শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস বাংলাদেশে পালিত একটি বিশেষ দিবস। প্রতি বছর বাংলাদেশে ১৪ ডিসেম্বর দিনটিকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৭১ সালের ১০ থেকে ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির সব বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে। এ কাজে বাংলাদেশিদের মধ্যে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর সদস্যরা তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিল। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তানি বাহিনী ও তার দোসরদের চূড়ান্ত পরাভব স্বীকারের আগমুহূর্তে, বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের ঠাÐা মাথায় যে নৃশংসতার সঙ্গে হত্যা করা হয় এবং হত্যার পর ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত শবদেহগুলো বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে পরিত্যক্ত ইটের ভাটায় গাদাগাদি করে ফেলে রাখা হয়, সেই নিষ্ঠুরতার পেছনে মতাদর্শের ভ‚মিকা ও স্বরূপ যে এখনো আমরা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পেরেছি, তা বলা যাবে না। পরতে পরতে উন্মোচিত হয়েছে এই হত্যাকাÐের বাস্তবতা এবং সেই উন্মোচন এখনো এত বছর পরও রয়েছে অব্যাহত।
১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১-এ যে বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে ঘর থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেটা তো জানা গেল বিজয় অর্জনের পর। তিন দিন খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা ক্ষতবিক্ষত অনেক লাশ শনাক্ত করা যায়নি। অনেকের লাশের কোনো সন্ধান আর মেলেনি, হয়তো খুবলে খেয়েছে শকুন কিংবা কুকুর, কিংবা ফেলা হয়েছে আর কোনো গর্তে- যা আর কেউ কখনো খুঁজে পায়নি। দেশব্যাপী পরিচালিত নয় মাসের গণহত্যায় অগণিত মানুষের প্রাণদানের সীমাহীন ট্র্যাজেডিতে ভয়াবহ মাত্রা যোগ করেছিল বুদ্ধিজীবী হত্যা, যার কোনো সামরিক কার্যকারণ ছিল না, তবে বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে প্রবল আক্রোশ যে এখানে ফুটে উঠেছে, সেটা বুঝতে ভুল হওয়ার অবকাশ ছিল না। অচিরেই জানা গেল দুই ঘাতকের পরিচয় চৌধুরী মঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খান এবং হন্তারক সংগঠন, ইসলামী ছাত্রসংঘের পরীক্ষিত সদস্যদের নিয়ে গঠিত আলবদর বাহিনী সম্পর্কিত কিছু তথ্য।
গভর্নর হাউসে প্রশাসনের প্রধান মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর ডেস্ক ডায়েরিতে পাওয়া গেল অনেক বুদ্ধিজীবীর নাম, কারো নামের পাশে আছে ক্রসচিহ্ন, কোথাও বা লেখা বাড়ির নম্বর, অথবা কোনো মন্তব্য। নোটশিটের এক জায়গায় লেখা ছিল, ক্যাপ্টেন তাহির ব্যবস্থা করবে আলবদরদের গাড়ির। বুঝতে পারা যায়, সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক শক্তির যোগসাজশ, কিন্তু এর পেছনের দর্শন ও তথাকথিত ধর্মাদর্শ বিচার-বিশ্লেষণ অনেকটা থেকে যায় আড়ালে। ঘটনার পরম্পরা উদ্ঘাটিত হয়েছে পরতে পরতে, এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানি ঘাতকপ্রধানের কাছ থেকে পাওয়া গেছে তথ্য, আর ঘাতক দলের পক্ষ থেকেও পাওয়া গেছে গুপ্তবাহিনী গঠনের বিবরণী। উভয় ক্ষেত্রেই নিজেদের সাফাই গাওয়া এবং অহং প্রকাশের তাগিদ ছিল মুখ্য, কিন্তু সত্য তো অলক্ষ্যেই তার কাজ করে চলে। মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী লিখেছেন তার স্মৃতিকথা, লাহোরের জং পাবলিশার্স প্রকাশ করেছে ১৯৯২ সালে, সেখানে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাÐ সম্পর্কে অদ্ভুত সাফাই তিনি গেয়েছেন, লিখেছেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ ছিল, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাতে ২০০ বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যবস্থা আমি করেছি। আগের সন্ধ্যায় ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠিত হয় এবং ভারতীয়রা ঢাকা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়। সত্য ঘটনা হচ্ছে, ১৭ ডিসেম্বর সকালে অনেক মৃতদেহ পাওয়া যায়। এর আগে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে, তাই এই হত্যাকাÐ নিশ্চয় তারা ছাড়া অন্য কেউ করেছে।’ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাÐ ঘটেছে ১৪ ডিসেম্বর, বধ্যভ‚মি থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষ এর সরব সাক্ষী আর গলাপচা শবদেহগুলো সাক্ষ্য দিয়েছে নীরবে। রাও ফরমান আলীর পক্ষে তাই ১৬ ডিসেম্বর রাতে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাÐ ঘটার আষাঢ়ে গপ্প ফাঁদতে হয়, তবে গল্পকথার ফাঁকেও সত্য প্রকাশিত হয় অজান্তে। কাদালেপা মাইক্রোবাসে করে যে বুদ্ধিজীবীদের তুলে নিয়ে আসা হয়েছিল, তাদের বাড়ি থেকে, সেটা তো বিভিন্নভাবে জানা গিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে রাও ফরমান আলী বুদ্ধিজীবী হত্যাকাÐের পেছনের এক ঘটনা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বলেছেন, অবশ্যই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য। তিনি লিখেছেন, ‘১০ ডিসেম্বর সূর্যাস্তের সময় ঢাকার কমান্ডার মেজর জেনারেল জামশেদ আমাকে পিলখানায় তার দপ্তরে আসতে বলেন। তার কমান্ড পোস্টের কাছাকাছি এসে আমি অনেকগুলো গাড়ি দেখতে পাই। বাঙ্কার থেকে বেরিয়ে এসে তিনি আমাকে গাড়িতে উঠতে বলেন, কয়েক মিনিট পর আমি জানতে চাই, এই গাড়িগুলো কেন আনা হয়েছে? তিনি বললেন, ‘নিয়াজির সঙ্গে সেটা নিয়েই কথা বলতে চাই।’ ক্যান্টনমেন্টের হেডকোয়ার্টারের দিকে যেতে যেতে তিনি জানালেন, বিপুলসংখ্যক বুদ্ধিজীবী ও অগ্রণী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করার আদেশ তিনি পেয়েছেন। আমি তাকে বলি, কেন, কী কারণে? গ্রেপ্তার করার সময় তো এটা নয়।’ এই বয়ান স্পষ্টত বুঝিয়ে দেয় বুদ্ধিজীবীদের নিশ্চিহ্ন করার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল, তালিকা অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করার জন্য গাড়িও ছিল প্রস্তুত। তালিকা নিয়ে গাড়িতে সওয়ারি হয়ে বাড়ি বাড়ি যারা যাবে, সেই বাঙালি ঘাতকরাও ছিল তৈরি। এই ঘাতকদের দেখেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা, মুখ কাপড় দিয়ে আবৃত ছিল বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, তবে কারো কারো মুখের কাপড় সরে গিয়েছিল, পরে ছবি দেখে তাদের শনাক্ত করা যায় এবং এভাবে ঘটনার পরম্পরা হয়েছিল যুক্ত ও উন্মোচিত। ১০ ডিসেম্বর যে প্রশান্ত সন্ধ্যায় পিলখানায় প্রবেশের বিবরণ দিয়েছেন ফরমান আলী, সেখানে সেই দিনটির নাটকীয়তার কোনো উল্লেখ নেই, অথচ এই দিন সকালেই লড়াইয়ে হার মেনে গভর্নর হাউস থেকে জাতিসংঘ প্রতিনিধির কাছে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন ফরমান আলী স্বয়ং। যুদ্ধবিরতির সেই প্রস্তাব কার্যকর হয়নি, দাবি ছিল নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের। এরপর সংকট আরো ঘনীভ‚ত হয় এবং ১৩ ডিসেম্বর জেনারেল গুল হাসান রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রেরিত বার্তায় ইঙ্গিত দেন, পীতজাতি আসবে উত্তর থেকে, আর দক্ষিণ থেকে আসবে শ্বেতাঙ্গ। অর্থাৎ চীন ভারত সীমান্ত আক্রমণ করবে এবং বঙ্গোপসাগর দিয়ে ধেয়ে আসবে মার্কিন সপ্তম নৌবহর। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নিয়াজিকে আত্মসমর্পণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয় এবং বিলম্বিত হয় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ। বাড়তি সময়টুকুতে ঘটে বাড়তি ও ভয়ংকর নৃশংসতা বুদ্ধিজীবী হত্যা। বুদ্ধিজীবী নিধন পরিকল্পনা যারা বাস্তবায়ন করেছিল, সেই ঘাতক আলবদর কখনো তাদের অপরাধ স্বীকার করেনি, কিন্তু আলবদর বাহিনী গঠনের সবিস্তার বিবরণী তারা দাখিল করেছে তাদেরই প্রণীত গ্রন্থে। সেলিম মনসুর খালিদ প্রণীত উর্দু গ্রন্থ আলবদর প্রকাশিত হয়েছিল লাহোর থেকে জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামলে, ১৯৮৫ সালে। এই বইয়ে আল বদরপ্রধান, তাদের সহকারী ও অন্য সদস্যদের বিভিন্ন ভ‚মিকা তুলে ধরা হয়েছে ইসলামের স্বঘোষিত রক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, তবে সবার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে ছদ্মনাম। তার পরও সবচেয়ে বড় যে স্বীকৃতি ফুটে উঠেছে তা হলো, সেনাবাহিনীর বিধিবদ্ধ কাঠামোর বাইরে জঙ্গি ও হিংসাশ্রয়ী ইসলামের অনুসারী রাজনৈতিক দলের তরুণ ক্যাডারদের সেনাবাহিনীর অস্ত্র ও অর্থ দ্বারা সমর্থিত ও পরিচালিত গোষ্ঠীতে রূপান্তর। এই গোষ্ঠী যে হবে ঘাতকগোষ্ঠী, তাদের কার্যকলাপ যে হবে ‘ইসলামের শক্রকে উৎখাত’ করা, সেটা ছিল স্বতঃসিদ্ধ। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বুদ্ধিজীবী হত্যায় আলবদর নেতা আলী আহসান মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, চৌধুরী মঈনুদ্দিন, আশরাফুজ্জামান খান ও কাদের মোল্লার ভ‚মিকা বারবার উঠে এসেছে এবং এই বই সেখানে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে এসব হচ্ছে ঘটনার পরম্পরা, এর পেছনে যে মতাদর্শ, যা ধর্মের মহৎ আদর্শ অবলম্বন করে ঘৃণার বিষভা- তৈরি করে এবং পূর্ণ করে তোলে কানায় কানায়; সেসব তো দাবি করে আরো গভীর বিবেচনা। এই বিশ্লেষণ আমাদের বুঝতে সহায়তা করবে কীভাবে রোপিত হয় ঘৃণার বীজ এবং তা ক্রমে ক্রমে হয়ে ওঠে বিষবৃক্ষ, হয়ে ওঠে সমাজের ব্যাপক মানুষের জীবন-সংহারক।
শিরোনাম
শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস আজ, বাঙালিকে মেধাশূন্য করতেই বুদ্ধিজীবী হত্যা
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় : ০৭:১১:৩৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫
- ।
- 196
জনপ্রিয় সংবাদ
























