জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৬২, আগস্টে বেড়ে ৪.৭৫ শতাংশ

গতি ফিরছে বেসরকারি ঋণ প্রবাহে

নিজস্ব প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

“অর্থনীতিকে সক্রিয় ও বন্ধ কারখানা চালু করতে সরকার যে প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এতে ব্যাংকের সুদহার কমে গেছে এবং ব্যাংকগুলোতেও তারল্যের সমস্যা নেই। ফলে সামনে ঋণ বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া যাবে”
— আরিফ হোসেন খান, নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র, বাংলাদেশ ব্যাংক

 

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি আরও বেড়েছে। এ মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। এর আগের মাস জুলাইয়ে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। ফলে এক মাসের ব্যবধানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশীয় পয়েন্ট।
দেশে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী ছিল। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে এই প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে আসে, যা এ যাবতকালের সর্বনিম্ন। তবে জুলাই ও আগস্ট পরপর দুই মাসে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রত্যাশা করেছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশে পৌঁছাবে। কিন্তু সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। বরং জুনে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে আসে, যা প্রত্যাশিত হারের চেয়ে ১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কম।

এর আগে মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ২০২৩ সাল থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে দুর্বল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ঋণ প্রবাহের এই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক গত জুনে পরবর্তী ছয় মাসের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে নির্ধারণ করে। বর্তমান মুদ্রানীতিতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কোভিড মহামারীর পর অর্থনীতি পুনর্গঠনের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে দু’বছর বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানিপণ্যের দাম বেড়ে যায়। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে টাকার মান কমে যায় এবং দু’বছরের ব্যবধানে ডলারের দর ১২১ টাকা পর্যন্ত ওঠে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে আমদানি বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিস্থিতি সামাল দিতে আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। এর প্রভাব পড়ে বেসরকারি খাতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও। 

২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েক মাসের মধ্যে নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করে। এর ফলে কয়েক মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করলেও একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের গতিও কমে যায়। এরপর ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অর্থনীতি সচল করার উদ্যোগ নেয়া হয়। মে মাসে অর্থনীতিকে সক্রিয় করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই প্যাকেজের আওতায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে থাকা অতিরিক্ত তারল্য থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের কথা বলা হয়। 

তবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে অর্থনীতিতে নতুন করে ধাক্কা আসে। ২১ জুলাই দেশে আমদানি করা এলএনজি বা রূপান্তরিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকারী দুটি ভাসমান টার্মিনালের একটি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং রাজধানীতেও লোডশেডিং করতে হয়। এতে শিল্প উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিভিন্ন কারখানার উৎপাদন কমে যায়। এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্যেও জুলাইয়ে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি আগের মাসের তুলনায় কিছুটা বেড়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে ওঠে। পরের মাস আগস্টেও সেই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকে। এ মাসে প্রবৃদ্ধি আরও শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে কমতে থাকা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহে টানা দুই মাস কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চিত্র দেখা গেল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, সুদহার কমে আসা, ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতি এবং ৬০ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্যাকেজ বাস্তবায়নের প্রভাবে আগামী মাসগুলোতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি আরও বাড়তে পারে।

ঋণ প্রবাহের সর্বশেষ তথ্য জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ ছাড় বাড়তে শুরু করেছে। জুলাইয়ের পর আগস্টেও ঋণ প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে। জুলাইয়ে যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ, আগস্টে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হয়েছে। আগামী মাসগুলোতেও এই বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। অর্থনীতিকে সক্রিয় করা এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা চালু করতে সরকার যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল, সেটির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এর ফলে পরবর্তী মাসগুলোতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ আরও বাড়তে পারে বলে প্রত্যাশা করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, সুদহার কমে গেছে এবং ব্যাংকগুলোতেও তারল্যের সমস্যা নেই। ফলে সামনের মাসগুলোতে ঋণ বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা করছেন।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL