* প্রথম দিনেই দেশের অর্থনীতি-রোহিঙ্গাসহ ১০টি ইস্যুতে বৈঠক
* ট্রাম্পের নৈশভোজে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে এসে নিউইয়র্কে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় প্রথমবারের মতো অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ প্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে প্রথম দিনেই ১০টি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনের মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে নৈশভোজে যোগ দেন তারেক রহমান।
স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের উপস্থিতিতে উদ্বোধনী পর্বে যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং জাতিসংঘ সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুগুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। অধিবেশনের প্রথম দিন সকালে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্বনেতা ও তাদের জীবনসঙ্গীদের সম্মানে নর্থ ডেলিগেটস লাউঞ্জে এক প্রাতরাশ সভার আয়োজন করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সহধর্মিণীকে সঙ্গে নিয়ে সে প্রাতরাশে অংশ নেন।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক: জাতিসংঘ সদরদপ্তরে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলা, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ উত্তরণে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, যেমন ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড উদ্যোগের প্রশংসা করেছে বিশ্বব্যাংক। অর্থমন্ত্রী আরও জানান, তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষে সরকার ৫০ শতাংশ অনুদান ও ৫০ শতাংশ সুবিধাজনক ঋণে যে প্রকল্প চালু করেছে, তা বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় আরও বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়নে দুই পক্ষ একমত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনের স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
তুর্কি হাউসে এরদোগানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক: নিউইয়র্কে অবস্থিত ‘তুর্কি হাউস’-এ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোগানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব এ কে এম নাজমুল হক জানান, বৈঠকে বাংলাদেশ ও তুরস্কের দ্বিপক্ষীয় ও ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও বহুমাত্রিক রূপ দেওয়ার ওপর জোর দেন দুই নেতা। অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচনের আলোচনার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ফোরামে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে উভয় দেশ সম্মত হয়েছে।
রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে জাতিসংঘে তৎপরতা: দিনব্যাপী কূটনৈতিক ব্যস্ততার মধ্যে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং মিয়ানমারে তাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসন জোরদারের ওপর জোর দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলাদাভাবে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহ এবং মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ। প্রধানমন্ত্রীর আবাসস্থল ‘হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক’-এ অনুষ্ঠিত হাইকমিশনার বারহাম সালেহের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়। অপরদিকে, বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গে সাক্ষাতে টেকসই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই। গত মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সময় বিকেলে জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) প্রধান বারহাম সালেহর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি একথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালীন আবাসস্থল হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল হোটেলে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর সরকারী প্রেস সচিব একেএম নাজমুল হক গণামধ্যমকে এ কথা জানান। এ সময় বারহাম সালেহ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেন। সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। সংকটের স্থায়ী সমাধানে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দ্বিপাক্ষিক এই বৈঠকে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সাইডলাইনে আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা: সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনের পাশাপাশি সাইডলাইনে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে, মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন মোহামেদ লতিফ এবং হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ারের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা পরিচালনা করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান বিশ্বনেতাদের সম্মানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের দেয়া নৈশভোজে অংশ নিয়েছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে বিশ্বনেতাদের সম্মানে গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় রাতে নিউইয়র্কের বিলাসবহুল লোটে নিউইয়র্ক প্যালেস হোটেলে এ নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোর সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং তাদের সহধর্মিণীরা এ নৈশভোজে অংশ নেন। এর আগে সকালে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মানে প্রাতরাশের আয়োজন করেন। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও অংশ নেন।