০৬:৫১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ব্যয় সংকোচন নীতিতে সরকার

🔴সব ধরনের ব্যয় কমানোর চেষ্টা 

▶ সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন ব্যয় অনেক কমেছে

▶ সরকারি খরচে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হজ বন্ধ

▶কমছে ব্যক্তি পর্যায়ে চিকিৎসা খরচও 

▶রাজস্ব সংগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাচ্ছে না

▶টিকে থাকতে ব্যবসায় খরচ কমানোর দাবি

🔴অতিরিক্ত খরচ কমাতে পারলে দেশেরই লাভ; এতে সুফল আসবে   ড. এ. বি. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, অর্থনীতিবিদ

🔴এডিপি বাস্তবায়নের হার কমতে থাকা অর্থনীতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়  মুনতাসির কামাল, রিসার্চ ফেলো, সিপিডি

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা ও দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। খরচ কমাতে বদ্ধপরিকর সরকার। এর আগে কম গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দকৃত টাকার অর্ধেকের বেশি খরচ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কৃচ্ছ্রতা সাধনের কৌশল গ্রহণ করে কাজ করছে মন্ত্রণালয়গুলো।
চলতি রমজানে সরকারিভাবে বড় করে ইফতার পার্টি উদ্যাপন না করার জন্যও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি খোদ প্রধানমন্ত্রী এমন নির্দেশনা দেন। এছাড়া তিনি বেসরকারিভাবেও বড় করে ইফতার আয়োজনকে নিরুৎসাহিত করেছেন।
এদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকার ২ লাখ ৭৪ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা এডিপি বাজেটের মধ্যে মাত্র ৬১ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা ব্যয় করতে পেরেছে। গত ১৩ বছরের মধ্যে যা সর্বনিম্ন বাস্তবায়নের হার।
সূত্র জানায়, প্রতি বছর হজ যাত্রীদের সেবা দেওয়ার নামে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরের প্রায় ৩০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারি খরচে প্রতি বছর হজ পালন করেন। এতে সরকারের ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু হজযাত্রীদের কোনো লাভ হয় না। ফলে হাজি সেবার নামে সরকারি খরচে হজে যাওয়া বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি হজ ব্যবস্থাপনা জাতীয় কমিটির সভাপতি প্রধানমন্ত্রী হাজি সেবার নামে সরকারি খরচে হজে যাওয়া বন্ধসহ বেশ কিছু নির্দেশনা দেন।
চিকিৎসা খাতেও খরচ কমাতে চায় সরকার। দেশে ডলার সংকটের কথা মাথায় রেখে চিকিৎসা খরচ কমানোর পাশাপাশি উন্নত সেবার কথা চিন্তাও করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। উদ্যেশ্য হলো বিদেশে চিকিৎসাকে নিরুৎসাহিত করে দেশের চিকিৎসায় আস্থা তৈরি করা। এছাড়া চিকিৎসা বাবদ দেশের প্রতিটি রোগীর পকেট থেকে খরচ হয় ৫৪ ডলার বা সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। যা আরো কমানোর জন্য চেষ্টা করছে সরকার।
গত অর্থবছরে সরকার ৬০ থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা খরচ কমাতে টার্গেট নিয়েছিল। যদিও পরে তা বাস্তবায়ন হয়নি। দেশের সার্বিক অর্থব্যবস্থার কথা চিন্তা করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের দেশে ব্যয়ের পরিমাণ আরো কমাতে হবে। সম্প্রতি বিদেশ ভ্রমণ, যানবাহন কেনাকাটাসহ উন্নয়ন প্রকল্পের কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় কমানোর নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।
জানা গেছে, সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, মেরামত সংরক্ষণ, নির্মাণ ও পূর্ত এবং মালামাল কেনা এবং সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অর্থবছরের শেষ দিকে পদক্ষেপ নেয়া হয়। ফলে গুণগতমান নিশ্চিত করা যায় না। তাই প্রত্যেক প্রান্তিক শেষ হওয়ার এক মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা বলেছে সরকারের অর্থবিভাগ।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার মূল কারণ রাজস্ব আয় এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকা। বলা হচ্ছে, আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে সরকারি ঋণ এড়ানো এবং ঋণজনিত ব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব। বৈশ্বিক নানান সংকটে বাজেট ব্যবস্থাপনা সতর্কতার বিকল্প নেই বলেও মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ব্যয় ধীরগতিতে চলছে। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বরাদ্দের মাত্র ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশ ব্যবহার করা হয়েছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান এডিপি বাস্তবায়নের হার ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়েও কম। তখন ২ লাখ ১৪ হাজার ৬১১ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে বাস্তবায়নের হার ২৩ দশমিক ৮৯ শতাংশে নেমে এসেছিল।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অস্থায়ী তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে এনবিআর, যা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার কম।
অন্যদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ ১১ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকার মধ্যে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা বা ২৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
সর্বোচ্চ এডিপি বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৯১৭ কোটি ১১ লাখ টাকা, যা তাদের মোট বরাদ্দের মাত্র ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ। কম ব্যয় করা অন্যদের মধ্যে আছে- মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্য পরিষেবা বিভাগ। তবে, সেতু বিভাগ বাজেটের ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশ ব্যয় করে শীর্ষে ছিল। দ্বিতীয়তে আছে রেলপথ মন্ত্রণালয় (৩২ দশমিক ৩৩ শতাংশ) ও তৃতীয় কৃষি মন্ত্রণালয় (৩২ দশমিক ০৩ শতাংশ)।
এদিকে আগামী বাজেটে খরচ কমানোর কথা ভাবছে ব্যবসায়ীরা। সম্প্রতি ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি শুল্ক, আয়কর, মূসক ও অন্যান্য কর সম্পর্কিত প্রস্তাবনা ও সুপারিশ নিয়ে আলোচনার জন্য চেম্বার ও খাতভিত্তিক অ্যাসোসিয়েশনগুলোর প্রধানদের নিয়ে প্রাক-বাজেট মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছে দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন দি ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)। সভায় এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, আয়কর, আমদানি শুল্ক ও মূসক বিষয়ে মৌলিক প্রস্তাবনাসমূহ নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর, মূসক ও শুল্ক বিষয়ক বাজেট টাস্কফোর্সে আলোচনা  চলছে।
মাহবুবুল আলম আরো বলেন, দেশের জাতীয় অর্থনীতি একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ালেও চলমান বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে চলেছে। করোনা পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকট প্রভৃতি এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশকে আরও সুদৃঢ় ও জোরদার করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এডিপি বাস্তাবয়নের হার কমে গেলে দেশের অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মন্তব্য করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের রিসার্চ ফেলো মুনতাসির কামাল। তিনি বলেন, এভাবে এডিপি বাস্তবায়নের হার কমতে থাকা অর্থনীতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়। এছাড়া চলতি বছর সরকারের রাজস্ব আদায় কমে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটিও প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির একটি কারণ হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাজেট হওয়ার পর সেটার আর আইনগত তদারকি থাকে না। বিশেষ করে প্রকল্পের ক্ষেত্রে তদারকির ব্যবস্থা করা গেলে যে টাকাটা অবশিষ্ট থাকবে সেটা ব্যয়ের জন্য কেউ আর দৌড়াদৌড়ি করবে না, একটা নির্দিষ্ট হিসাব থাকবে। ফলে যেকোনো উপায়ে টাকাটা ব্যয় করার প্রবণতা আর থাকবে না।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এ. বি. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম সরকারের ব্যয় সংকোচনের বিষয়ে বলেন, অপচয় রোধে সরকার পরিকল্পনা নিয়েছে। এছাড়া অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে কৃচ্ছ্রতা সাধনের নীতিও গ্রহণ করতে দেখা গেছে। অতিরিক্ত খরচ কমিয়ে আনতে পারলে দেশেরই লাভ। এতে সুফল আসবে। বাজেটের উপর চাপ কমবে।
মুঠোফোনে আলাপকালে তিনি সবুজ বাংলাকে বলেন, সরকারে খরচের পরিমাণ বেশি হলে বাজেট বাড়বে। বাজেট ঘাটতি থাকলে ব্যাংক ঋণ বাড়বে। ফলে মূদ্রাস্ফীতি আরো বাড়বে।
জনপ্রিয় সংবাদ

ব্যয় সংকোচন নীতিতে সরকার

আপডেট সময় : ০৯:৪১:০৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ মার্চ ২০২৪

🔴সব ধরনের ব্যয় কমানোর চেষ্টা 

▶ সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন ব্যয় অনেক কমেছে

▶ সরকারি খরচে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হজ বন্ধ

▶কমছে ব্যক্তি পর্যায়ে চিকিৎসা খরচও 

▶রাজস্ব সংগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাচ্ছে না

▶টিকে থাকতে ব্যবসায় খরচ কমানোর দাবি

🔴অতিরিক্ত খরচ কমাতে পারলে দেশেরই লাভ; এতে সুফল আসবে   ড. এ. বি. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, অর্থনীতিবিদ

🔴এডিপি বাস্তবায়নের হার কমতে থাকা অর্থনীতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়  মুনতাসির কামাল, রিসার্চ ফেলো, সিপিডি

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা ও দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। খরচ কমাতে বদ্ধপরিকর সরকার। এর আগে কম গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দকৃত টাকার অর্ধেকের বেশি খরচ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কৃচ্ছ্রতা সাধনের কৌশল গ্রহণ করে কাজ করছে মন্ত্রণালয়গুলো।
চলতি রমজানে সরকারিভাবে বড় করে ইফতার পার্টি উদ্যাপন না করার জন্যও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি খোদ প্রধানমন্ত্রী এমন নির্দেশনা দেন। এছাড়া তিনি বেসরকারিভাবেও বড় করে ইফতার আয়োজনকে নিরুৎসাহিত করেছেন।
এদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকার ২ লাখ ৭৪ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা এডিপি বাজেটের মধ্যে মাত্র ৬১ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা ব্যয় করতে পেরেছে। গত ১৩ বছরের মধ্যে যা সর্বনিম্ন বাস্তবায়নের হার।
সূত্র জানায়, প্রতি বছর হজ যাত্রীদের সেবা দেওয়ার নামে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরের প্রায় ৩০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারি খরচে প্রতি বছর হজ পালন করেন। এতে সরকারের ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু হজযাত্রীদের কোনো লাভ হয় না। ফলে হাজি সেবার নামে সরকারি খরচে হজে যাওয়া বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি হজ ব্যবস্থাপনা জাতীয় কমিটির সভাপতি প্রধানমন্ত্রী হাজি সেবার নামে সরকারি খরচে হজে যাওয়া বন্ধসহ বেশ কিছু নির্দেশনা দেন।
চিকিৎসা খাতেও খরচ কমাতে চায় সরকার। দেশে ডলার সংকটের কথা মাথায় রেখে চিকিৎসা খরচ কমানোর পাশাপাশি উন্নত সেবার কথা চিন্তাও করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। উদ্যেশ্য হলো বিদেশে চিকিৎসাকে নিরুৎসাহিত করে দেশের চিকিৎসায় আস্থা তৈরি করা। এছাড়া চিকিৎসা বাবদ দেশের প্রতিটি রোগীর পকেট থেকে খরচ হয় ৫৪ ডলার বা সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। যা আরো কমানোর জন্য চেষ্টা করছে সরকার।
গত অর্থবছরে সরকার ৬০ থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা খরচ কমাতে টার্গেট নিয়েছিল। যদিও পরে তা বাস্তবায়ন হয়নি। দেশের সার্বিক অর্থব্যবস্থার কথা চিন্তা করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের দেশে ব্যয়ের পরিমাণ আরো কমাতে হবে। সম্প্রতি বিদেশ ভ্রমণ, যানবাহন কেনাকাটাসহ উন্নয়ন প্রকল্পের কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় কমানোর নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।
জানা গেছে, সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, মেরামত সংরক্ষণ, নির্মাণ ও পূর্ত এবং মালামাল কেনা এবং সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অর্থবছরের শেষ দিকে পদক্ষেপ নেয়া হয়। ফলে গুণগতমান নিশ্চিত করা যায় না। তাই প্রত্যেক প্রান্তিক শেষ হওয়ার এক মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা বলেছে সরকারের অর্থবিভাগ।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার মূল কারণ রাজস্ব আয় এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকা। বলা হচ্ছে, আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে সরকারি ঋণ এড়ানো এবং ঋণজনিত ব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব। বৈশ্বিক নানান সংকটে বাজেট ব্যবস্থাপনা সতর্কতার বিকল্প নেই বলেও মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ব্যয় ধীরগতিতে চলছে। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বরাদ্দের মাত্র ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশ ব্যবহার করা হয়েছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান এডিপি বাস্তবায়নের হার ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়েও কম। তখন ২ লাখ ১৪ হাজার ৬১১ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে বাস্তবায়নের হার ২৩ দশমিক ৮৯ শতাংশে নেমে এসেছিল।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অস্থায়ী তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে এনবিআর, যা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার কম।
অন্যদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ ১১ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকার মধ্যে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা বা ২৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
সর্বোচ্চ এডিপি বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৯১৭ কোটি ১১ লাখ টাকা, যা তাদের মোট বরাদ্দের মাত্র ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ। কম ব্যয় করা অন্যদের মধ্যে আছে- মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্য পরিষেবা বিভাগ। তবে, সেতু বিভাগ বাজেটের ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশ ব্যয় করে শীর্ষে ছিল। দ্বিতীয়তে আছে রেলপথ মন্ত্রণালয় (৩২ দশমিক ৩৩ শতাংশ) ও তৃতীয় কৃষি মন্ত্রণালয় (৩২ দশমিক ০৩ শতাংশ)।
এদিকে আগামী বাজেটে খরচ কমানোর কথা ভাবছে ব্যবসায়ীরা। সম্প্রতি ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি শুল্ক, আয়কর, মূসক ও অন্যান্য কর সম্পর্কিত প্রস্তাবনা ও সুপারিশ নিয়ে আলোচনার জন্য চেম্বার ও খাতভিত্তিক অ্যাসোসিয়েশনগুলোর প্রধানদের নিয়ে প্রাক-বাজেট মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছে দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন দি ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)। সভায় এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, আয়কর, আমদানি শুল্ক ও মূসক বিষয়ে মৌলিক প্রস্তাবনাসমূহ নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর, মূসক ও শুল্ক বিষয়ক বাজেট টাস্কফোর্সে আলোচনা  চলছে।
মাহবুবুল আলম আরো বলেন, দেশের জাতীয় অর্থনীতি একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ালেও চলমান বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে চলেছে। করোনা পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকট প্রভৃতি এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশকে আরও সুদৃঢ় ও জোরদার করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এডিপি বাস্তাবয়নের হার কমে গেলে দেশের অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মন্তব্য করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের রিসার্চ ফেলো মুনতাসির কামাল। তিনি বলেন, এভাবে এডিপি বাস্তবায়নের হার কমতে থাকা অর্থনীতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়। এছাড়া চলতি বছর সরকারের রাজস্ব আদায় কমে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটিও প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির একটি কারণ হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাজেট হওয়ার পর সেটার আর আইনগত তদারকি থাকে না। বিশেষ করে প্রকল্পের ক্ষেত্রে তদারকির ব্যবস্থা করা গেলে যে টাকাটা অবশিষ্ট থাকবে সেটা ব্যয়ের জন্য কেউ আর দৌড়াদৌড়ি করবে না, একটা নির্দিষ্ট হিসাব থাকবে। ফলে যেকোনো উপায়ে টাকাটা ব্যয় করার প্রবণতা আর থাকবে না।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এ. বি. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম সরকারের ব্যয় সংকোচনের বিষয়ে বলেন, অপচয় রোধে সরকার পরিকল্পনা নিয়েছে। এছাড়া অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে কৃচ্ছ্রতা সাধনের নীতিও গ্রহণ করতে দেখা গেছে। অতিরিক্ত খরচ কমিয়ে আনতে পারলে দেশেরই লাভ। এতে সুফল আসবে। বাজেটের উপর চাপ কমবে।
মুঠোফোনে আলাপকালে তিনি সবুজ বাংলাকে বলেন, সরকারে খরচের পরিমাণ বেশি হলে বাজেট বাড়বে। বাজেট ঘাটতি থাকলে ব্যাংক ঋণ বাড়বে। ফলে মূদ্রাস্ফীতি আরো বাড়বে।