নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার চাঁদপুর হাটে সরকারি খাস খাজনা আদায়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। মাঠপর্যায়ে খাজনা আদায়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের সক্রিয় উপস্থিতির অভিযোগ থাকলেও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন তথ্য অস্বীকার করা হয়েছে। এতে প্রশাসনের বক্তব্য ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতির অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
সরকারি খাস হিসেবে পরিচালিত চাঁদপুর হাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খাজনা আদায়ের স্থানে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই। অথচ খাজনা আদায়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা প্রকাশ্যেই দাবি করেছেন, তারা সাবেক জেলা ছাত্রদল নেতার নির্দেশনায় খাজনা আদায় করছেন।
খাজনা আদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সোহেল হোসেন ও বিপ্লব হোসেন সাংবাদিকদের জানান, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মামুন ইউএনও অফিস থেকে লিজ নিয়েছেন। তার নির্দেশনায় আমরা খাজনা আদায় করছি।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, হাটে কোথাও সরকার নির্ধারিত খাজনার হার বা মূল্যতালিকা প্রদর্শন করা হয়নি। ফলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা কত টাকা কোন খাতে পরিশোধ করছেন, তার কোনো স্বচ্ছতা নেই।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি হিসাবে ৪০ কেজিতে এক মণ ধরা হলেও হাটে ৪২ থেকে ৪৩ কেজিতে এক মণ হিসেবে কৃষিপণ্য কেনাবেচা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি মণে অতিরিক্ত খাজনা আদায় করা হচ্ছে।
কৃষক সাকোয়াত ও রবিউল বলেন, ৪৩-৪৪ কেজিতে মণ ধরে পণ্য নিয়েছে, আবার প্রতি মণে ২০ টাকা খাজনাও কেটেছে। কোনো তালিকা না থাকায় ইচ্ছামতো টাকা নেওয়া হচ্ছে।
আরেক কৃষক লুৎফর রহমান বলেন, আমরা উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছি। তার ওপর অতিরিক্ত ওজন আর খাজনার চাপে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। খাস খাজনা আদায়ের দায়িত্বে থাকা বালুভরা ইউনিয়নের উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে সরাসরি ব্যাখ্যা না দিয়ে ইউএনওর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। অথচ তিনি নিজেই খাস আদায়ের দায়িত্বে রয়েছেন।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. পলাশ উদ্দিনও বিষয়টির দায়ভার ইউএনও কার্যালয়ের ওপর ন্যস্ত করে বলেন, এ বিষয়ে ইউএনও মহোদয় বলতে পারবেন।
অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান ছনি দাবি করেন, বিএনপি বা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা খাজনা আদায় করছে, এমন তথ্য আমার জানা নেই। এ ধরনের কাজ হওয়ার সুযোগও নেই।
তবে ইউএনওর এই বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে পাওয়া তথ্যের মিল খুঁজে পাচ্ছেন না স্থানীয়রা। কারণ খাজনা আদায়কারীরা নিজেরাই রাজনৈতিক ব্যক্তির নির্দেশনায় দায়িত্ব পালনের কথা স্বীকার করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, যদি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকে, তাহলে খাজনা আদায়কারীরা কার কর্তৃত্বে কাজ করছেন? আর যদি প্রশাসনের অনুমোদন থাকে, তাহলে সেই অনুমোদনের নথি কোথায়?
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খাস আদায়ের দায়িত্বে সরকারি কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকার কথা থাকলেও ঘটনাস্থলে তাদের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে মূল্যতালিকা টানানো হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, আগামী মাসের মধ্যে মূল্যতালিকা টানানোর ব্যবস্থা করা হবে।
কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন, খাস আদায় চলমান থাকা অবস্থায় মূল্যতালিকা ছাড়া এতদিন খাজনা আদায় হলো কীভাবে? সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে এত দীর্ঘ সময় লাগার কারণ কী?
শু/সবা
নওগাঁ প্রতিনিধিঃ 
























