প্রকাশ :: ... | ... | ...

সদরপুর সরকারি কলেজে ফি আদায়ে অনিয়মের অভিযোগ


সংযুক্ত ছবি

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্র ও সরকারি বিধি-বিধানের বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ফরিদপুরের সদরপুর সরকারি কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. এনামুল হকের বিরুদ্ধে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থের ব্যবহার, বিভিন্ন খাতে ফি নির্ধারণ এবং কলেজের শিক্ষা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারি করা সর্বশেষ পরিপত্রে নির্ধারিত খাতের বাইরে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ‘শিক্ষার্থী হাজিরা এসএমএস’ ও ‘জেনারেটরের তেল’ নামে নতুন খাত যুক্ত করে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এসব খাত পরিপত্রে উল্লেখ নেই বলে অভিযোগকারী শিক্ষার্থীরা দাবি করেছেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কলেজে ‘বিবিধ’ ও ‘উন্নয়ন’সহ একাধিক ফান্ড রয়েছে। এসব ফান্ডে অর্থ থাকার পরও বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জনবল ও অন্যান্য খাতে নির্ধারিত ফির পরিমাণ পরিবর্তন করা হয়েছে। কোনো সময়ে ১ হাজার টাকা, আবার কোনো সময়ে ১ হাজার ৪০০, ১ হাজার ৫০০ এবং সর্বশেষ ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বিভিন্ন বর্ষে উন্নয়ন ফি ভিন্ন ভিন্ন হারে আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও ২০০ টাকা, কোথাও ১০০ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। অথচ সংশ্লিষ্ট পরিপত্রে উন্নয়ন খাতে ১০০ টাকা নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে বলে তাদের দাবি। অনার্স পর্যায়ের নবীনবরণ অনুষ্ঠানকে ঘিরেও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, নবীনবরণ খাতে অর্থ আদায়ের নির্দিষ্ট কোনো সরকারি নীতিমালা না থাকলেও এ খাতেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পরিপত্রে নির্ধারিত খাতগুলোর পাশাপাশি নতুন নতুন খাত যুক্ত করে অর্থ সংগ্রহের ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। কলেজে প্রায় ২১০০ শিক্ষার্থী থাকলেও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দেয়া তথ্য মতে সদরপুর সরকারী কলেজে বর্তমানে প্রায় ১৫৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। অধ্যক্ষের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রায় ১৩ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে। প্রকৃত অর্থে তা আরও বেশী। গতকাল ২২ সেপ্টেম্বর ছিলো ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেনীর ভর্তির শেষ দিন। সেখানে ছাত্র প্রতি ৩৫৪০ এবং ছাত্রী প্রতি ৩২৪০ টাকা নেয়া হয়েছে। শান্তা আক্তার এবং মেহেদী হাসান নামের দুজন শিক্ষার্থী জানায় এতোটাকা দেয়াটা আমাদের বাবা-মায়ের উপর একটু কষ্টসাধ্য । এখানেই শেষ নয় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তার ক্ষমতাবলে শিক্ষকদের মেসের একজন রাধুনিকে লাইব্রেরিয়ান সহকারী করেছেন। এছাড়াও তার নিয়োগ দেওয়া বিভিন্ন জনবলের দক্ষতা নিয়েও উঠেছে নানান প্রশ্ন। শুধু অর্থ আদায় নয়, আদায়কৃত অর্থের ব্যবহার নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। কলেজের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষা সফর, ক্রীড়া, ম্যাগাজিন ও সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের নামে অর্থ নেওয়া হলেও দীর্ঘদিন ধরে তারা এসব কার্যক্রমের সুফল পাচ্ছেন না। শিক্ষার্থীদের দাবি, তাদের কাছ থেকে শিক্ষা সফরের জন্য অর্থ নেওয়া হলেও এ পর্যন্ত তাদের কোনো শিক্ষা সফরে নিয়ে যাওয়া হয়নি। এদিকে ২০২৫ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে জানুয়ারি মাসে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের কথা থাকলেও সদরপুর সরকারি কলেজে এ ধরনের কার্যক্রম যথাযথভাবে হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ ক্রীড়া খাতেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। অন্যদিকে চলতি বছরে শিক্ষক পরিষদের তত্ত্বাবধানে কলেজের শিক্ষকরা কুয়াকাটা ভ্রমণে গেলেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সফর আয়োজন না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক শিক্ষার্থী। ‘ফান্ড নেই’—তবুও বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায়! কলেজের শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতায় সদরপুর সরকারি কলেজের অংশগ্রহণ অনেক সময় দেখা যায় না। এর কারণ হিসেবে কলেজে ফান্ড না থাকার কথা বলা হয়। সম্প্রতি বিজ্ঞান মেলায় কলেজটির অংশগ্রহণ না থাকার বিষয়টি নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, “সম্প্রতি বিজ্ঞান মেলায় সদরপুর সরকারি কলেজের অংশগ্রহণ ছিল না। অধ্যক্ষ মহোদয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি কলেজে ফান্ড নেই বলে জানিয়েছেন।” তবে অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—কলেজের উন্নয়ন, জনবল, বিবিধ, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ক্রীড়াসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ সংগ্রহ করা হয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় কার্যক্রমে সেই অর্থের সমন্বয় করা হচ্ছে না কেন? সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ক্রীড়া কার্যক্রমে স্থবিরতা দীর্ঘদিন ধরে কলেজে উল্লেখযোগ্য সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রম না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অনেকেই বলছেন, শুধু ক্লাস ও পরীক্ষার মধ্যেই শিক্ষাজীবন সীমাবদ্ধ থাকলে একটি সরকারি কলেজের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হয় না। নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, শিক্ষা সফর ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেখার কি কেউ নেই? একদিকে বিভিন্ন খাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ, অন্যদিকে সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও কার্যক্রমের দৃশ্যমানতা নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে সদরপুর সরকারি কলেজের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। তাদের প্রশ্ন, সরকারি পরিপত্রে নির্ধারিত খাতের বাইরে অর্থ আদায়ের অভিযোগ, বিভিন্ন খাতে ফি’র পরিমাণ পরিবর্তন, আদায়কৃত অর্থের ব্যবহার এবং শিক্ষা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের স্থবিরতার বিষয়গুলো দেখার দায়িত্ব কার? তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সদরপুর সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. এনামুল হক তার বক্তব্যে বলেন, আমার কলেজে বাড়তি কিছু খরচ আছে সেই বাড়তি খরচের যোগান দিতে আমাকে বিভিন্নখাদ থেকে টাকা সংগ্রহ করতে হয়। তবে সব টাকার হিসেব আমি দিতে পারবো না বলেও তিনি জানান। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর থেকে উন্নয়ন,আসবাবপত্র ক্রয় সহ বিভিন্ন খাদে ৮ লক্ষ ১০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। কিন্ত কলেজে ঐ টাকার কাজের তেমন কিছুই দৃশ্যমান হয়নি। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবি, বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং কলেজের আয়-ব্যয়ের হিসাব ও বিভিন্ন খাতে আদায়কৃত অর্থের ব্যবহার স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হোক।