* পাইলট প্রকল্পে এ সুবিধা শুরু মুন্সিগঞ্জ কারাগারে * নির্দিষ্ট নিয়মে ১০ মিনিট করে সুযোগ হবে সপ্তাহে একবার * শিগগিরই এ সুবিধা সম্প্রসারণ হবে সারাদেশে * মাদক প্রতিরোধে বসছে ড্রাগ পরীক্ষার মেশিন * আজীবন রেশন পাবেন অবসরপ্রাপ্ত কারারক্ষীরা

কারাগারে চালু হচ্ছে ভিডিও কলে বন্দিদের কথা বলার সুযোগ

এসএম দেলোয়ার হোসেন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

“কারাগার সম্পর্কে মানুষের প্রচলিত ধারণায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কারাগার হবে নিরাপদ ও মানবিক। সারাদেশে শিগগিরই কারাবন্দিরা স্বজনদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে গোপনীয়তা বজায় রাখা হবে”
— মো. মাসুদ হাসান জুয়েল, জেলার (লজিস্টিক অ্যান্ড মিডিয়া), কারা অধিদপ্তর, ঢাকা

 

কারা অধিদপ্তরের একটি স্লোগান রয়েছে- ‘বন্দিদের রাখিব নিরাপদ, দেখাবো আলোর পথ’। কারা কর্তৃপক্ষের এমন বাণীতেও বন্দিদের জীবনে এখনও আলো জ্বলেনি, মুখে ফোটেনি হাসি। বরং কারা অভ্যন্তরে বন্দিরা নানাভাবে অত্যাচার ও জুলুম-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলে স্বজনদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সেই কারাগারের চার দেয়ালের অন্ধকারের বন্দিজীবনে স্বজনদের সরাসরি দেখার আকুলতা দীর্ঘদিনের। বন্দিদের এ সমস্যা দূর করতে চালু হচ্ছে ভিডিও কলের বিশেষ সুবিধা। ইতোমধ্যে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে পাইলট প্রকল্প হিসেবে এ সুবিধা চালু হয়েছে। শিগগিরই সারা দেশে এ সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে। কারাগারের ভেতর মাদক প্রবেশ ও তা প্রতিরোধে বসানো হচ্ছে ড্রাগ পরীক্ষার অত্যাধুনিক মেশিন। কারাবন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ও সেবার মান বাড়াতেও নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। এ ছাড়া কারারক্সীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে কল্যালমূলক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত কারারক্ষীদের জন্য আজীবন রেশন প্রদানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, বন্দিদের জীবনমান, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মাদক প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। কারাগার হবে নিরাপদ ও মানবিক। এমন লক্ষ্য নিয়েই নানা উদ্যোগ নিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। কারা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশের কারাগার বা জেলখানায় বন্দীদের পরিচালনা, শৃঙ্খলা এবং সুযোগ-সুবিধা কারা অধিদপ্তর নির্ধারিত জেল কোড এবং আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। কারাগারে থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসা সম্পূর্ণ ফ্রি; এর জন্য কোনো টাকা নেওয়া হয় না। বন্দিদের ব্যবহারের জন্য থালা, বাটি ও কম্বল দেওয়া হয়, যা মুক্তির সময় ফেরত দিতে হয়। সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের নির্দিষ্ট পোশাক পরতে হয়, তবে বিচারাধীন বা হাজতি বন্দিরা নিজেদের পোশাক পরতে পারেন। কারাগারের নিয়ম-শৃঙ্খলা কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়। নিয়ম ভঙ্গ করলে বিধি অনুযায়ী শাস্তির বিধান রয়েছে।
খাদ্য ও পুষ্টিসরকার কর্তৃক নির্ধারিত দিনে তিন বেলা খাবার সরবরাহ করা হয়। সকালের নাস্তায় সাধারণত গুড় ও রুটি দেওয়া হয়। দুপুর ও রাতের খাবারে ভাতের সঙ্গে মাছ বা মাংস, ডাল ও সবজি থাকে। বিশেষ দিনে উন্নতমানের খাবারের বরাদ্দ থাকে। এছাড়া অসুস্থ বন্দীদের জন্য কারা হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে এবং প্রয়োজনে বাইরে পাঠানো হয়। কারাগারের নির্দিষ্ট নিয়ম ও তত্ত্বাবধানে বন্দীরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বা দেখা করার সুযোগ পান। কারাগারে প্রবেশের পর মাসে ১৫ দিনে একবার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন। এর মধ্যে কারাগারে বন্দিদের সঙ্গে দেখা বা সাক্ষাৎ করার জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সাক্ষাতের সময় দর্শনার্থীকে অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা বৈধ পরিচিতি প্রমাণপত্র সাথে রাখতে হবে। কারাগারভেদে বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য নির্দিষ্ট দিন ও সময় নির্ধারিত থাকে। বন্দিরা তাদের আত্মীয়দের পাশাপাশি আইনজীবীদের সঙ্গেও নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত সাক্ষাতের সুযোগ পান। তবে সাক্ষাতের আগে অবশ্যই আবেদন ফরম পূরণ করে টোকেন সংগ্রহ করে অপেক্ষা করতে হবে। এরপর সেই টোকেনে ডাক পড়লে বন্দির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান স্বজনেরা। এদিকে কারাগারের ভেতর প্রবেশকালে বন্দিদের সব ধরনের নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হয় এবং নিষিদ্ধ বস্তু বহন করা দণ্ডনীয়। বন্দীদের ধর্মীয় অনুশাসন পালনের ব্যবস্থা এবং ধর্মীয় শিক্ষার জন্য শিক্ষক বা ইমাম নিয়োগের নিয়ম রয়েছে।

কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সারাদেশে কারাগারগুলোতে বর্তমানে মোট বন্দির সংখ্যা প্রায় ৯৮ হাজার এবং মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৫ হাজার। কারা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারাগারগুলো বর্তমানে তাদের মূল ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দির বোঝা বহন করছে। দীর্ঘ যুগ ধরে কারাগারে বন্দি থাকা আসামিরা নির্দিষ্ট বন্দি সেলের গ্রীলের ফাঁকা দিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতো ও সাক্ষাত করতো। মাঝেমধ্যে অবৈধ উপায়ে কারারক্ষ দের ম্যানেজ করে কারাগারে বসেই মুঠোফোনে প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা বলতেন বন্দিরা। বন্দিদের এমন চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষের এই আধুনিক ও মানবিক উদ্যোগের ফলে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কয়েদি ও হাজতিরা সপ্তাহে একবার ১০ মিনিট ভিডিও কলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছেন কারা কর্তৃপক্ষ। তারা বলছেন, কারাগারে বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসনে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন কারাগারে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় শিক্ষা, কাউন্সেলিং ও অন্যান্য মানসিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।

কারা অধিদপ্তর জানায়, বন্দি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার ২-এ মিনারেল ড্রিংকিং ওয়াটার প্লান্ট স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং পানি সরবরাহ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কারাগারের মৌলিক সেবাগুলোর মান উন্নয়নের বিষয়টি ভবিষ্যতেও অগ্রাধিকার পাবে। এছাড়া একটি আধুনিক কারা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রশিক্ষিত জনবল অপরিহার্য। কারা অধিদপ্তর আরও জানায়, কারা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এই লক্ষ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের কারারক্ষী, প্রধান কারারক্ষী, সার্জেন্ট ইন্সট্রাক্টর, ডেপুটি জেলার, জেলার ও জেল সুপারদের পেশাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও কারাগারের নিরাপত্তা রক্ষা, বন্দি পালানো প্রতিরোধ, অনিয়ম প্রতিরোধ, দুর্যোগ মোকাবিলা, মানবিক সেবা এবং দায়িত্ব পালনে অসাধারণ অবদান রাখা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজ যথাযথভাবে মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যোগ্য সদস্যদের পদক, প্রশংসাপত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদানের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, কারাগারে মাদক প্রবেশ ও মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। কারা সদর দপ্তরে ড্রাগ পরীক্ষার মেশিন সংগ্রহ করা হয়েছে, যা মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করবে। কারাগারকে আরও স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব করার লক্ষ্যে ব্যাপক সবুজায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সিলেট-১, কিশোরগঞ্জ-১ ও খুলনা নতুন কারাগারে প্রায় ১৮ হাজার গাছ রোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি, আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা, বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণ, ভালো কাজের যথাযথ স্বীকৃতি, পরিবেশবান্ধব কারা ব্যবস্থাপনা এবং একটি আধুনিক ও পেশাদার সংশোধনমূলক পরিষেবা সৃষ্টির কাজ করা হচ্ছে। 

এসব বিষয়ে কারা অধিদপ্তর জানায়, কারাগার সম্পর্কে মানুষের প্রচলিত ধারণায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কারাগার হবে নিরাপদ ও মানবিক। কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হবেন দক্ষ, সৎ ও মর্যাদাবান। বন্দিরা পাবেন সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগ। আর পুরো প্রতিষ্ঠানটি হবে স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফারুক আহমেদ বলেন, ঢাকা জেলে রুটি তৈরির কার্যক্রমকে আধুনিক ও সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্যে চায়না থেকে আমদানি রুটি মেকার স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে বৃহৎ সংখ্যক বন্দির জন্য কম সময়ে একই মানের রুটি স্বাস্থ্যসম্মত ও দক্ষতার সঙ্গে প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা কমছে। তিনি বলেন, কারাগারে বিশেষ দিবসে খাবার পরিবেশনের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা আছে। বন্দিদের খাবারের মান উন্নত করার জন্য বিভিন্ন কারাগারে খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবেশন ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বন্দিদের বিভিন্ন পোশাক ও জুতা-সেন্ডেল তৈরি ও বেকারির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বন্দিদের খেলাধুলার পাশাপাশি ধর্মীয় প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। কারাগারে বিভিন্ন দিবস উপলক্ষ্যে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে।
 
এদিকে ঢাকা কারা অধিদপ্তরের জেলার (লজিস্টিক অ্যান্ড মিডিয়া) মো. মাসুদ হাসান জুয়েল বলেন, সারা দেশে শিগগিরই কারাবন্দিরা স্বজনদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে গোপনীয়তা বজায় রাখা হবে। তিনি বলেন, কারাগারে বন্দিদের উৎপাদনশীল কাজে প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য দক্ষ করে তোলার কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার ২-এ সাবান উৎপাদন কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং উৎপাদিত সাবান বন্দি ও স্টাফদের জন্য সরবরাহ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে বন্দিদের প্রশিক্ষণ ও উৎপাদনমুখী কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

জেলার মাসুদ হাসান জুয়েল বলেন, বন্দিদের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারা সদর দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য প্যাথলজি ল্যাব চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্সের সুপারিশ পাওয়া গেছে এবং তাদের পদায়নের মাধ্যমে কারাগারের স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে।

কারা অধিদপ্তর জানায়, কারা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের একটি যৌক্তিক প্রত্যাশা ছিল অবসর-পরবর্তী কল্যাণ। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত কারারক্ষীদের আজীবন রেশন প্রদানের বিষয়টি সরকার নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে এবং তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL