★ বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০২০ সালে প্রকল্পটির উদ্যোগ নেওয়া হয়
★ নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২৪ সালে, প্রতিদিন বর্জ্য উৎপন্ন হয় ৪২ মেট্রিকটন
★ উৎকট দুর্গন্ধে অতিষ্ট ব্যবসায়ী-পথচারীরা
“বর্জ্য শোধনাগার চালু না থাকায় শুধু কোটি টাকার অবকাঠামোই অব্যবহৃত থাকছে না; বরং প্রতিদিনের বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে ফেলার কারণে পরিবেশগত চাপও বাড়ছে”
— অহিদুর রহমান, পরিবেশবিদ
“প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বর্জ্য শোধনাগারটি দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। আশা করছি সবকিছু ঠিক থাকলে শিগগিরই এর কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হবে”
— মুনমুন জাহান লিজা, প্রশাসক, নেত্রকোণা পৌরসভা
শহরের বর্জ্য আর যত্রতত্র পড়ে থাকবে না। আধুনিক প্রযুক্তিতে ময়লা শোধন করে তৈরি হবে জৈব সার। পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য থেকে তৈরি হবে আয়ের নতুন উৎস। কমবে দুর্গন্ধ, দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি-এমন প্রত্যাশা ছিল নেত্রকোণায় প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বর্জ্য শোধনাগারকে ঘিরে। কিন্তু বাস্তবতা এখন সম্পূর্ণ উল্টো। নেত্রকোণা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাহিরচাপড়া এলাকায় প্রায় দুই একর জায়গাজুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে বর্জ্য শোধনাগারটি। দূর থেকে দেখলে এখন এটিকে আর আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থাপনা বলে বোঝার উপায় নেই। ভেতরে-বাইরে জমে আছে ময়লার স্তূপ। কোথাও পচা বর্জ্য, কোথাও প্লাস্টিক-পলিথিন, আবার কোথাও ছড়িয়ে আছে গৃহস্থালির নানা আবর্জনা। বৃষ্টির পানি ও পচনশীল বর্জ্যরে সঙ্গে তৈরি হচ্ছে দুর্গন্ধযুক্ত নোংরা পরিবেশ। পরিবেশবিদরা বলছেন, বর্জ্য শোধনাগার চালু না থাকায় শুধু কোটি টাকার অবকাঠামোই অব্যবহৃত থাকছে না; বরং প্রতিদিনের বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে ফেলার কারণে পরিবেশগত চাপও বাড়ছে। তবে নেত্রকোণা পৌরসভার প্রশাসক বলছেন, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বর্জ্য শোধনাগারটি দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। আশা করছি সবকিছু ঠিক থাকলে শিগগিরই এর কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেত্রকোণা পৌর শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২০২০ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২৪ সালে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় শোধনাগারটি। কিন্তু উদ্বোধনের পরদিন থেকেই বন্ধ হয়ে যায় কার্যক্রম। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোটি পড়ে থাকলেও এর মাধ্যমে বর্জ্য শোধনের কার্যক্রম আর চালু হয়নি। ফলে যে স্থাপনায় শহরের ময়লা নিয়ে গিয়ে প্রক্রিয়াজাত করার কথা, এখন সেখানেই জমছে ময়লা। শোধনাগারের ভেতরেও তৈরি হয়েছে আবর্জনার স্তূপ। এতে প্রশ্ন উঠেছে-প্রকল্পটি চালুর আগেই কি এর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে যথাযথ প্রস্তুতি ছিল না?
জানা যায়, প্রায় এক লাখ ২৯ হাজার মানুষের নেত্রকোণা পৌর শহরে প্রতিদিন উৎপন্ন হয় প্রায় ৪২ মেট্রিকটন বর্জ্য। শোধনাগারটি চালু থাকলে এসব বর্জ্যের বড় অংশ নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শোধন ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হতো। কিন্তু সেটি অচল থাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংকট। শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন সংগ্রহ করা বর্জ্যরে একটি বড় অংশ যাচ্ছে উন্মুক্ত ভাগাড়ে। কোথাও রাস্তার পাশে, কোথাও জনবসতির কাছাকাছি আবার কোথাও নির্দিষ্ট স্থানের বাইরে পড়ে থাকছে ময়লা। এতে একদিকে যেমন দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বাড়ছে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় বর্জ্য পড়ে থাকার কারণে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য। পচনশীল বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধের পাশাপাশি মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তারা জানান, বর্জ্য শোধনাগারের আশপাশে রয়েছে বসতবাড়ি, বাসস্ট্যান্ড ও একটি এতিমখানা। দীর্ঘদিন ধরে ময়লা জমে থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শোধনাগার চালু হলে তারা ভেবেছিলেন এলাকার পরিবেশের উন্নতি হবে। কিন্তু এখন উল্টো শোধনাগারের ভেতরেই ময়লার স্তূপ জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দিনের পাশাপাশি রাতে দুর্গন্ধের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। শিশুদের নিয়ে স্বাভাবিকভাবে বাইরে বের হওয়া, খেলাধুলা কিংবা পড়াশোনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এতিমখানার আশপাশেও দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় শিশুদের স্বাভাবিক পরিবেশে থাকা ও পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু আবাসিক এলাকাই নয়, বর্জ্য শোধনাগারের আশপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও পড়েছে এর প্রভাব। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, দুর্গন্ধের কারণে অনেক ক্রেতা দোকানে বসতে বা বেশিক্ষণ অবস্থান করতে চান না। এতে বিক্রি কমে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা। ব্যবসায়ী আনোয়ার বলেন, আগে দোকানে বসে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা করা গেলেও এখন দুর্গন্ধের কারণে ক্রেতাদের অনেকেই দ্রুত চলে যান। ফলে ব্যবসায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
পৌরবাসীরা বলছেন, একদিকে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বর্জ্য শোধনাগার অচল, অন্যদিকে প্রতিদিন শহরে উৎপন্ন হচ্ছে প্রায় ৪২ টন বর্জ্য। ফলে পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রকল্পটি কার্যত কোনো সুফল দিতে পারছে না। যে স্থাপনায় শহরের ময়লা শোধন করে পরিবেশ দূষণ কমানোর কথা, এখন সেই স্থাপনাতেই জমছে ময়লা। আশপাশের মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে, শহরের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হচ্ছে উন্মুক্ত ভাগাড়। নগরবাসীর প্রশ্ন, প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই শোধনাগার উদ্বোধনের পরদিনই কেন বন্ধ হয়ে গেল? দীর্ঘদিন ধরে কেন পড়ে আছে কোটি টাকার অবকাঠামো? প্রকল্পটি সচল করতে এখন পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? আর প্রতিদিনের প্রায় ৪২ টন বর্জ্যের টেকসই ব্যবস্থাপনাই বা হবে কীভাবে? এসব প্রশ্নের দ্রুত ও কার্যকর সমাধান না হলে পরিবেশ রক্ষার নামে নির্মিত কোটি টাকার এই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত নিজেই পরিবেশদূষণের অন্যতম উৎস হয়ে থাকার আশঙ্কা করছেন নগরবাসী।
বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মী অহিদুর রহমানের মতে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নির্মিত একটি স্থাপনা দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকা এবং তার ভেতরেই বর্জ্য জমে থাকা প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পরিকল্পিতভাবে বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই, প্রক্রিয়াজাত ও পুনঃব্যবহারের ব্যবস্থা না থাকলে এমন প্রকল্প কার্যকর ফল দিতে পারে না। তার মতে, বর্জ্য শোধনাগার চালু না থাকায় শুধু কোটি টাকার অবকাঠামোই অব্যবহৃত থাকছে না; বরং প্রতিদিনের বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে ফেলার কারণে পরিবেশগত চাপও বাড়ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আবদুল্লাহ আল মতিন বলেন, পরিবেশ রক্ষায় পৌরসভার সঙ্গে কয়েকবার আলোচনা হয়েছে এবং শোধনাগারের আশপাশে পরিবেশ দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নেত্রকোণা পৌরসভার প্রশাসক মুনমুন জাহান লিজা বলেন, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বর্জ্য শোধনাগারটি দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে কবে নাগাদ এটি চালু হবে, চালুর পর কীভাবে প্রতিদিনের বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হবে এবং দীর্ঘদিন অচল থাকার কারণে অবকাঠামো বা যন্ত্রপাতিতে কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না, এসব বিষয়ে স্পষ্ট কোনো সময়সীমা জানা যায়নি।