স্থলাভিষিক্ত হলেন ছেলে হাওয়ার্ড
ওয়ারেন বাফেট বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ৯৬ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি বিনিয়োগকারী এখন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এমেরিটাস হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁর ছেলে হাওয়ার্ড বাফেট, যিনি ১৯৯৩ সাল থেকে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।
বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে জানিয়েছে, চেয়ারম্যান পদ থেকে বাফেটের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে। এর নয় মাস আগে তিনি দীর্ঘদিনের সহযোগী গ্রেগ অ্যাবেলের কাছে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব হস্তান্তর করেছিলেন।
বাফেট ১৯৬৫ সালে বার্কশায়ারে যোগ দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিকে একটি সংকটগ্রস্ত বস্ত্র উৎপাদনকারী কোম্পানি থেকে প্রায় ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে রূপ দেন। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, শৃঙ্খলাপূর্ণ মূলধন ব্যবস্থাপনা এবং সরল ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার ওপর তাঁর বিনিয়োগদর্শন বিশ্বজুড়ে বহু বিনিয়োগকারী ও করপোরেট নেতাকে প্রভাবিত করেছে।
গতকাল শুক্রবার শেয়ারহোল্ডারদের উদ্দেশে লেখা এক চিঠিতে বাফেট বলেন, “সময় কখনো থেমে থাকে না। তবে সে আমার প্রতি উদার ছিল।” ১৯৬৫ সাল থেকে বার্কশায়ারের সঙ্গে থাকা বাফেটের নেতৃত্বের অবসানকে তাই একটি দীর্ঘ পরিকল্পিত উত্তরাধিকার পরিবর্তনের পরিণতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিনিয়োগ বিশ্লেষক ব্রায়ান জ্যাকবসেন বলেন, বাফেটের বিদায় মূলত ‘কখন’ হবে সেই প্রশ্ন ছিল, ‘হবে কি না’—তা নয়। তাঁর মতে, বার্কশায়ার কয়েক বছর ধরেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে।
বাফেট প্রধান নির্বাহীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর বার্কশায়ারের শেয়ারের মূল্যায়নেও কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। এলএসইজির তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির শেয়ারমূল্য ও হিসাবমূল্যের অনুপাত প্রায় ১ দশমিক ৬২ থেকে কমে ১ দশমিক ৫৩ হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীরা বাফেটের নেতৃত্বের কারণে কোম্পানিটির শেয়ারে যে অতিরিক্ত মূল্যায়ন দিয়েছেন, সেটিকে বাজারে ‘বাফেট প্রিমিয়াম’ বলা হতো।
বার্কশায়ার এখনো একমাত্র আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যার বাজারমূল্য এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। প্রযুক্তি খাতের বড় বড় কোম্পানির আধিপত্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি এই অবস্থান ধরে রেখেছে।
বাফেটের প্রভাব শুধু বার্কশায়ারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অধিগ্রহণ, উত্তরসূরি নির্বাচন কিংবা বাজারের অস্থির সময়ে কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—এসব বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানির প্রধান নির্বাহীরা তাঁর পরামর্শ নিতেন। তাঁর বার্ষিক শেয়ারহোল্ডার সভাও বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় এক সমাবেশে পরিণত হয়েছিল।
বার্কশায়ার জানিয়েছে, চেয়ারম্যান এমেরিটাস হিসেবে বাফেট পরিচালনা পর্ষদের সদস্য থাকবেন এবং তাঁর মূল্যবান মতামত ও অভিজ্ঞতা দিয়ে কোম্পানিকে পরামর্শ দিয়ে যাবেন।
বার্কশায়ারের নতুন চেয়ারম্যান হাওয়ার্ড বাফেট তাঁর বাবার গড়ে তোলা সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ রক্ষা করার কথা জানিয়েছেন। গ্রেগ অ্যাবেলও বলেছেন, ওয়ারেন বাফেটের প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ বার্কশায়ারের কেন্দ্রেই থাকবে এবং হাওয়ার্ড সেগুলোর অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবেন।
‘চেয়ারম্যান এমেরিটাস’ সাধারণত অবসর নেওয়া কোনো চেয়ারম্যান বা প্রতিষ্ঠাতাকে সম্মানসূচকভাবে দেওয়া একটি পদ। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদান ও প্রভাবকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের মে মাসে বাফেট প্রথম বার্কশায়ারের নেতৃত্ব থেকে সরে যাওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। তাঁর দীর্ঘ কয়েক দশকের নেতৃত্বের কারণে কোম্পানিটির সঙ্গে তাঁর নাম প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল। ফলে তাঁর উত্তরসূরি নির্ধারণ কর্পোরেট আমেরিকার সবচেয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা নেতৃত্ব পরিবর্তনগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের ব্যবসার মধ্যে রয়েছে গাড়ি বিমা প্রতিষ্ঠান গেইকো, বিএসএনএফ রেলওয়ে, বিভিন্ন জ্বালানি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং ডেইরি কুইনের মতো ব্র্যান্ড। প্রতিষ্ঠানটির হাতে বিপুল পরিমাণ শেয়ার ও মার্কিন ট্রেজারি সিকিউরিটিজও রয়েছে।
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বার্কশায়ারের পরিচালন মুনাফা ১৬ শতাংশ বেড়ে ১২ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি। একই সময়ে শেয়ারবাজারে অবাস্তবায়িত লাভ-ক্ষতিসহ কোম্পানিটির নিট আয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২৫ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।