প্রকাশ :: ... | ... | ...

একটি কম্পিউটার থেকে ক্রেস্ট কারখানা—জিম্মানের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প


সংযুক্ত ছবি

একটি কম্পিউটার, একটি ফটোকপি মেশিন আর নিজের কিছু করার অদম্য ইচ্ছা—এই ছিল সম্বল। বড় কোনো পুঁজি ছিল না, ছিল না ব্যবসার বিশাল কোনো পরিকল্পনা। ছিল শুধু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন থেকেই প্রায় পাঁচ বছর আগে ছোট পরিসরে শুরু করেছিলেন কাজ। শুরুতে কম্পিউটার কম্পোজ, ফটোকপি ও অনলাইনের বিভিন্ন কাজ করতেন। এরপর ক্রেতাদের চাহিদা বুঝে একে একে যুক্ত করেন ছবি প্রিন্ট, মগ প্রিন্ট ও গেঞ্জি প্রিন্টের কাজ। ছোট্ট সেই উদ্যোগ ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। একসময় যুক্ত হয় ক্রেস্ট তৈরির কাজ। আর সেই কাজই তাকে নিয়ে যায় নতুন এক পর্যায়ে। বর্তমানে ময়মনসিংহের ত্রিশালের উদ্যোক্তা জিম্মানুল আনোয়ারের রয়েছে প্রিণ্ট বাজার ও ক্রেস্ট বিলাস নামে জামে মসজিদ রোডে নিজস্ব ক্রেস্ট তৈরির কারখানা। সেখানে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে শত শত ক্রেস্ট। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসছে অর্ডার। অনলাইনে অর্ডার নিশ্চিত করে কুরিয়ারের মাধ্যমে সেসব ক্রেস্ট পৌঁছে যাচ্ছে ক্রেতাদের হাতে। তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক। অর্থাৎ যে উদ্যোগ একসময় ছিল শুধু নিজের কর্মসংস্থানের চেষ্টা, সময়ের সঙ্গে সেটিই এখন অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। ছাত্রজীবনের স্বপ্ন থেকেই শুরু ছাত্রজীবন থেকেই জিম্মানুলের ইচ্ছা ছিল নিজে কিছু করার। পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পেছনে ছুটে না গিয়ে নিজের একটি কাজ দাঁড় করানোর চিন্তা থেকেই ব্যবসায় নামেন তিনি। তবে উদ্যোক্তা হওয়ার পথটি সহজ ছিল না। অল্প পুঁজি দিয়ে শুরু করায় শুরুতে তাকে অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ব্যবসার পরিধি ছিল ছোট, ক্রেতাও ছিল সীমিত। তবু থেমে যাননি। যা আছে, তা দিয়েই কীভাবে আরও কিছু করা যায়—সেই চিন্তা থেকেই এগোতে থাকেন। প্রথমে একটি কম্পিউটার ও একটি ফটোকপি মেশিন নিয়ে কাজ শুরু করেন। নিজের দোকানে বসেই কম্পিউটার কম্পোজ, ফটোকপি ও অনলাইনের বিভিন্ন কাজ করতেন। পাশাপাশি ছবি প্রিন্টের কাজও শুরু করেন। এক কাজ থেকে আরেক কাজে জিম্মানুলের ব্যবসা বড় হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল নতুন কিছু করার চেষ্টা। একটি কাজের ওপর নির্ভর না করে ক্রেতাদের প্রয়োজন ও বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ধীরে ধীরে নতুন কাজ যুক্ত করতে থাকেন। ছবি প্রিন্টের পর শুরু করেন মগ প্রিন্ট। এরপর গেঞ্জিতে বিভিন্ন লেখা, ছবি ও ডিজাইন প্রিন্টের কাজ। বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সংগঠন ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনের এসব কাজ করতে করতে তার পরিচিতি বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে ক্রেস্ট তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। শুরুতে সীমিত পরিসরে কাজ করলেও ক্রমেই অর্ডার বাড়তে থাকে। তখন তিনি বুঝতে পারেন, এই কাজকে আরও বড় পরিসরে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেখান থেকেই ক্রেস্ট তৈরিকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে ব্যবসা সাজানোর উদ্যোগ নেন। ছোট দোকান থেকে ক্রেস্টের কারখানা বর্তমানে জিম্মানুলের ক্রেস্ট তৈরির কাজ আর শুধু ছোট পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তৈরি হয়েছে নিজস্ব কারখানা। সেখানে বিভিন্ন ধরনের ক্রেস্ট তৈরির কাজ করেন শ্রমিকেরা। প্রতিদিন শত শত ক্রেস্ট তৈরি হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানের জন্য অর্ডার নেওয়া হয়। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী ডিজাইন ও লেখা ঠিক করে তৈরি করা হয় ক্রেস্ট। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রেতারা অনলাইনে যোগাযোগ করেন। অর্ডার ও ডিজাইন চূড়ান্ত হওয়ার পর ক্রেস্ট তৈরি করে কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ত্রিশালের একটি ছোট উদ্যোগ এখন অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার ক্রেতাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। নিজের কর্মসংস্থান থেকে ১০–১৫ জনের কর্মসংস্থান উদ্যোক্তা হিসেবে জিম্মানুলের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। শুরুতে সব কাজ একাই করতে হতো তাকে। কম্পিউটার চালানো, ফটোকপি করা, প্রিন্টের কাজ, ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ—সবই সামলাতেন নিজে। কাজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন হয়েছে কর্মীর। এখন তার প্রতিষ্ঠানে ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন। জিম্মানুল বলেন, “শুরুতে একাই সব কাজ করতাম। এখন আমার সঙ্গে ১০ থেকে ১৫ জন মানুষ কাজ করছেন। আমার কাছে এটিই বড় পাওয়া। আমি নিজের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছিলাম, এখন অন্য কয়েকজনেরও কাজের সুযোগ হয়েছে।” এখনো ভুলে যাননি শুরুর সেই দোকান ব্যবসার পরিধি বড় হলেও জিম্মানুল এখনো ধরে রেখেছেন তার শুরুর জায়গাটি। ত্রিশাল পৌরসভার জামে মসজিদ রোডের ছোট দোকানটি এখনো তার ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেখান থেকে কম্পিউটার কম্পোজ, ফটোকপি, মগ প্রিন্ট ও গেঞ্জি প্রিন্টের কাজ চলছে। ক্রেস্টের অর্ডার নেওয়া ও ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের কাজও করা হয় এই দোকান থেকে। এই ছোট দোকানটিতেই তার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি ব্যবসা করছেন পল্লী চিকিৎসক ছফির উদ্দিন ও পোশাক বিক্রেতা রেদুয়ান হোসেন। তিনজনের ব্যবসা আলাদা হলেও তাদের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতা। একজন কোনো কাজে বাইরে গেলে অন্য দুজন তার দোকান ও মালামালের দেখভাল করেন। দোকানের ভাড়াও ভাগাভাগি করে পরিশোধ করেন তারা। ছোট্ট একটি জায়গায় তিন ধরনের ব্যবসার এই সহাবস্থানও জিম্মানুলের ব্যবসায়িক জীবনের একটি আলাদা গল্প। ‘অল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম’ নিজের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প বলতে গিয়ে জিম্মানুল আনোয়ার বলেন, “ছাত্রজীবন থেকেই ইচ্ছা ছিল নিজে কিছু করার। তাই পড়াশোনা শেষ করে অল্প পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। একটি কম্পিউটার ও একটি ফটোকপি মেশিন দিয়েই যাত্রা শুরু হয়েছিল। শুরুতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।” তিনি বলেন, “একটি কাজ দিয়ে শুরু করলেও ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী ধীরে ধীরে নতুন নতুন কাজ যুক্ত করেছি। মগ প্রিন্ট, গেঞ্জি প্রিন্ট করতে করতে পরে ক্রেস্ট তৈরির কাজ শুরু করি। এখন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্ডার আসে।” তার ভাষায়, “ব্যবসা করতে হলে ধৈর্য ধরতে হয়। শুরুতেই বড় কিছু হয়ে যাবে—এমনটা নয়। নিজের কাজের প্রতি আগ্রহ থাকতে হবে, নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করতে হবে এবং ক্রেতার চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে।” স্বপ্ন আরও বড় হওয়ার একটি কম্পিউটার ও একটি ফটোকপি মেশিন দিয়ে শুরু হয়েছিল যে পথচলা, তা এখন ক্রেস্ট তৈরির কারখানায় এসে দাঁড়িয়েছে। তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না জিম্মানুল। ভবিষ্যতে উৎপাদন আরও বাড়ানো, ব্যবসার পরিধি সম্প্রসারণ এবং আরও মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই তার লক্ষ্য। তার গল্পটি তাই শুধু একজন ব্যবসায়ীর সফলতার গল্প নয়। এটি অল্প পুঁজি নিয়ে শুরু করা একজন মানুষের ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করার গল্প। এটি স্বপ্ন দেখার এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাওয়ার গল্প। একটি কম্পিউটার ও একটি ফটোকপি মেশিন দিয়ে শুরু করা সেই পথচলা আজ ক্রেস্ট তৈরির কারখানায় পৌঁছেছে। আর জিম্মানুল আনোয়ারের সেই ছোট উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ১০ থেকে ১৫টি পরিবারের জীবিকা।