০৯:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

থামছেই না পণ্যবাহী গাড়িতে চাঁদাবাজি

➤ঈদ ঘিরে বিভিন্ন সড়কে ‘সরব’ চাঁদাবাজরা
➤ সড়কে গাড়ির চাকা ঘুরলেই যেন টাকা ওড়ে
➤মাসে চাঁদা উঠছে শতকোটি টাকা
➤ প্রভাব পড়ছে পণ্যমূল্যের বাজারে
➤ঢাকায় ১১টি প্রবেশমুখসহ চাঁদাবাজির শতাধিক স্পট
➤জড়িত মালিক-শ্রমিক ও দলীয় নেতাসহ বিভিন্ন মহল
➤ চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

 

 

 

নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাঁদাবাজি বন্ধে দু’দফা কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকলেও থামছেই না চাঁদাবাজি। আসন্ন ঈদকে ঘিরে রাজধানীর সড়ক-মহাসড়কে পথে পথে পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ও পিকআপসহ বিভিন্ন যানবাহনে রাখঢাক ছাড়াই চলছে ‘সরব’ চাঁদাবাজি। রাজধানী ঢাকার ১৫টি প্রবেশমুখে ও ভেতরে শতাধিক পয়েন্টে নানান কৌশলে পণ্যবাহী পরিবহন থেকে চাঁদা তোলা হচ্ছে। পণ্যবাহী ট্রাক চালকরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে পোশাকধারী পুলিশ সদস্য, কখনো পুলিশ পরিচয়ে তাদের দালাল ঢাকার প্রবেশমুখসহ বিভিন্ন স্পটে পণ্যবাহী গাড়ি থামিয়ে চাঁদা তুলছে। চাঁদা না দিলেই পুলিশ দিয়ে গাড়ি রেকারিংসহ ঠুনকো অজুহাতে মামলা ঠুকে দিচ্ছে। তাই নিরুপায় হয়েই সড়কপথের ঝামেলা এড়াতে চক্রটির হাতে নির্ধারিত চাঁদার টাকা তুলে দিচ্ছেন তারা। এ কারণে পণ্যমূল্যের লাগামহীন দাম কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণে আসছে না। র‌্যাব বলছে, যারাই চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

 

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানী ঢাকায় প্রবেশে মূল সড়কসহ শাখা-প্রশাখায় অন্তত ১৫টি পয়েন্ট রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- মিরপুর দিয়াবাড়ি, গাবতলী, বসিলা, বাবুবাজার, পোস্তগোলা, কাঁচপুর, কাজলা, ডেমরা, আফতাবনগর, পূর্বাচল ৩০০ ফিট সড়ক, টঙ্গী, উত্তরা, তুরাগ, ধউর ও বিরুলিয়া। গাবতলী থেকে বেড়িবাঁধ দিয়ে প্রতিদিন পণ্যবাহী ফলের শত শত ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ও পিকআপ ঢুকছে বাবুবাজার ফল ও চালের আড়তে। এ রুটে গাবতলীতে ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহন থেকে প্রতিদিন চাঁদা তোলেন টিআই ইব্রাহীম, সার্জেন্ট পলাশ, ট্রাক মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশন, গাবতলী বাস টার্মিনালের কথিত ইজারাদার রাফি ট্রেডার্সের মাঠকর্মী আলাউদ্দিন, আরিফ, সোহেল ও শাকিল। এ বিষয়ে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর খায়রুল আলম বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না।

 

 

 

 

প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন) সালমা আক্তার খুকী বলেন, কেবলমাত্র বাস টার্মিনালের যাবতীয় বিষয় দেখাশোনা করতে পারবে ইজারাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। সড়কের ইজারা কাউকে দেওয়া হয়নি। বিষয়টির খোঁজ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। বেড়িবাঁধের ঢাকা উদ্যান, মোহাম্মদপুরের বসিলা মোড়, রায়েরবাজার কৃষি মার্কেট, সিকদার মেডিকেল, হাজারীবাগ এলাকায় রয়েছে পুলিশ সোর্সের সমন্বয়ে গড়ে তোলা সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজচক্র। বেড়িবাঁধের মাহতাব পাম্পের সামনে গাড়ি থামিয়ে পুলিশের নাম ভাঙিয়ে প্রতিটি গাড়ি থেকে ২০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকা করে চাঁদা তোলেন পুলিশের দালাল বেল্লাল ওরফে বিল্লাল। নবাবগঞ্জ সেকশন বটতলা ও বেড়িবাঁধ এলাকায় রয়েছে একাধিক রুটের গাড়ির স্ট্যান্ড। এই স্ট্যান্ড থেকে নিয়মিত মাসিক হারে অবৈধ শতাধিক ইজিবাইক থেকে কয়েক লাখ টাকা চাঁদা তোলেন টিআই সোহেলসহ তার অনুসারি কয়েকজন সার্জেন্ট ও স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। এ রুটে পুলিশকে চাঁদা তুলে দেন বিএনপি আমলের কুখ্যাত সন্ত্রাসী পুলিশের সোর্স রোজিনা বাবু। একই সঙ্গে রেকারের বিল না কেটে ৬০০ টাকা নিয়ে অটোরিকশা ছেড়ে দেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে টিআই সোহেল বলেন, আমি এখানে যোগদান করেছি মাত্র ছয় মাস হলো। দশ বছর আগ থেকেই এখানে বিভিন্ন রুটের যানবাহন চলাচল করছে। পণ্যবাহী ও স্ট্যান্ড থেকে দৈনিক ও মাসিক হারে চাঁদা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন বলেন, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্য। রাতের বেলায় এ রুটে চলাচলকারী পণ্যবাহী সব ধরনের গাড়ি থামিয়ে কাগজপত্র তল্লাশির নামে বেড়িবাঁধের ভাসমান ফার্নিচার মার্কেটের সামনে চাঁদা তোলেন নবাবগঞ্জ সেকশন ফাঁড়ির পুলিশ সদস্য জুলফিকার আলীসহ অন্য পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। তারা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থেকে লেজার লাইট মেরে প্রতিটি গাড়ির গতিরোধ করে শ্রেণিভেদে ২০০, ৩০০, ৫০০ টাকা হারে চাঁদা তোলেন। নবাবগঞ্জ বড় মসজিদের ঢালে দুটি গ্যারেজ থেকে মাসে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা তোলেন ডিএসসিসির কথিত ইজারাদার জাকির হোসেন ও তার অনুসারীরা।

 

 

ভোরে সেই টাকা ফাঁড়িতে নিয়ে ভাগবাটোয়ারা করেন তারা। এ রুটের কিল্লার মোড় লোহার ব্রিজে টিআই লোকমান, সোয়ারীঘাটে টিআই সাইফুল, বাবুবাজারে টিআই জানে আলম, আজিমপুর মোড়ে রয়েছেন শুভাশীষ, গুলিস্তানে গোলাপশাহ মোড়ে রয়েছেন টিআই জিয়াউল হক, বঙ্গবাজার সংলগ্ন আনন্দ বাজারে পিআই বুলবুল, বংশালে টিআই পল্লব, মতিঝিলে সার্জেন্ট মাহাবুব। ঢাকেশ^রী মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবল জাহাঙ্গীর, সালাম, মনির ও সামাদ। এরা অটোরকিশা আটকে সিøপ না দিয়ে হাফ রেকার বিলের নামে ৬০০ টাকা আদায় করে নিজেদের পকেটে ভরে নেয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী রিকশাচালকরা। কামরাঙ্গীরচরে ওসির নির্দেশে তার বডিগার্ড ও ড্রাইভারসহ কতিপয় পুলিশ ও আসনার সদস্য বিভিন্ন লেগুনা ও ইজিবাইক স্ট্যান্ড থেকে মাসিক হারে চাঁদা তোলেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগে প্রতিদিন রাতে পুলিশের নামে পণ্যবাহী গাড়ি থামিয়ে নিয়মিত চাঁদা তোলেন বশির ও তার সহযোগীরা। চাঁদা না দিলে মারধরসহ পুলিশ দিয়ে হয়রানি এমনকি অস্ত্র ঠেকিয়ে পণ্যসহ গাড়ি নিয়ে যায় গোপন আস্তানায়। সেখানে মালিকপক্ষকে ডেকে দেনদরবার করা হয়। গুলিস্তানের গোলাপশাহ মোড়ে বিভিন্ন স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে টিআই জিয়াউল হক বলেন, আমি কোনো গাড়ি বা স্ট্যান্ড থেকে টাকা তুলি না। তবে কেউ তোলে কি না এটা আমার জানা নেই।

 

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ট্রাক-কাভার্ডভ্যান চালক বলেন, পথে পথে চাঁদা না দিলে সড়কে গাড়ির চাকাও ঘুরানো যায় না। ট্রাক মালিক সমিতির নামে প্রতিদিন গাড়ির শ্রেণিভেদে ২০০, ৫০০ ও ৭০০ করে জিপির টাকা দিতে হয়। এছাড়া ঢাকার দুই সিটি এলাকার অন্তত দেড়শতাধিক স্পটে কথিত ইজারাদাররা প্রতি গাড়ি থেকে শ্রেণিভেদে ৫০, ১০০ ও ২০০ টাকা করে তুলে নেন। চাঁনখারপুল মোড়ে প্রতিদিন রাতে শতাধিক পরিবহনে পণ্য লোড-আনলোডকালে কথিত সাংবাদিক মাসুদ রানা ও তার সহযোগীসহ পুলিশের কয়েকজন সোর্স মিলে বিভিন্ন কাগজপত্র তল্লাশির কথা বলে নিয়মিত চাঁদা তুলে নেয়। টাকা দিতে না চাইলে স্থানীয়ভাবে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে ট্রাফিক ও থানা পুলিশকে ডেকে এনে হয়রানি করে। এমনকি ঠুনকো অজুহাতে মামলাও ঠুকে দেয়। তাই ঝামেলা এড়াতে ২০০, ৫০০ ও ১ থেকে দেড় হাজার টাকা তুলে দেন তারা। তারা আরো জানান, কারওয়ানবাজারে পণ্যবাহী গাড়ি দেখলেই শ্রমিক সংগঠন, কুলি, সমিতি ও পুলিশের নামে চাঁদা তোলা হয়। যার পরিমাণ শত কোটি টাকা। এর ফলে এই চাঁদার টাকা পণ্যমূল্যের ওপর প্রভাব পড়ছে। সরকারের পক্ষ থেকে পণ্যবাহী পরিবহনে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া গাড়ি থামানো ও চাঁদাবাজি করা যাবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও বাস্তবে মাঠ প্রশাসনের কেউই তা মানছেন না। সড়কে চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধে বহুবার ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। আশ^াসে সড়কে নামলে কিছুদিন স্বাভাবিকভাবে গাড়ির চাকা ঘুরলেও সপ্তাহ না পেরুতেই সড়ক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মাঠপর্যায়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের আচরণে আবারো সেই পুরোনো চিত্র দেখা যায়। রংপুর থেকে পণ্য নিয়ে ঢাকার কারওয়ানবাজারে আসা ট্রাকচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, পণ্য নিয়ে এ পর্যন্ত পৌঁছাতে পথে পথে টোকেন চাঁদা দিতে হয়েছে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে শ্রমিক সংগঠন, সংশ্লিষ্ট এলাকার থানা, ফাঁড়ি ও ট্রাফিক পুলিশ বক্স রয়েছে।

 

 

 

এছাড়া রয়েছে পৌর এলাকার ইজারাদার ও স্থানীয় নেতা-কর্মী। ট্রাক-কাভার্ডভ্যান চালক ও মালিক সমিতির এক নেতা বলেন, বাবুবাজার ব্রিজের নিচে আপনি সরেজমিন এসে দেখবেন পুলিশের কেন অত্যাচার আর দৌরাত্ম্য। গাড়ির যাবতীয় কাগজপত্র, ফিটনেস সার্টিফিকেট ও ট্যাক্সটোকেন আপডেট থাকার পরও চাঁদা না দিলেই রেকারিং বিল করা হয় ২২০০ টাকা। রেকারিং বিল পরিশোধ করার পরও ৭ থেকে ৮০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়। গাবতলী থেকে বেড়িবাঁধ দিয়ে প্রতিটি স্পট মিলে মোট চাঁদা গুনতে হয় প্রায় দুই হাজার টাকা। ট্রাকচালক আমির হোসেন বলেন, নীলফামারীর সৈয়দপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত একটি ট্রাককে ১৪ স্থানে ৫ হাজার ৪০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। সঙ্গে রয়েছে ‘মান্থলি’ চাঁদা। আরেক ট্রাকের চালক তাজুল ইসলাম বলেন, সৈয়দপুরে ট্রাক চলাচলে বাইপাস সড়ক রাতভর থাকে জমজমাট। ট্রাকে মালপত্র তোলা হয় রাতে। সকালে সেগুলো যাত্রা করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে। ওই ট্রাকের চালক তাজুল ইসলাম বলেন, সহকারী মজনুকে স্টিয়ারিংয়ের বাম পাশে বসিয়ে দীর্ঘ ৩৫৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে গাড়ি বাইপাস সড়কে উঠাতেই সহকারী মজনু হাঁক দিলেন, ‘ওস্তাদ, খাড়াইছে’। দেখলাম চার-পাঁচজন পোশাকধারী পুলিশ দাঁড়িয়ে। ট্রাক থামালে এক পুলিশ সদস্য জানালার কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল। বলল, তাড়াতাড়ি মালপানি ছাড়। ২০০ টাকা দিয়ে ট্রাক নিয়ে সামনে এগোলেন তাজুল। তিনি বলেন, সড়কে চাঁদা না দিলে সহজেই গাড়ির চাকা ঘুরানো যায় না। খুব ছ্যাঁচড়া এরা। ১০০ টাকা হলেও নেবে। বাকি পথেও এভাবে ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হয়েছে- এমন প্রশ্নে এক গাল হেসে বললেন, ‘সবে তো শুরু। রাত-দিন পরিশ্রম করে বাড়ি তো দূরের কথা ভালো ফ্ল্যাটে থাকারও সাহস করি না। আর পুলিশের একজন কনস্টেবল একাধিক বাড়ির মালিক হয়। এসব না করলে তারা কীভাবে চলবে। মাঝেমধ্যে সড়কে পুলিশ গাড়ি থামালেও মান্থলি (জিপিআর) কার্ড দেখালে ছেড়ে দেয়।

 

এদিকে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, সম্প্রতি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকায় প্রবেশপথগুলোসহ বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে পণ্যবাহী ট্রাক থেকে চাঁদা আদায়ের দায়ে ৫১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ঢাকায় অন্তত ছয়টি স্থানে পণ্যবাহী ট্রাক থেকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। কারওয়ানবাজার, বাবুবাজার, গুলিস্তান, দৈনিক বাংলা মোড়, ইত্তেফাক মোড়, টিটিপাড়া, কাজলা, গাবতলী, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টারসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা, একটি লেজার লাইট, সিটি করপোরেশনসহ ছয় প্রতিষ্ঠানের জ্যাকেট, দুটি অন্যান্য লাইট, চারটি আইডি কার্ড, ৪১টি মোবাইল ফোন ও বিপুল পরিমাণ চাঁদা আদায়ের রসিদ উদ্ধার করা হয়েছে। এরা কখনো সিটি করপোরেশন, কখনো শ্রমিক সংগঠন, কখনো কল্যাণ সমিতি, কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে এই চাঁদা আদায় করা হয়।

 

 

তিনি বলেন, মধ্যরাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যখন পণ্যবাহী ট্রাক ঢাকায় প্রবেশ করে, তখন চাঁদা উত্তোলন শুরু হয়। একটি গ্রুপ চাঁদা উত্তোলন করে কথিত ইজারাদারদের কাছে জমা দেয়। তারা সিন্ডিকেটের মধ্যে টাকা ভাগবাটোয়ারা করে। চাঁদা উত্তোলনকারীরা প্রতি রাতে মজুরি হিসেবে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পায়। প্রতিটি স্পট থেকে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা চাঁদা আদায় করে তারা। কমান্ডার বলেন, চাঁদাবাজির সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ওপরের লেভেলের কয়েকজনের নাম পেয়েছি। আমরা তা যাচাই-বাছাই করছি। তারা যে সংস্থারই হোক, অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

 

 

এদিকে গত সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আসন্ন ঈদুল ফিতরের প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যানজট নিরসনে হাইওয়ে পুলিশ, র‌্যাব, জেলা পুলিশ সমন্বয় করে কাজ করবে। যানজট নিরসনে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ কর্তৃক চিহ্নিত স্পটে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে যানজট পরিস্থিতি মনিটর করবেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন সড়কে স্থায়ী ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। মহাসড়কে নির্দিষ্ট স্থানে যানজটপ্রবণ এলাকায় রেকার থাকবে। ড্রোন ব্যবহার করা হবে। সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

থামছেই না পণ্যবাহী গাড়িতে চাঁদাবাজি

আপডেট সময় : ০৪:২১:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ এপ্রিল ২০২৪

➤ঈদ ঘিরে বিভিন্ন সড়কে ‘সরব’ চাঁদাবাজরা
➤ সড়কে গাড়ির চাকা ঘুরলেই যেন টাকা ওড়ে
➤মাসে চাঁদা উঠছে শতকোটি টাকা
➤ প্রভাব পড়ছে পণ্যমূল্যের বাজারে
➤ঢাকায় ১১টি প্রবেশমুখসহ চাঁদাবাজির শতাধিক স্পট
➤জড়িত মালিক-শ্রমিক ও দলীয় নেতাসহ বিভিন্ন মহল
➤ চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

 

 

 

নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাঁদাবাজি বন্ধে দু’দফা কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকলেও থামছেই না চাঁদাবাজি। আসন্ন ঈদকে ঘিরে রাজধানীর সড়ক-মহাসড়কে পথে পথে পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ও পিকআপসহ বিভিন্ন যানবাহনে রাখঢাক ছাড়াই চলছে ‘সরব’ চাঁদাবাজি। রাজধানী ঢাকার ১৫টি প্রবেশমুখে ও ভেতরে শতাধিক পয়েন্টে নানান কৌশলে পণ্যবাহী পরিবহন থেকে চাঁদা তোলা হচ্ছে। পণ্যবাহী ট্রাক চালকরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে পোশাকধারী পুলিশ সদস্য, কখনো পুলিশ পরিচয়ে তাদের দালাল ঢাকার প্রবেশমুখসহ বিভিন্ন স্পটে পণ্যবাহী গাড়ি থামিয়ে চাঁদা তুলছে। চাঁদা না দিলেই পুলিশ দিয়ে গাড়ি রেকারিংসহ ঠুনকো অজুহাতে মামলা ঠুকে দিচ্ছে। তাই নিরুপায় হয়েই সড়কপথের ঝামেলা এড়াতে চক্রটির হাতে নির্ধারিত চাঁদার টাকা তুলে দিচ্ছেন তারা। এ কারণে পণ্যমূল্যের লাগামহীন দাম কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণে আসছে না। র‌্যাব বলছে, যারাই চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

 

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানী ঢাকায় প্রবেশে মূল সড়কসহ শাখা-প্রশাখায় অন্তত ১৫টি পয়েন্ট রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- মিরপুর দিয়াবাড়ি, গাবতলী, বসিলা, বাবুবাজার, পোস্তগোলা, কাঁচপুর, কাজলা, ডেমরা, আফতাবনগর, পূর্বাচল ৩০০ ফিট সড়ক, টঙ্গী, উত্তরা, তুরাগ, ধউর ও বিরুলিয়া। গাবতলী থেকে বেড়িবাঁধ দিয়ে প্রতিদিন পণ্যবাহী ফলের শত শত ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ও পিকআপ ঢুকছে বাবুবাজার ফল ও চালের আড়তে। এ রুটে গাবতলীতে ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহন থেকে প্রতিদিন চাঁদা তোলেন টিআই ইব্রাহীম, সার্জেন্ট পলাশ, ট্রাক মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশন, গাবতলী বাস টার্মিনালের কথিত ইজারাদার রাফি ট্রেডার্সের মাঠকর্মী আলাউদ্দিন, আরিফ, সোহেল ও শাকিল। এ বিষয়ে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর খায়রুল আলম বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না।

 

 

 

 

প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন) সালমা আক্তার খুকী বলেন, কেবলমাত্র বাস টার্মিনালের যাবতীয় বিষয় দেখাশোনা করতে পারবে ইজারাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। সড়কের ইজারা কাউকে দেওয়া হয়নি। বিষয়টির খোঁজ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। বেড়িবাঁধের ঢাকা উদ্যান, মোহাম্মদপুরের বসিলা মোড়, রায়েরবাজার কৃষি মার্কেট, সিকদার মেডিকেল, হাজারীবাগ এলাকায় রয়েছে পুলিশ সোর্সের সমন্বয়ে গড়ে তোলা সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজচক্র। বেড়িবাঁধের মাহতাব পাম্পের সামনে গাড়ি থামিয়ে পুলিশের নাম ভাঙিয়ে প্রতিটি গাড়ি থেকে ২০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকা করে চাঁদা তোলেন পুলিশের দালাল বেল্লাল ওরফে বিল্লাল। নবাবগঞ্জ সেকশন বটতলা ও বেড়িবাঁধ এলাকায় রয়েছে একাধিক রুটের গাড়ির স্ট্যান্ড। এই স্ট্যান্ড থেকে নিয়মিত মাসিক হারে অবৈধ শতাধিক ইজিবাইক থেকে কয়েক লাখ টাকা চাঁদা তোলেন টিআই সোহেলসহ তার অনুসারি কয়েকজন সার্জেন্ট ও স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। এ রুটে পুলিশকে চাঁদা তুলে দেন বিএনপি আমলের কুখ্যাত সন্ত্রাসী পুলিশের সোর্স রোজিনা বাবু। একই সঙ্গে রেকারের বিল না কেটে ৬০০ টাকা নিয়ে অটোরিকশা ছেড়ে দেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে টিআই সোহেল বলেন, আমি এখানে যোগদান করেছি মাত্র ছয় মাস হলো। দশ বছর আগ থেকেই এখানে বিভিন্ন রুটের যানবাহন চলাচল করছে। পণ্যবাহী ও স্ট্যান্ড থেকে দৈনিক ও মাসিক হারে চাঁদা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন বলেন, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্য। রাতের বেলায় এ রুটে চলাচলকারী পণ্যবাহী সব ধরনের গাড়ি থামিয়ে কাগজপত্র তল্লাশির নামে বেড়িবাঁধের ভাসমান ফার্নিচার মার্কেটের সামনে চাঁদা তোলেন নবাবগঞ্জ সেকশন ফাঁড়ির পুলিশ সদস্য জুলফিকার আলীসহ অন্য পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। তারা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থেকে লেজার লাইট মেরে প্রতিটি গাড়ির গতিরোধ করে শ্রেণিভেদে ২০০, ৩০০, ৫০০ টাকা হারে চাঁদা তোলেন। নবাবগঞ্জ বড় মসজিদের ঢালে দুটি গ্যারেজ থেকে মাসে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা তোলেন ডিএসসিসির কথিত ইজারাদার জাকির হোসেন ও তার অনুসারীরা।

 

 

ভোরে সেই টাকা ফাঁড়িতে নিয়ে ভাগবাটোয়ারা করেন তারা। এ রুটের কিল্লার মোড় লোহার ব্রিজে টিআই লোকমান, সোয়ারীঘাটে টিআই সাইফুল, বাবুবাজারে টিআই জানে আলম, আজিমপুর মোড়ে রয়েছেন শুভাশীষ, গুলিস্তানে গোলাপশাহ মোড়ে রয়েছেন টিআই জিয়াউল হক, বঙ্গবাজার সংলগ্ন আনন্দ বাজারে পিআই বুলবুল, বংশালে টিআই পল্লব, মতিঝিলে সার্জেন্ট মাহাবুব। ঢাকেশ^রী মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবল জাহাঙ্গীর, সালাম, মনির ও সামাদ। এরা অটোরকিশা আটকে সিøপ না দিয়ে হাফ রেকার বিলের নামে ৬০০ টাকা আদায় করে নিজেদের পকেটে ভরে নেয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী রিকশাচালকরা। কামরাঙ্গীরচরে ওসির নির্দেশে তার বডিগার্ড ও ড্রাইভারসহ কতিপয় পুলিশ ও আসনার সদস্য বিভিন্ন লেগুনা ও ইজিবাইক স্ট্যান্ড থেকে মাসিক হারে চাঁদা তোলেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগে প্রতিদিন রাতে পুলিশের নামে পণ্যবাহী গাড়ি থামিয়ে নিয়মিত চাঁদা তোলেন বশির ও তার সহযোগীরা। চাঁদা না দিলে মারধরসহ পুলিশ দিয়ে হয়রানি এমনকি অস্ত্র ঠেকিয়ে পণ্যসহ গাড়ি নিয়ে যায় গোপন আস্তানায়। সেখানে মালিকপক্ষকে ডেকে দেনদরবার করা হয়। গুলিস্তানের গোলাপশাহ মোড়ে বিভিন্ন স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে টিআই জিয়াউল হক বলেন, আমি কোনো গাড়ি বা স্ট্যান্ড থেকে টাকা তুলি না। তবে কেউ তোলে কি না এটা আমার জানা নেই।

 

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ট্রাক-কাভার্ডভ্যান চালক বলেন, পথে পথে চাঁদা না দিলে সড়কে গাড়ির চাকাও ঘুরানো যায় না। ট্রাক মালিক সমিতির নামে প্রতিদিন গাড়ির শ্রেণিভেদে ২০০, ৫০০ ও ৭০০ করে জিপির টাকা দিতে হয়। এছাড়া ঢাকার দুই সিটি এলাকার অন্তত দেড়শতাধিক স্পটে কথিত ইজারাদাররা প্রতি গাড়ি থেকে শ্রেণিভেদে ৫০, ১০০ ও ২০০ টাকা করে তুলে নেন। চাঁনখারপুল মোড়ে প্রতিদিন রাতে শতাধিক পরিবহনে পণ্য লোড-আনলোডকালে কথিত সাংবাদিক মাসুদ রানা ও তার সহযোগীসহ পুলিশের কয়েকজন সোর্স মিলে বিভিন্ন কাগজপত্র তল্লাশির কথা বলে নিয়মিত চাঁদা তুলে নেয়। টাকা দিতে না চাইলে স্থানীয়ভাবে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে ট্রাফিক ও থানা পুলিশকে ডেকে এনে হয়রানি করে। এমনকি ঠুনকো অজুহাতে মামলাও ঠুকে দেয়। তাই ঝামেলা এড়াতে ২০০, ৫০০ ও ১ থেকে দেড় হাজার টাকা তুলে দেন তারা। তারা আরো জানান, কারওয়ানবাজারে পণ্যবাহী গাড়ি দেখলেই শ্রমিক সংগঠন, কুলি, সমিতি ও পুলিশের নামে চাঁদা তোলা হয়। যার পরিমাণ শত কোটি টাকা। এর ফলে এই চাঁদার টাকা পণ্যমূল্যের ওপর প্রভাব পড়ছে। সরকারের পক্ষ থেকে পণ্যবাহী পরিবহনে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া গাড়ি থামানো ও চাঁদাবাজি করা যাবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও বাস্তবে মাঠ প্রশাসনের কেউই তা মানছেন না। সড়কে চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধে বহুবার ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। আশ^াসে সড়কে নামলে কিছুদিন স্বাভাবিকভাবে গাড়ির চাকা ঘুরলেও সপ্তাহ না পেরুতেই সড়ক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মাঠপর্যায়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের আচরণে আবারো সেই পুরোনো চিত্র দেখা যায়। রংপুর থেকে পণ্য নিয়ে ঢাকার কারওয়ানবাজারে আসা ট্রাকচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, পণ্য নিয়ে এ পর্যন্ত পৌঁছাতে পথে পথে টোকেন চাঁদা দিতে হয়েছে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে শ্রমিক সংগঠন, সংশ্লিষ্ট এলাকার থানা, ফাঁড়ি ও ট্রাফিক পুলিশ বক্স রয়েছে।

 

 

 

এছাড়া রয়েছে পৌর এলাকার ইজারাদার ও স্থানীয় নেতা-কর্মী। ট্রাক-কাভার্ডভ্যান চালক ও মালিক সমিতির এক নেতা বলেন, বাবুবাজার ব্রিজের নিচে আপনি সরেজমিন এসে দেখবেন পুলিশের কেন অত্যাচার আর দৌরাত্ম্য। গাড়ির যাবতীয় কাগজপত্র, ফিটনেস সার্টিফিকেট ও ট্যাক্সটোকেন আপডেট থাকার পরও চাঁদা না দিলেই রেকারিং বিল করা হয় ২২০০ টাকা। রেকারিং বিল পরিশোধ করার পরও ৭ থেকে ৮০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়। গাবতলী থেকে বেড়িবাঁধ দিয়ে প্রতিটি স্পট মিলে মোট চাঁদা গুনতে হয় প্রায় দুই হাজার টাকা। ট্রাকচালক আমির হোসেন বলেন, নীলফামারীর সৈয়দপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত একটি ট্রাককে ১৪ স্থানে ৫ হাজার ৪০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। সঙ্গে রয়েছে ‘মান্থলি’ চাঁদা। আরেক ট্রাকের চালক তাজুল ইসলাম বলেন, সৈয়দপুরে ট্রাক চলাচলে বাইপাস সড়ক রাতভর থাকে জমজমাট। ট্রাকে মালপত্র তোলা হয় রাতে। সকালে সেগুলো যাত্রা করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে। ওই ট্রাকের চালক তাজুল ইসলাম বলেন, সহকারী মজনুকে স্টিয়ারিংয়ের বাম পাশে বসিয়ে দীর্ঘ ৩৫৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে গাড়ি বাইপাস সড়কে উঠাতেই সহকারী মজনু হাঁক দিলেন, ‘ওস্তাদ, খাড়াইছে’। দেখলাম চার-পাঁচজন পোশাকধারী পুলিশ দাঁড়িয়ে। ট্রাক থামালে এক পুলিশ সদস্য জানালার কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল। বলল, তাড়াতাড়ি মালপানি ছাড়। ২০০ টাকা দিয়ে ট্রাক নিয়ে সামনে এগোলেন তাজুল। তিনি বলেন, সড়কে চাঁদা না দিলে সহজেই গাড়ির চাকা ঘুরানো যায় না। খুব ছ্যাঁচড়া এরা। ১০০ টাকা হলেও নেবে। বাকি পথেও এভাবে ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হয়েছে- এমন প্রশ্নে এক গাল হেসে বললেন, ‘সবে তো শুরু। রাত-দিন পরিশ্রম করে বাড়ি তো দূরের কথা ভালো ফ্ল্যাটে থাকারও সাহস করি না। আর পুলিশের একজন কনস্টেবল একাধিক বাড়ির মালিক হয়। এসব না করলে তারা কীভাবে চলবে। মাঝেমধ্যে সড়কে পুলিশ গাড়ি থামালেও মান্থলি (জিপিআর) কার্ড দেখালে ছেড়ে দেয়।

 

এদিকে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, সম্প্রতি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকায় প্রবেশপথগুলোসহ বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে পণ্যবাহী ট্রাক থেকে চাঁদা আদায়ের দায়ে ৫১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ঢাকায় অন্তত ছয়টি স্থানে পণ্যবাহী ট্রাক থেকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। কারওয়ানবাজার, বাবুবাজার, গুলিস্তান, দৈনিক বাংলা মোড়, ইত্তেফাক মোড়, টিটিপাড়া, কাজলা, গাবতলী, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টারসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা, একটি লেজার লাইট, সিটি করপোরেশনসহ ছয় প্রতিষ্ঠানের জ্যাকেট, দুটি অন্যান্য লাইট, চারটি আইডি কার্ড, ৪১টি মোবাইল ফোন ও বিপুল পরিমাণ চাঁদা আদায়ের রসিদ উদ্ধার করা হয়েছে। এরা কখনো সিটি করপোরেশন, কখনো শ্রমিক সংগঠন, কখনো কল্যাণ সমিতি, কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে এই চাঁদা আদায় করা হয়।

 

 

তিনি বলেন, মধ্যরাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যখন পণ্যবাহী ট্রাক ঢাকায় প্রবেশ করে, তখন চাঁদা উত্তোলন শুরু হয়। একটি গ্রুপ চাঁদা উত্তোলন করে কথিত ইজারাদারদের কাছে জমা দেয়। তারা সিন্ডিকেটের মধ্যে টাকা ভাগবাটোয়ারা করে। চাঁদা উত্তোলনকারীরা প্রতি রাতে মজুরি হিসেবে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পায়। প্রতিটি স্পট থেকে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা চাঁদা আদায় করে তারা। কমান্ডার বলেন, চাঁদাবাজির সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ওপরের লেভেলের কয়েকজনের নাম পেয়েছি। আমরা তা যাচাই-বাছাই করছি। তারা যে সংস্থারই হোক, অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

 

 

এদিকে গত সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আসন্ন ঈদুল ফিতরের প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যানজট নিরসনে হাইওয়ে পুলিশ, র‌্যাব, জেলা পুলিশ সমন্বয় করে কাজ করবে। যানজট নিরসনে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ কর্তৃক চিহ্নিত স্পটে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে যানজট পরিস্থিতি মনিটর করবেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন সড়কে স্থায়ী ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। মহাসড়কে নির্দিষ্ট স্থানে যানজটপ্রবণ এলাকায় রেকার থাকবে। ড্রোন ব্যবহার করা হবে। সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।