পাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার দুই দিন পরও স্বাভাবিক হয়নি পরিস্থিতি। কাদা, পাথর, বরফ ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের সন্ধানে নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জীবিত কাউকে উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে এলেও নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ধ্বংসস্তূপে নদীর গতিপথ আটকে তৈরি হওয়া নতুন হ্রদ ভেঙে আরও একটি বড় বন্যা হতে পারে—এমন আশঙ্কায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে নেপাল ও চীন।
নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, বুধবারের ভয়াবহ বন্যায় দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো শত শত মানুষ নিখোঁজ। প্রতিবেশী চীনের তিব্বত অঞ্চলে আরও তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। ফলে দুই দেশ মিলিয়ে নিশ্চিত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ৪৭২ জনে।
যেভাবে শুরু ভয়াবহ বিপর্যয়
বুধবার সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে হিমালয় অঞ্চলে একটি হিমবাহের বড় অংশ ধসে পড়ে। এর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নদীর গতিপথে নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়ি নদীগুলো ফুলে-ফেঁপে ভয়াবহ স্রোতে পরিণত হয়।
বন্যার প্রবল স্রোত প্রথমে নেপালের রাসুয়া ও আশপাশের এলাকা তছনছ করে পরে ভোটে কোশি ও ত্রিশূলী নদী হয়ে ভাটির বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো ভেসে যায়। অনেক এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যার পানি ও ধ্বংসাবশেষ হিমালয়ের নদী ব্যবস্থার বিস্তীর্ণ অংশে ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধারকারীদের নদী ও পাহাড়ি উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালাতে হচ্ছে।
মৃত ৪৬৯, নিখোঁজ প্রায় হাজার
নেপালের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ৪৬৯। এখনো প্রায় ৯৭৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা, নিরাপত্তাকর্মী, পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন।
নেপালের বিভিন্ন নদী ও ভাটির এলাকায় উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। কারণ প্রবল স্রোতে অনেক মরদেহ ও মানুষ মূল বিপর্যয়স্থল থেকে বহু দূরে ভেসে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণে বোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর পাশাপাশি ভাটির এলাকাতেও তল্লাশি বাড়ানো হয়েছে।
পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের বড় ক্ষতি
বিপর্যয়টি শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নেপালের জনপ্রিয় পর্যটন ও তীর্থযাত্রার রুটও ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ৬৬৭ জন পর্যটক ও দর্শনার্থী নিখোঁজ, যাদের মধ্যে ১২৭ জন নেপালি এবং ৫৪০ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন।
এ কারণে ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সরকার ও পরিবারগুলো নিজ নিজ নাগরিকদের অবস্থান নিশ্চিত করতে নেপালের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। নেপালে তীর্থযাত্রা ও ট্রেকিংয়ে যাওয়া বহু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তাদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
নতুন বিপদের নাম ‘আটকে পড়া হ্রদ’
উদ্ধার অভিযান চলার মধ্যেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আরেকটি সম্ভাব্য বন্যা নিয়ে।
ধ্বংসস্তূপ ও পাথরের বিশাল স্তূপে ভোটে কোশি নদীর একটি অংশের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে একটি অস্থায়ী হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে পানি দ্রুত জমছে। এই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে নিচের দিকে আবারও ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা নেমে আসতে পারে।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ও পরিস্থিতিটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। চীনা কর্মকর্তাদের হিসাবে, হ্রদটিতে আগামী কয়েক দিনে প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি প্রবেশ করতে পারে। পানি বাড়তে থাকলে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য পানি নিষ্কাশনের উপায় নির্ধারণে চীন প্রকৌশলী ও জরুরি উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করেছে।
ফলে উদ্ধারকারীদের একদিকে ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজদের খুঁজতে হচ্ছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার বন্যা থেকে মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখতে হচ্ছে।
তিব্বতেও ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ
বন্যার উৎসস্থলের কাছাকাছি চীনের তিব্বত অঞ্চলের জিরং সীমান্ত এলাকাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে কাদা ও পাথরের বিশাল স্রোত সীমান্তের স্থাপনা ও সড়ক ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
চীনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, জিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ, যাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। সেখানে তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং বৃহস্পতিবার জিরং এলাকা পরিদর্শন করেন এবং উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করেন। বেইজিং জরুরি উদ্ধার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া এবং দ্বিতীয় দফার দুর্যোগ ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রায় ১০০ চীনা নাগরিক নিখোঁজ থাকতে পারেন। বিষয়টি নেপালের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে যাচাই করা হচ্ছে।
কেন এত ভয়াবহ হলো বন্যা?
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ার পর বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও পানি একসঙ্গে নদী ব্যবস্থায় নেমে আসে। এতে স্বাভাবিক নদীপথে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যে নদীর পানি ও ধ্বংসাবশেষ কয়েক কিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশ, বরফ ও হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এবং পাহাড়ি নদীর সংকীর্ণ গতিপথ এ ধরনের বিপর্যয়ের ভয়াবহতা বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে এই নির্দিষ্ট ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ ও হিমবাহ ধসের প্রক্রিয়া নিয়ে আরও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
উদ্ধার অভিযানে সেনা-পুলিশ
নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছাতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষ ও মরদেহ শনাক্তে ভারী যন্ত্রপাতির পাশাপাশি প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল ও কুকুরও ব্যবহার করা হচ্ছে।
হাজার হাজার মানুষকে ইতোমধ্যে দুর্গত এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জরুরি খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দিতে আকাশপথে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বজনদের অপেক্ষা, বাড়ছে উৎকণ্ঠা
বিপর্যয়ের পর সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা। নেপাল ছাড়াও ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও অন্যান্য দেশে স্বজনরা সরকারি সংস্থা, দূতাবাস, স্থানীয় প্রশাসন ও ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
বেঁচে ফেরা অনেকের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ সেই মুহূর্তের কথা—কয়েক মিনিটের মধ্যে কাদা, পাথর ও পানির স্রোত ঘরবাড়ি ও স্থাপনা গ্রাস করে নেয়। উদ্ধারকারীরাও বলছেন, ধ্বংসস্তূপের বিস্তৃতি এত বেশি যে নিখোঁজদের সন্ধানে নদীর দীর্ঘ অংশজুড়ে তল্লাশি চালাতে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার প্রস্তাব
বিপর্যয়ের পর নেপালকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও নেপাল ও চীনের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, নিখোঁজদের উদ্ধার এবং মানুষের জীবন রক্ষাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর অন্যতম বড় বিপর্যয়
২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিপুল প্রাণহানির পর এবার হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যায় নেপাল আবারও বড় ধরনের জাতীয় দুর্যোগের মুখে পড়েছে। তবে এবারের বিপর্যয়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—একই সঙ্গে বন্যা, ভূমিধস, অবকাঠামো ধ্বংস, পর্যটক নিখোঁজ এবং নতুন হ্রদ ভেঙে দ্বিতীয় দফার বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন নিখোঁজদের সন্ধান এবং নদীর গতিপথ আটকে তৈরি হওয়া হ্রদগুলোর পরিস্থিতি। পানি বাড়তে থাকলে উদ্ধার অভিযান পরিচালনাকারীদের জন্যও নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে নেপাল ও চীনের উদ্ধারকারী দল এখন শুধু নিখোঁজদের সন্ধানই নয়, সম্ভাব্য দ্বিতীয় বিপর্যয় ঠেকাতেও সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছে।