বাংলাদেশের আবাসন খাত : আস্থার সংকট,  বিনিয়োগের স্থবিরতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর পথ

এন. আই. মাকসুদ
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

নিজের একটি বাড়ি—বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারেরই স্বপ্ন। কেউ সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে একটি ছোট ফ্ল্যাট কেনেন, কেউ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে এক টুকরো জমি কেনেন। আবার কেউ অবসরজীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আবাসন খাতে বিনিয়োগ করেন।
কিন্তু আজ একজন সাধারণ মানুষ যখন একটি ফ্ল্যাট বা প্লট কিনতে যান, তখন আনন্দের পাশাপাশি তাঁর মনে একটি ভয়ও কাজ করে—“আমার টাকাটা নিরাপদ তো?”
আমি মনে করি, বাংলাদেশের আবাসন খাতের বর্তমান সংকট বুঝতে হলে এই একটি প্রশ্নের গভীরে যাওয়া প্রয়োজন।

সংকটটি একদিনে তৈরি হয়নি
আমরা অনেক সময় বর্তমান পরিস্থিতির জন্য একটি নির্দিষ্ট ঘটনা বা একটি পক্ষকে দায়ী করি। কিন্তু বাস্তবতা এতটা সরল নয়।
২০২০ সালে করোনাভাইরাস আমাদের জীবন ও অর্থনীতিকে প্রায় থামিয়ে দিয়েছিল। আবাসন খাতও এর বাইরে ছিল না। নির্মাণকাজ থেমেছে, প্রকল্প পিছিয়েছে, মানুষের আয় কমেছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
করোনা কাটতে না কাটতেই এলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি—সবকিছুর প্রভাব পড়ল আবাসন খাতে।
একজন ডেভেলপারের যে প্রকল্পের ব্যয় পাঁচ বছর আগে একরকম ছিল, কয়েক বছর পর সেই হিসাব আর থাকেনি।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি।
ফলে ডেভেলপারের খরচ বেড়েছে, ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

আনন্দ হাউজিং প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিশেষ অফার

তারপর এলো রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ২০২৪ সালের বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর স্বাভাবিকভাবেই মানুষ কিছুটা অপেক্ষার নীতি গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে জমি বা ফ্ল্যাটের মতো বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মানুষ এখন অনেক বেশি সতর্ক।
আমাদের দেশের একজন মধ্যবিত্ত মানুষ একটি ফ্ল্যাট কেনার আগে হয়তো বিশ বছর সঞ্চয় করেন। তাই তিনি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কিংবা নিজের চাকরি ও ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত থাকলে সহজে সেই টাকা বিনিয়োগ করবেন না।
তিনি বলবেন—
“আরও কিছুদিন দেখি।”
এই “আরও কিছুদিন দেখি” কথাটিই যখন হাজার হাজার সম্ভাব্য ক্রেতা একসঙ্গে বলতে শুরু করেন, তখন বাজারে মন্দা তৈরি হয়।
সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু আস্থা ফিরতে সময় লাগে
দেশে নতুন সরকার এসেছে। নতুন প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে।
আমরা অবশ্যই চাই নতুন সরকার অর্থনীতি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং আবাসন খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে।
কিন্তু সরকার পরিবর্তন আর মানুষের আস্থা ফিরে আসা একই বিষয় নয়।
সরকার পরিবর্তন হতে পারে একদিনে, আস্থা তৈরি হতে সময় লাগে বছরের পর বছর।
একজন বিনিয়োগকারীকে বক্তৃতা দিয়ে বিনিয়োগ করানো যায় না। তাঁকে বিশ্বাস করাতে হয় যে তাঁর বিনিয়োগ নিরাপদ।
তাঁকে দেখতে হবে আগামী কয়েক বছর দেশের অর্থনীতি কোন দিকে যাচ্ছে, ব্যাংকের সুদের হার কী হচ্ছে, করনীতি কতটা স্থিতিশীল, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন এবং সরকারি সিদ্ধান্তগুলো কতটা ধারাবাহিক।
এই আস্থাটিই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

ডেভেলপারদেরও নিজেদের দিকে তাকাতে হবে
সব দায় সরকার বা পরিস্থিতির ওপর দিয়ে দিলে সেটিও সত্যের অপলাপ হবে।
আবাসন খাতের মানুষ হিসেবে আমাদের নিজেদের ব্যর্থতাও স্বীকার করতে হবে।
বাজারে এমন প্রতিষ্ঠান আছে যারা এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যা বাস্তবে পালন করা সম্ভব ছিল না। কোথাও প্রকল্পের প্রকৃত অবস্থা ক্রেতাকে জানানো হয়নি, কোথাও সময়মতো হস্তান্তর হয়নি, কোথাও গ্রাহক বছরের পর বছর ঘুরেছেন।
একজন মানুষ যখন তাঁর সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে একটি প্লট কিনে বছরের পর বছর সেটি বুঝে না পান, তখন তাঁর ক্ষোভ খুবই স্বাভাবিক।
কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের এই আচরণের মূল্য আজ পুরো আবাসন খাতকে দিতে হচ্ছে।
এ কারণেই একজন ভালো ডেভেলপারের কাছেও এখন ক্রেতা প্রথমে জানতে চান—

“আপনাদের বিশ্বাস করব কীভাবে?”
আমার কাছে এটিই বর্তমান আবাসন খাতের সবচেয়ে বড় সংকট।
আবাসন ব্যবসায় আসল পণ্য হচ্ছে ‘আস্থা’
আমরা ভাবি একজন ডেভেলপার জমি, প্লট কিংবা ফ্ল্যাট বিক্রি করেন।
আমি বিষয়টিকে একটু অন্যভাবে দেখি।
একজন ডেভেলপার আসলে ভবিষ্যতের একটি প্রতিশ্রুতি বিক্রি করেন।
ক্রেতা আজ টাকা দেন, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তাঁর সম্পত্তি বুঝে পান কয়েক বছর পর।

এই কয়েক বছর তিনি কীসের ওপর ভরসা করেন?
একটি চুক্তিপত্রের পাশাপাশি তিনি ভরসা করেন প্রতিষ্ঠানটির ওপর।
তাই এই ব্যবসার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ জমি নয়—বিশ্বাসযোগ্যতা।

আবার সব দায় ডেভেলপারেরও নয়
আমি দীর্ঘদিন এই খাতকে কাছ থেকে দেখে আরেকটি বাস্তবতা উপলব্ধি করেছি।
একটি আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে একজন ডেভেলপারকে এমন অনেক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যেগুলো তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
ভূমির কাগজপত্র, নামজারি, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, পরিকল্পনা, নকশা, রাজউকসহ বিভিন্ন অনুমোদন—একটি ফাইল কোথাও আটকে গেলে পুরো প্রকল্প পিছিয়ে যেতে পারে।
কিন্তু ক্রেতা তো সরকারি দপ্তরের সঙ্গে চুক্তি করেননি। তিনি চুক্তি করেছেন ডেভেলপারের সঙ্গে।
তাই শেষ পর্যন্ত সমস্ত প্রশ্ন এসে পড়ে ডেভেলপারের টেবিলে।

এখানে আমার প্রশ্ন—
ডেভেলপারকে সময়মতো প্রকল্প বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য জবাবদিহির মধ্যে আনা হবে, খুব ভালো কথা। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আনা হবে না কেন?
দুই পক্ষেরই জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।

ভালো আর খারাপ ডেভেলপারের পার্থক্য মানুষ জানবে কীভাবে?
আমাদের আরেকটি বড় সমস্যা এখানে।
একজন সাধারণ ক্রেতার পক্ষে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা সহজ নয়।
আমার মতে, সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে একটি Developer Performance Rating চালু করা যেতে পারে।
যেখানে সাধারণ মানুষ জানতে পারবেন—প্রতিষ্ঠানটি কত বছর ধরে ব্যবসা করছে, কয়টি প্রকল্প শেষ করেছে, কতগুলো সময়মতো হস্তান্তর করেছে, চলমান প্রকল্পগুলোর অনুমোদনের অবস্থা কী এবং প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কতগুলো গ্রাহক অভিযোগ রয়েছে।
তাহলে ভালো প্রতিষ্ঠানকে নিজের ভালোত্ব প্রমাণ করার জন্য শুধু বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করতে হবে না।
তার কাজই তার পরিচয় দেবে।
আর খারাপ প্রতিষ্ঠানও সহজে ভালো প্রতিষ্ঠানের মুখোশ পরে বাজারে ঘুরতে পারবে না।

ক্রেতারও দায়িত্ব আছে
আমরা সাধারণত ক্রেতাকে শুধু ভুক্তভোগী হিসেবে দেখি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটিই সত্য।
তারপরও ক্রেতার নিজের কিছু দায়িত্ব রয়েছে।
এক কোটি টাকার সম্পত্তি কেনার আগে আমরা অনেক সময় যে পরিমাণ যাচাই করি, দশ লাখ টাকার গাড়ি কেনার সময় তার চেয়েও বেশি যাচাই করি।
শুধু কম দাম, সুন্দর ব্রোশিওর বা “এখন কিনলে কয়েক বছরে দাম দ্বিগুণ হবে”—এই কথায় আবাসন কেনা উচিত নয়।
দাম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—
আমি কার কাছ থেকে কিনছি?
মানুষ এখন বিনিয়োগ করছে না কেন?
আমার পর্যবেক্ষণে, মানুষের কাছে টাকা একেবারে নেই—বিষয়টি শুধু এমন নয়।
অনেকের বিনিয়োগের সক্ষমতা আছে, কিন্তু বিনিয়োগের সাহস নেই।
কারণ অনিশ্চয়তা আছে।
মানুষ ভাবছে—আরেকটু অপেক্ষা করি।
ব্যাংকের সুদ কী হয় দেখি।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যায় দেখি।
অর্থনীতি স্থিতিশীল হয় কি না দেখি।
ফ্ল্যাট বা জমির দাম কী হয় দেখি।
এই অপেক্ষাই এখন আবাসন বাজারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।

তবে আমি হতাশ নই
বাংলাদেশের মানুষকে বাড়ি লাগবে।
নতুন পরিবার তৈরি হবে। শহর সম্প্রসারিত হবে। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় আবাসনের প্রয়োজন বাড়বে। পূর্বাচলসহ নতুন নগরাঞ্চলের বিকাশ হবে।
অর্থাৎ আবাসনের প্রয়োজন হারিয়ে যায়নি।
মানুষের প্রয়োজন আছে, স্বপ্ন আছে—কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার আত্মবিশ্বাস কমেছে।
সেই আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনাটাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ।

এখন কী করা প্রয়োজন?
সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত আবাসন খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতি নিশ্চিত করা।
দ্বিতীয়ত, সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল, স্বচ্ছ এবং সময়সীমাবদ্ধ করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, দায়িত্বশীল ডেভেলপারদের কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে এবং প্রতারণাকারী প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।
চতুর্থত, মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সহনীয় সুদের housing finance প্রয়োজন।
আর ডেভেলপারদেরও বুঝতে হবে—আজকের ক্রেতাকে শুধু বিজ্ঞাপন দিয়ে আকৃষ্ট করার সময় শেষ।
তাঁকে তথ্য দিতে হবে। প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা জানাতে হবে। সমস্যা থাকলে সেটিও বলতে হবে।
স্বচ্ছতা থেকেই আস্থা তৈরি হয়।

শেষ কথা
বাংলাদেশের আবাসন খাত একটি কঠিন সময় পার করছে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কিন্তু আমি এটিকে শুধু সংকট হিসেবে দেখতে চাই না।
এটি আমাদের জন্য পরিবর্তনেরও একটি সুযোগ।
সরকার যদি স্বচ্ছ ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা যদি আবাসন অর্থায়নকে সহজ করে, ডেভেলপাররা যদি নিজেদের প্রতিশ্রুতির প্রতি আরও দায়িত্বশীল হন এবং ক্রেতারা যদি সচেতনভাবে বিনিয়োগ করেন—তাহলে এই খাত আবার ঘুরে দাঁড়াবে।
দিন শেষে একজন মানুষ যখন একটি প্লট বা ফ্ল্যাট কেনেন, তিনি শুধু কয়েক কাঠা জমি কিংবা কয়েক হাজার বর্গফুট জায়গা কেনেন না।
তিনি কেনেন তাঁর পরিবারের ভবিষ্যৎ।
তিনি কেনেন একটি ঠিকানা।
তিনি কেনেন একটি স্বপ্ন।
সেই স্বপ্নের সঙ্গে যেন প্রতারণা না হয়—এ দায়িত্ব ডেভেলপার, সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সবার।
আর বাংলাদেশের আবাসন খাতকে যদি সত্যিই ঘুরে দাঁড়াতে হয়, তাহলে নতুন প্রকল্প তৈরির আগে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস পুনর্নির্মাণ করতে হবে—
মানুষের আস্থা।
লেখক: এন. আই. মাকসুদ, আবসন বিশেষজ্ঞ, ঢাকা, বাংলাদেশ। 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL