জৌলুস হারাচ্ছে বিলাসবহুল লঞ্চ

এসএম দেলোয়ার হোসেন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

বিশ্বে নদীমাতৃক দেশ হিসেবে ব্যাপক পরিচিত বাংলাদেশ। অথচ সময়ের ব্যবধানে নদী হারাচ্ছে তার নাব্যতা, হারাচ্ছে জৌলুস। এক সময় নদী পথ ছাড়া এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে বিকল্প কিছুই ছিল না। কিন্তু ভূমি খেকোদের আগ্রাসী থাবায় সংকুচিত হয়ে আসছে নদী। বর্তমানে উত্তাল নদী এখন তার যৌবন হারানোর পথে। সড়কে সড়কে ছেয়ে গেছে দেশের এপার-ওপার। বিশেষ করেজৌলুস হারিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের ২২ জেলার বিলাসবহুল লঞ্চগুলো ভুগছে চরম যাত্রী সংকটে। গেল ৪ বছরে বন্ধ হয়েছে ১৪টি রুট। স্ক্র্যাপ করে কেজি দরে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩২টি লঞ্চ। কাজ হারিয়েছে শতশত নৌশ্রমিক। মালিকদের অভিযোগ, যাত্রী সংকট আর তেলের দর বৃদ্ধিতে লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কপথের পাশাপাশি নৌপথকেও সচল রাখতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে নদী বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, নৌ পথকে কিভাবে আরও সচল করা যায়। আর পর্যটনকেন্দ্রীক করা যায় তার জন্য পরিকল্পনা করা হচ্ছে। 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে মোট নদীর সংখ্যা ১,০০৮টি। তবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান নদীপ্রধান এলাকা হিসেবে পরিচিত বরিশাল বিভাগে প্রাতিষ্ঠানিক খসড়া তালিকা অনুযায়ী নদীর সংখ্যা ৯৯টি এবং খুলনা বিভাগে নদীর সংখ্যা ১২৪টি। দক্ষিণাঞ্চলের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রধান নদীর মধ্যে রয়েছে- কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ, পায়রা, বিষখালী, সন্ধ্যা, বলেশ্বর ও তেঁতুলিয়া। তবে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও সময়ে সময়ে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী নদীর সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের (এপ্রিল ২০২৫) প্রকাশিত খসড়া তালিকা অনুযায়ী দেশে মোট নদীর সংখ্যা ১,২৯৪টি। আবার নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে (জুন ২০২৬) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে মোট নদীর সংখ্যা ১,৪১৫টি।
ঢাকার সদরঘাটের এপার-ওপার সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, এক সময়ের উত্তাল বুড়িগঙ্গা নদীর বুকে সারিবেধে নোঙর করা দক্ষিণাঞ্চল দাপিয়ে বেড়ানো যাত্রীবাহী বিলাসবহুল লঞ্চ। লঞ্চের গায়ে আছড়ে পড়ছে ঢেউ। কিন্তু এখন আর নেই বাড়ি ফেরার তাড়া। চিমনি থেকে বের হয়না ধোঁয়া, বাজে না লঞ্চের সাইরেনও। সড়কপথ যখন ব্যস্ত, নৌপথ তখন অলস। পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরুর আগে বরিশাল-ঢাকা নৌ রুটে যেখানে গড়ে ১০-১৪টি লঞ্চ প্রতিদিন দুই প্রান্ত থেকে চলাচল করতো, সেখানে বর্তমানে চারটি লঞ্চ চলাচল করছে। এই বিশাল আয়ের লোকসান বন্ধে লঞ্চ মালিকরা কোটি টাকার স্বপ্নগুলোকে বিক্রি করে দিচ্ছেন কেজি দরে।
রাজধানীর হাসনাবাদ এলাকায় কেটে ফেলা হচ্ছে এক সময়ে নৌপথ দাপিয়ে বেড়ানো সুরুভী-৭ লঞ্চটি। হাতুড়ির আঘাতে এভাবেই সড়ক পথের গতির নিচে চাপা পড়েছে শত বছরের নৌ-ঐতিহ্য। 
লঞ্চ মালিকরা বলছেন, আগে যেখানে একটি ট্রিপে লাখ টাকা লাভ হতো, এখন তেলের খরচ আর স্টাফদের বেতন দেয়াই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। 
সুন্দরবন নেভিগেশনের পরিচালক আখতার হোসেন বলেন, বর্তমানে আমাদের চারটি লঞ্চ চলাচল করে। আর বাকিগুলো বন্ধ রয়েছে। সবাইকে বেতন দিতে গিয়ে অনেক ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে।
এম খান-৭ এর সুপারভাইজার মো. শুভ বলেন, দিন দিন ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। সরকার যদি এ সেক্টরের দিকে নজর দেয় তাহলে এই সেক্টরটি টিকে থাকবে। কেননা দক্ষিণ অঞ্চলের ঐতিহ্য হলো এই লঞ্চ।
লঞ্চ মালিক সমিতি বলছে, পদ্মা সেতুর প্রভাব, তেলের দাম বৃদ্ধিতে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে গুলিস্তান থেকে সদরঘাটের যানজট সমস্যার কারণে যাত্রীরা নৌপথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এ বিষয়ে বি আই ডব্লিউ টি এর উদাসীনতাকে দায়ী করছে লঞ্চ মালিক সমিতি।

★ ৪ বছরে বন্ধ ১৪ নৌ-রুট
★ স্ক্র্যাপ করে কেজি দরে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩২টি লঞ্চ
★ কর্মহীন শতাধিক নৌ-শ্রমিক

“বিশ্বের অনেক দেশেই এতো বেশি নদী পথ নেই। যা আমাদের দেশে আছে। সড়ক পথের পাশাপাশি নিরাপদ চলাচলে নৌ পথকেও সচল রাখতে সরকারকে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে”
- অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, বুয়েট 
 

“এই নৌ পথকে কিভাবে আরও সচল করা যায়। আর পর্যটনকেন্দ্রীক করা যায় তার জন্য পরিকল্পনা করা হচ্ছে”
- মোস্তাফিজুর রহমান, যুগ্ম পরিচালক, নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগ, ঢাকা নদী বন্দর

 

অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থার মহাসচিব সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, পদ্মা সেতুর প্রভাব আর গুলিস্তান থেকে সদরঘাটের যানজট। এছাড়াও তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে।
বিআইডব্লিউটি এর তথ্য অনুযায়ী, ৪ বছর আগে ঢাকা সদর ঘাট থেকে ঢাকা-বরিশাল সহ ৪৭ রুটে ১৬২ টি লঞ্চ চলাচল করতো। এখন চলছে ৫০ থেকে ৬০ টি মাত্র। আর রুট বন্ধ হয়ে গেছে ১৪ টি। তবে ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার নদী পথকে সচল রাখতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বি আর ডব্লিউ টি এ। এর মাধ্যমে নৌপথ আবার সচল হবে নলে মনে করছেন তারা। 
লঞ্চ মালিক সমিতি বলছে, পদ্মা সেতুর প্রভাব, তেলের দাম বৃদ্ধিতে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে গুলিস্তান থেকে সদরঘাটের যানজট সমস্যার কারণে যাত্রীরা নৌপথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এ বিষয়ে বি আই ডব্লিউ টি এর উদাসীনতাকে দায়ী করছে লঞ্চ মালিক সমিতি।
পদ্মা সেতু চালুর পরে প্রতিদিন কোটি টাকার ওপর টোল আদায় হচ্ছে এবং সড়ক পরিবহনের আয় বেড়েছে কয়েক গুণ। সেখানে নৌপরিবহনের আয় কমেছে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ।
অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থার মহাসচিব সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, পদ্মা সেতুর প্রভাব আর গুলিস্তান থেকে সদরঘাটের যানজট। এছাড়াও তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে।
বুয়েটের যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো হাদিউজ্জামানের মতে, সড়ক পথের পাশাপাশি নিরাপদ চলাচলে নৌ পথকেও সচল রাখতে সরকারকে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে। তার মতে, বিশ্বের অনেক দেশেই এতো বেশি নদী পথ নেই। তাই আমরা যদি এই পথ ব্যবহার করতে পারি তাহলে অনেক আংশেই কমে যাবে রাস্তার যানজট।
ঢাকা নদী বন্দরের নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই নৌ পথকে কিভাবে আরও সচল করা যায়। আর পর্যটনকেন্দ্রীক করা যায় তার জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL