রংপুর বিভাগের আট জেলায় প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজারেরও বেশি গরু ও ছাগল জবাই করা হচ্ছে—অধিকাংশক্ষেত্রেই তা হচ্ছে কসাইখানা ও পশু স্বাস্থ্য পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছাড়াই। প্রচলিত আইনে পশু জবাইয়ের আগে বাধ্যতামূলকভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার কথা বলা হলেও, বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নেই। এতে করে মানুষের খাদ্যচক্রে রোগাক্রান্ত পশুর মাংস ঢুকে পড়ছে এবং জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ একযোগে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
রংপুর বিভাগের ১ হাজার ৩০৩টি হাট-বাজারের কোথাও নেই আধুনিক কসাইখানা বা ভেটেরিনারি সার্জনের নিয়মিত উপস্থিতি। স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলা, জনবল সংকট ও ব্যবসায়ীদের অসচেতনতার কারণে পশু জবাইয়ে আইন লঙ্ঘন এখন সাধারণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেন ‘যা চলছে তাই নিয়ম’—এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে এক অনিয়ন্ত্রিত মাংস বাজার।
রংপুরের পীরগাছায় সম্প্রতি গরু থেকে মানুষে অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণের ঘটনা ঘটে। এতে দুইজনের মৃত্যু হয় এবং অনেকে হাসপাতালে ভর্তি হন। একজন আক্রান্ত হন অসুস্থ গরুর মাংস কাটার সময়, আরেকজন আক্রান্ত হন রান্না করার সময়। অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়ে পাশের গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জেও। তবু এসব এলাকায় মাংস ব্যবসায়ীদের কারও লাইসেন্স নেই, নেই স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৬৫টি পশু জবাই করা হয় ৩০–৩৫টি স্থানে। অথচ এখানে কোনো পশু জবাইয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয় না। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় মাংস ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৬০ জনের বেশি, কিন্তু কারও লাইসেন্স নেই। এমনকি অনেক ব্যবসায়ী জানেনই না যে, প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে আলাদা লাইসেন্স নিতে হয়।
তারাগঞ্জের এক ব্যবসায়ী জানান, “মাংস ব্যবসার জন্য প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে লাইসেন্স নিতে হয়—এটা আমরা আগে জানতাম না। এখন জানি, তাই নিবো। আমরা অসুস্থ পশু জবাই করি না, তাই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করি না।” তিনি আরও বলেন, “শেড দখলে, তাই বাইরে গরু জবাই করি।”
তারাগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এ কে এম ইফতে খারুল ইসলাম বলেন, “আমাদের উপজেলায় কোনো বৈধ মাংস ব্যবসায়ী নেই। তাঁরা কেউ প্রাণিসম্পদ লাইসেন্স নেয়নি। অনেকে তো ট্রেড লাইসেন্সও নেয়নি। আমরা সবাইকে ডেকে বলেছি—আবেদন করলে যাচাই-বাছাই করে লাইসেন্স দেব। এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে। তারপর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সুন্দরগঞ্জ পৌর বাজারের ইজারাদার ও মাংস ব্যবসায়ী মো. শুকুর আলী বলেন, “পৌর এলাকায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়মিত করা হয়। তবে এটি বামনডাঙ্গা, রামগঞ্জ, বেলকা—এসব জায়গাতেও হওয়া উচিত। বিশেষ করে রামগঞ্জ বাজারে বেশি অসুস্থ গরু জবাই হয়, যা পরে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হয়।”
এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. বিপ্লব কুমার দে বলেন, “পৌরসভা ও রামগঞ্জ বাজারে আমরা সম্পূর্ণ সহায়তা দিচ্ছি। স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়া কোনো পশু জবাই করতে দিচ্ছি না। বাকি জায়গাগুলোতে চিঠি পাঠানো হয়েছে।”
রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ পরিচালক ডা. মো. আব্দুর হাই সরকার বলেন, “মাংস ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নেওয়ার জন্য আমরা মাঠে উদ্বুদ্ধ করছি। আমরা নিয়মিত পশু স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে চাই, কিন্তু জনবল সংকটের কারণে তা সম্ভব হয় না। প্রতিটি হাটে চিকিৎসক পাঠানো বাস্তবসম্ভব নয়। তারপরও আমরা স্বেচ্ছাসেবীদের যুক্ত করে কাজ চালানোর চেষ্টা করছি।”
অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্তদের বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা জানান, “আইইডিসিআর নমুনা সংগ্রহ করেছিল, রিপোর্ট দিয়েছে, কিন্তু আমি এখনো দেখিনি। রিপোর্ট দেখে বলতে পারব।”
এ অবস্থার দ্রুত উন্নয়ন না হলে রংপুর বিভাগের মাংস খাত শুধু নয়, পুরো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্পাদনা: এমআর/সবা










