের মোট মৃত্যুর বড় একটি অংশ ঘটেছে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, দেশে ডেঙ্গুর ইতিহাসে ২০২৩ সালে সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ওই বছর মোট ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। একই বছর এ রোগে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সে বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজারের বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০০০ সাল থেকে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য সংরক্ষণ করে আসছে।