* সারাদেশে কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা ৩২ হাজার ৬৬৩টি * কিন্ডারগার্টেন তদারকিতে আসছে কঠোর নীতিমালা * মনিটরিংয়ে বাদ পড়বে অসাধু শিক্ষা ব্যবসায়ীরা * নির্ধারণ হবে ন্যূনতম শিক্ষার মানদণ্ড

কিন্ডারগার্টেনের লাগাম টানতে কঠোর হচ্ছে সরকার!

এসএম দেলোয়ার হোসেন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

“শুধু কিন্ডারগার্টেন নয়, প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকে পর্যায়ক্রমে সরকারের মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হবে। তাদের সবাইকে সুনার অর লেটার আমরা আমাদের মনিটরিংয়ের অধীনে নিয়ে আসবো”
— ববি হাজ্জাজ, প্রতিমন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে অনুনমোদিত কিন্ডারগার্টেন স্কুল। এসব স্কুলের অধিকাংশের নেই শিক্ষার মান। রাজধানীর অলিগলি আলো-বাতাসহীন সংকীর্ণ ও ঘিঞ্চি আবাসিক ভবনেই গড়ে উঠছে কিন্ডারগার্টেন স্কুল। ঢাকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এর পরিধি ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। অনভিজ্ঞ শিক্ষক-শিক্ষিকা দ্বারা পরিচালিত স্কুলগুলোতে যথাযথ শিক্ষার মান না থাকায় মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। অভিযোগ উঠেছে, শিক্ষার আড়ালে অনুমোদনহীন এসব প্রতিষ্ঠান খুলে মাসের পর মাস অভিভাকদের কাছ থেকে গলাকাটা বাণিজ্য চালিয়ে আসছে একশ্রেণির অসাধু শিক্ষা ব্যবসায়ীরা। সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই অবাধে গজে উঠছে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা রয়েছে ৩২ হাজার ৬৬৩টি। এর বড় একটি অংশ কেবল রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে। এদিকে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, শুধু কিন্ডারগার্টেন নয়, প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকে পর্যায়ক্রমে সরকারের মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হবে। তাদের সবাইকে সুনার অর লেটার আমরা আমাদের মনিটরিংয়ের অধীনে নিয়ে আসবো। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) কিন্ডারগার্টেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, অভিভাবক এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
   
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সময়ের পটপরিবর্তনে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে অনুনমোদিত বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন স্কুল। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসছে, তখন সেই সরকারের লেবাস ধরে চালু করা হচ্ছে কিন্ডারগার্টেন স্কুল। শ্রেণিভেদে প্রতিষ্ঠানগুলো বেশিরভাগই চালু করা হচ্ছে আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে। রাজধানী ঢাকার অলিগলি ছাপিয়ে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনের কার্যক্রম দেদারসে সম্প্রসারিত হচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। অপর্যাপ্ত ফ্ল্যাট বা কক্ষ ভাড়ায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের টানতে নানা কৌশল গ্রহণ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রথমত, ভবনগুলোর মূল প্রবেশপথের দেওয়াল বা গেটে নানা তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে শিক্ষার কার্যক্রম এলোমেলো ‘বর্ণমালা’ ও কার্টুন। দ্বিতীয়ত, প্রতিজুম্মায় মসজিদ বা জনবহুল এলাকায় ভর্তির বিজ্ঞপ্তি সংক্রান্ত লিফলেট বিতরণ করা। তৃতীয়ত, এলাকাভেদে মাইকিং করে শিশুদের ভর্তির বিষয়ে আকৃষ্ট করা। চতুর্থত, প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের লোভনীয় অফার দিয়ে তাদের কোমলমতি শিশুদের নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য উদ্বুদ্ধ বা অন্তর্ভুক্ত করা এবং পঞ্চমত, প্রতিবছরের ডিসেম্বরে ভর্তির ক্ষেত্র তৈরির কৌশল হিসেবে আগ্রহী শিশুদের ফ্রিতে ক্লাস নেওয়া। সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে কিন্ডারগার্টেনের অবাধ বিচরণ ঠেকাতে নীতিমালা তৈরি করা হলেও রাজনৈতিক গ্রুপিং-লবিংয়ের কারণে শেষপর্যন্ত তা আর আলোর মুখ দেখেনি।

অভিভাবকরা জানান, একবার কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ভর্তি হলে প্রতিমাসেই অভিভাবকদের কাছ থেকে মানসম্মত কিন্ডারগার্টেনগুলো শ্রেণিভেদে মাসিক বেতন ৪০০ থেকে ৮০০ বা ১০০০ টাকা আদায়ের পাশাপাশি নানা ধরনের সার্ভিস চার্জও আদায় করে নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এছাড়া, বার্ষিক ভ্রমণ, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামেও গলাকাটা চার্জ আদায় করা হয়। অন্যদিকে, স্কুল ড্রেস থেকে শুরু করে বই-খাতা, রাবার, কলম-পেন্সিলসহ শিক্ষার অন্যান্য উপকরণও ওই কিন্ডারগার্টেন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নির্ধারিত দোকান বা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে থাকা লাইব্রেরি থেকে কিনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন অভিভাবকরা।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেন কোনো রকম বৈধ নিবন্ধন বা অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। সারাদেশে সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা ৩২ হাজার ৬৬৩টি। তবে এর একটি বড় অংশই রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত। 

বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন ও বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেন মালিক সমিতির তথ্য বলছে, দেশজুড়ে এই সংখ্যা ৬০ থেকে ৭০ হাজার, যার একটি বিশাল অংশ ঢাকা মহানগরীর অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরেই রয়েছে প্রায় ২০০টি কিন্ডারগার্টেন। সরকারিভাবে সারাদেশে মাত্র অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হলেও বাস্তবে রাজধানী ঢাকার কামরাঙ্গীর চর, লালবাগ, হাজারীবাগ, সূত্রাপুর, বংশাল, শ্যামপুর, গেন্ডারিয়া, সবুজবাগ, খিলগাঁও, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ীর মতো এলাকাগুলোর প্রতি বর্গকিলোমিটারেই ডজনখানেক বা তার বেশি কিন্ডারগার্টেন সচল রয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি শিশু এসব বেসরকারি স্কুল ও কিন্ডারগার্টেনে পড়াশোনা করছে। সরকার বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি বাড়াতে সব অনিবন্ধিত কিন্ডারগার্টেনকে 'বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বিধিমালা' অনুযায়ী নিবন্ধনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলমান রেখেছে। রাজধানী ঢাকায় বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনের কোনো সঠিক বা সুনির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান নেই, তবে ধারণা করা হয় এই সংখ্যা কয়েক হাজার হবে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিধিমালা অনুযায়ী- দেশে কিন্ডারগার্টেন, নার্সারি, কেজি ও প্রিপারেটরি স্কুল নামে যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তা আর থাকবে না। সরকারি প্রাথমিক বাদে বাকি সব স্কুল হবে ‘বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। অনিবন্ধিত এসব স্কুলকে বিধিমালার গেজেট জারির তিনমাসের মধ্যে নিবন্ধন নিতে আবেদন করতে হবে। জারি হতে যাওয়া এ বিধিমালায় স্কুলে প্রাথমিক অনুমোদন, নিবন্ধন, নবায়ন, শিক্ষক নিয়োগ, ভবনের জমির আয়তন, তহবিল গঠন ও পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠান চালানো মালিকপক্ষ কোনো অজুহাত দেখাতে পারবেন না বলে মনে করছেন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কিন্তু রাজনৈতিক গ্রুপিং-লবিং ও নানা জটিলতায় তা আর বাস্তবায়ন করতে পারেনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। 

এদিকে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, দেশের কিন্ডারগার্টেনসহ প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী সব ধরনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সরকারের তদারকির আওতায় আনতে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এ নীতিমালায় এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি স্কুলগুলোকে নীতিমালার আওতায় আনার বিষয়ে এরই মধ্যে অ্যাডভাইজরি কমিটি করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদেরও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই নতুন নীতিমালা তৈরি করা হবে।  তিনি বলেন, অনেক স্কুল হয়েছে। কিন্তু অনেক স্কুল কমে যাক, এটাও আমরা চাই না। আমরা চাই সবার কাছে যেন অ্যাকসেস টু এডুকেশন থাকে। এটা আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু কেউ যেন আবার এডুকেশনের নামে অসৎ ব্যবসা করতে না পারে। কিন্ডারগার্টেন ও অন্যান্য বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নিশ্চিত করতে নীতিমালায় ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সেই সার্ভিসটা ঠিকভাবে দিতে হবে। সো সেটা আমাদের মনিটরিংয়ের অধীনে এখন আনা হবে। ঐ মনিটরিংয়ের অধীনে আনার জন্য নীতিমালাগুলো কত স্ট্রিক্ট হবে, আমরা মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ডগুলো সেট করতে চাই। 

নীতিমালা বেশি কঠোর হলে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে উলে¬খ করে ববি হাজ্জাজ বলেন, এতে অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। সরকার এমন পরিস্থিতি চায় না। তাই কীভাবে ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করা যায়, তা নিয়ে সংশি¬ষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। বেসরকারি স্কুলগুলোকে নীতিমালার আওতায় আনার সময়সীমা হিসেবে আপাতত ২০২৮ সাল নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তিনি বলেন, আমরা তাদের ওপরে একটা সর্ট অব সময় নির্ধারণ করে দিচ্ছি। আপাতত এখনো সবকিছু যেহেতু ফাইনাল হয়নি, আমরা আলোচনায় আছি যে ২০২৮।

প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, শুধু কিন্ডারগার্টেন নয়, প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকে পর্যায়ক্রমে সরকারের মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, প্রাইমারি এডুকেশন যত ধরনের ইনস্টিটিউশন দিচ্ছে, তাদের সবাইকে সুনার অর লেটার আমরা আমাদের মনিটরিংয়ের অধীনে নিয়ে আসবো।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL