# সত্তর ও আশির দশকে যখন সাশ্রয়ী জাপানি গাড়ির বাজার এ দেশে ধীরে ধীরে প্রসার লাভ করতে শুরু করে, তখন থেকেই পুরোনো ধাঁচের সুদৃশ্য মার্সিডিজ-বেঞ্জ ডব্লিউ ১১৫, ভক্সওয়াগন বিটল, বিএমডব্লিউ ই ৩০ কিংবা ফোর্ড কর্টিনার মতো গাড়িগুলো আলাদাভাবে ভিন্টেজ বা ক্লাসিক মর্যাদা পেতে থাকে এবং সংগ্রাহকদের নজরে বিশেষ স্থান দখল করে নেয়
বাংলাদেশ একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও আধুনিক পরিকাঠামোয় এগিয়ে চলা নদীমাতৃক দেশ। হাইওয়েতে যখন সর্বাধুনিক হাইব্রিড, ইলেকট্রিক বাহন বা দ্রুতগামী জাপানি রিকন্ডিশন গাড়িগুলো গতির ঝড় তোলে, ঠিক তখনই কোনো এক নিঝুম সকালে পুরান ঢাকার আঁকাবাঁকা গলি কিংবা গুলশানের প্রশস্ত অ্যাভিনিউতে হঠাৎ দেখা মিলে যায় চার চাকার এক অমূল্য ইতিহাস। ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে যায় কয়েক দশক, রূপালী পর্দার পুরোনো দিনের কোনো সোনালী দৃশ্য ভেসে ওঠে চোখের সামনে। এক অদ্ভুত, গম্ভীর ও অভিজাত ইঞ্জিনের ছন্দময় শব্দ বাতাস ভারী করে তোলে। রাস্তায় চলতে থাকা আধুনিক স্পোর্টস কারগুলোও যেন থমকে দাঁড়িয়ে নীরব সম্মান জানায় তাকে। এগুলো কোনো সাধারণ পরিবহন ব্যবস্থা বা যান্ত্রিক যান নয়, এগুলো রূপালী অতীতের চলমান স্মৃতিচিহ্ন, এগুলো বাংলাদেশের ভিন্টেজ গাড়ি।
বাংলাদেশে ভিন্টেজ গাড়ির ইতিহাস মূলত এই ভূখণ্ডের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন জমিদার, রাজপরিবার ও ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হাত ধরে এ দেশে প্রথম মোটরগাড়ির আনুষ্ঠানিক প্রবেশ ঘটে। সেই যুগে গাড়ি কেনা কিংবা গ্যারেজে রাখা কোনো সাধারণ বিষয় ছিল না, এটি ছিল উচ্চতর সামাজিক অবস্থান, ক্ষমতা ও অগাধ ধনসম্পদের এক অদ্বিতীয় প্রতীক। ঢাকার নবাব পরিবার থেকে শুরু করে ময়মনসিংহ, দিনহাটা বা সিলেটের অভিজাত জমিদাররা ইউরোপ থেকে শখের বশে সুদূর পানিপথে নিয়ে আসতেন অস্টিন, মরিস, রোলস-রয়েস কিংবা মার্সিডিজ-বেঞ্জের মতো সব কালজয়ী ধ্রুপদী গাড়ি। দেশভাগের পর পাকিস্তান আমলেও তৎকালীন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক আমলারা পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে আন্তর্জাতিক মানের মার্সিডিজ, ভক্সওয়াগন, ফোর্ড, প্যাকার্ড ও ক্যাডিলাক গাড়ি দেশে আনেন, যা তখনকার ঢাকার রাস্তায় অভিজাতদের প্রধান বাহন হয়ে ওঠে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিবৃত্তের পাশাপাশি এখানকার ভিন্টেজ গাড়ির সংস্কৃতিতেও এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে আসে। স্বাধীনতার ঠিক আগে ও যুদ্ধপরবর্তী পুনর্গঠনকালে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় কর্মরত বিদেশি কর্মকর্তা, কূটনৈতিক মিশন ও ত্রাণ সংস্থার প্রতিনিধিরা প্রচুর পরিমাণে শক্ত সামর্থ্য ইউরোপীয় ও আমেরিকান গাড়ি এ দেশে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে তাদের দায়িত্ব পালন শেষে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সময় এসব দুর্লভ গাড়ি স্থানীয় শৌখিন সংগ্রাহক ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছে হস্তান্তর করে যান। বিশেষ করে সত্তর ও আশির দশকে যখন সাশ্রয়ী জাপানি গাড়ির বাজার এ দেশে ধীরে ধীরে প্রসার লাভ করতে শুরু করে, তখন থেকেই পুরোনো ধাঁচের সুদৃশ্য মার্সিডিজ-বেঞ্জ ডব্লিউ ১১৫, ভক্সওয়াগন বিটল, বিএমডব্লিউ ই ৩০ কিংবা ফোর্ড কর্টিনার মতো গাড়িগুলো আলাদাভাবে ভিন্টেজ বা ক্লাসিক মর্যাদা পেতে থাকে এবং সংগ্রাহকদের নজরে বিশেষ স্থান দখল করে নেয়।
বাংলাদেশে ভিন্টেজ গাড়ি বলতেই সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে গাড়িপ্রেমীদের স্মৃতির ক্যানভাসে সবচেয়ে আগে যে রূপটি ভেসে ওঠে, তা হলো ভক্সওয়াগন বিটল বা স্থানীয়ভাবে বহুল পরিচিত ‘গোবরে পোকা গাড়ি’। এর গোলাকার চমৎকার গড়ন, পেছনের দিকে থাকা বায়ুকুলার ইঞ্জিনের বিশেষ গুঞ্জন এবং অত্যন্ত সহজ কিন্তু চমৎকার মেকানিক্সের কারণে এটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একসময় এটি কেবল উচ্চবিত্তের একচ্ছত্র অধিকার নয়, বরং শহরের রুচিশীল মধ্যবিত্ত পরিবারেরও প্রিয় পছন্দের তালিকায় ঠাঁই করে নেয়। আশির দশকে আধুনিক, জ্বালানি-বান্ধব ও আরামদায়ক জাপানি গাড়ির সয়লাবে এই ক্লাসিক বিটলগুলো রাস্তা থেকে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে শুরু করলেও একদল পাগলপারা আবেগীয় সংগ্রাহকের হাত ধরে বিটল আজও বাংলাদেশে স্বমহিমায় টিকে রয়েছে। ব্যস্ত শহরের যানজটে এখনো কোনো ঝকঝকে রঙিন বিটল হেঁটে যেতে দেখলে ছোট-বড় সব বয়সের মানুষের চোখে ফুটে ওঠে এক অদ্ভুত আনন্দ, মায়া ও নস্টালজিয়া।

কেবল ভক্সওয়াগন নয়, বাংলাদেশের ভিন্টেজ গাড়ির ঝুলিতে রয়েছে মার্সিডিজ-বেঞ্জের অসামান্য কিছু কালজয়ী রূপ ও বডি শৈলী। ষাট ও সত্তর দশকের ডব্লিউ ১১৫, ডব্লিউ ১১৪ এবং পরবর্তীতে ডব্লিউ ১২৩ মডেলের মার্সিডিজগুলো তখনকার সময় দেশের প্রথিতযশা ব্যবসায়ী, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের প্রথম পছন্দ ছিল। এদের ইস্পাতকঠিন গঠন, সময়কে জয় করা নান্দনিক অলংকরণ এবং অতুলনীয় ইঞ্জিন স্থায়িত্বের কারণে বহু বছর প্রতিনিয়ত ব্যবহার করার পরও এগুলো সংগ্রাহকদের গ্যারেজে আজও নতুন গাড়ির মতো উজ্জ্বল। এছাড়া ষাটের দশকের ব্রিটিশ বিএমসি মরিস মাইনর, অস্টিন ক্যামব্রিজ, ভক্সহল, এমজি কিংবা ট্রায়াম্ফের মতো স্পোর্টস গাড়িগুলোও দেশের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী পরিবারগুলোর গ্যারেজে সযত্নে টিকে আছে। প্রতিটি ভিন্টেজ গাড়ির মেটাল বডির নিচে জড়িয়ে রয়েছে কোনো এক পরিবারের পারিবারিক ঐতিহ্য, তাদের উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী কিংবা স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের কোনো রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ স্মৃতি।
তবে ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে এই ভিন্টেজ গাড়ি টিকিয়ে রাখার পথটি মোটেও মসৃণ নয়, বরং এটি এক সীমাহীন ধৈর্য, বিপুল অর্থ ও গভীর ভালোবাসার দীর্ঘ এক সংগ্রাম। একটি পুরোনো, মরিচা ধরা বা প্রায় নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা গাড়িকে আগের সেই রাজকীয় রূপ ফিরিয়ে দেওয়া বা রিস্টোর করা অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী এক শিল্পকর্ম। বাংলাদেশে ভিন্টেজ গাড়ির সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো এর অরিজিনাল পার্টস বা যন্ত্রাংশের চরম দুষ্প্রাপ্যতা। চার বা পাঁচ দশক আগের কোনো বিশেষ গাড়ির অরিজিনাল স্পেয়ার পার্টস এখন আর দেশীয় খুচরা বাজারে সহজলভ্য নয়। প্রায়শই সংগ্রাহকদের মাসের পর মাস, এমনকি বছরজুড়ে অপেক্ষা করতে হয় কোনো নির্দিষ্ট ছোট পার্টসের জন্য, যা হয়তো জার্মানি, যুক্তরাজ্য বা আমেরিকার কোনো পুরোনো স্ক্র্যাপ ইয়ার্ড বা বিশেষায়িত অনলাইন নিলাম থেকে অত্যন্ত চড়া দামে ও চড়া শুল্ক দিয়ে দেশে আমদানি করতে হয়।
পার্টস সংগ্রহের জটিলতার পাশাপাশি দক্ষ ও অভিজ্ঞ কারিগরের অভাবও এ দেশের ভিন্টেজ গাড়ি সংগ্রাহকদের প্রতিনিয়ত এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে দেয়। আধুনিক অটোমোবাইল মেকানিকরা যেখানে মূলত ডিজিটাল স্ক্র্যানার, কম্পিউটারাইজড সেন্সর ও আধুনিক ইলেকট্রনিক সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে ভিন্টেজ গাড়ির মেকানিক্স সম্পূর্ণ ভিন্ন ও মৌলিক ঘরানার। নিখুঁতভাবে কার্বুরেটর টিউন করা, ম্যানুয়াল পয়েন্ট ইগনিশন সিস্টেমের সূক্ষ্ম ভারসাম্য বোঝা কিংবা শত বছরের পুরোনো বডি প্যানেল হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আগের শেপে নিয়ে আসার মতো জহুরি মেকানিক দেশে এখন সংখ্যায় হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র। পুরান ঢাকা কিংবা ধোলাইখালের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মেকানিক তাঁদের জীবনভরের অর্জিত অভিজ্ঞতা দিয়ে এসব ঐতিহ্যবাহী গাড়ি সচল রেখে চলেছেন। প্রায়ই প্রয়োজনীয় পার্টস না পাওয়া গেলে তাঁদের মেধা ও নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা দিয়ে লেথ মেশিনে নতুন করে পার্টস তৈরি বা পুনর্র্নিমাণ করতে হয়, যা এই মেকানিকদের পেশাগত দক্ষতার বাইরে এক গভীর ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।
ভিন্টেজ গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ কেবল মেকানিক্স বা পার্টসের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই থেমে থাকে না, দেশের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া, অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও দীর্ঘ বর্ষাকালও এই ধাতব ঐতিহ্যগুলোর অন্যতম বড় শত্রু। আর্দ্রতার কারণে সংগ্রাহকদের অজান্তেই গাড়ির চেসিস, ফ্লোরবোর্ড ও ভেতরের সুক্ষ্ম বডি প্যানেলে মরিচা ধরে ধরে গাড়ি ধসে যেতে থাকে। তাই প্রতিনিয়ত গাড়ি ধোয়া-মোছা, ইঞ্জিন চালু করে সচল রাখা, দীর্ঘক্ষণ রোদে বা বৃষ্টিতে না রাখা এবং সম্ভব হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বা আর্দ্রতামুক্ত বিশেষ গ্যারেজে গাড়ি রাখা নিশ্চিত করতে হয়। এটি এমন এক ব্যয়বহুল শখ বা নেশা, যেখানে কেবল বিশাল অর্থবিত্ত থাকলেই চলে না; এর জন্য প্রয়োজন হয় অন্তহীন পারিবারিক মানসিক সমর্থন, নিরবচ্ছিন্ন সময় এবং ব্যক্তিগত গভীর মানসিক নিবেদন।
এত সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতার পরও বাংলাদেশে ভিন্টেজ গাড়ির সংস্কৃতি দিনে দিনে বিলুপ্ত না হয়ে বরং তরুণ প্রজন্মের সুনির্দিষ্ট আগ্রহে এক নতুন রূপ ধারণ করছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে দেশের বিভিন্ন ভিন্টেজ কার ক্লাব ও অনলাইন কেন্দ্রিক তরুণ সংগ্রাহক গোষ্ঠী। পূর্বে যেখানে সংগ্রাহকরা নিজেদের একাকী গ্যারেজে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করতেন, এখন তারা গড়ে তুলেছেন এক নিবিড় সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পারিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম। ‘ক্লাসিক কার ক্লাব অফ বাংলাদেশ’ সহ বিভিন্ন অটোমোবাইল উৎসাহী গ্রুপ এখন নিয়মিত বিরতিতে রাজধানী ও দেশের বড় বড় শহরগুলোতে ভিন্টেজ কার র্যালি, রোড শো বা প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকে। এসব প্রদর্শনীতে যখন একই সারিতে ১৯৪০ বা ৫০ দশকের র্যার অস্টিন থেকে শুরু করে ৭০ দশকের চকচকে মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ ও ক্লাসিক রেসিং কারগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায়, তখন তা সাধারণ মানুষের জন্য এক অভূতপূর্ব উৎসবমুখর দৃশ্যের সৃষ্টি করে।
এই জাতীয় প্রদর্শনীগুলোর গুরুত্ব কেবল বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে দেশের নতুন প্রজন্ম কেবল গাড়ির বাইরের সৌন্দর্যের মুখোমুখিই হয় না, বরং তারা নিজ দেশের পরিবহন ইতিহাস, প্রযুক্তিগত বিবর্তন, নকশার ধারা ও শিল্পশৈলীর পরিবর্তন সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। বাবা-মায়েরা তাঁদের সন্তানদের নিয়ে আসেন ইতিহাসের এই চাক্ষুষ নিদর্শনগুলো দেখাতে, প্রবীণরা স্মৃতিময় আবেগাপ্লুত চোখে তাকিয়ে তরুণদের শোনান তাদের ফেলে আসা যৌবনের নানা গল্প। ভিন্টেজ কারগুলো এভাবে ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের মধ্যবর্তী দূরত্ব কমিয়ে এক চমৎকার দৃশ্যমান সংযোগ সেতু তৈরি করে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রসারের ফলে এখন খুব সহজেই তরুণ সংগ্রাহকরা দেশ-বিদেশের অন্যান্য ক্লাসিক কার কমিউনিটির সঙ্গে তথ্য শেয়ার করতে পারেন, কোথা থেকে দুষ্প্রাপ্য পার্টস আনা যাবে বা কোন স্থানীয় মেকানিক কোন নির্দিষ্ট মেকানিক্যাল কাজের জন্য দক্ষ, তা এক মুহূর্তে জানা সম্ভব হয়।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ভিন্টেজ গাড়ি কেবল একটি ব্যক্তিগত শখ বা বিলাসী বিনোদন নয়, এটি প্রত্নতাত্ত্বিক শিল্পের মর্যাদা পায় এবং একটি দেশের ইতিহাসের অংশ হিসেবে সংরক্ষিত হয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এসব গাড়ির সংরক্ষণে বিশেষ আইনি সুবিধা, কম খরচে স্পেশাল রেজিস্ট্রেশন নম্বর, রোড ট্যাক্স মওকুফ এবং ঐতিহাসিক সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট সরকারি কাঠামো বিদ্যমান রয়েছে। তবে বাংলাদেশে এ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালার কিছুটা ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। এখানে একটি সচল সাধারণ বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ির মতো বহু দশকের পুরোনো ভিন্টেজ গাড়ির ক্ষেত্রেও একই হারে উচ্চ ট্যাক্স, ফি ও অন্যান্য সারচার্জ প্রদান করতে হয়, অথচ এই মূল্যবান গাড়িগুলো প্রতিদিনের যাতায়াতে ব্যবহৃত হয় না এবং পরিবেশের ওপর বাড়তি কোনো চাপও সৃষ্টি করে না। তাছাড়া বিআরটিএ থেকে পুরোনো গাড়ির রেজিষ্ট্রেশন নবায়ন করা বা কাগজপত্রের জটিলতা মেটানো বেশ কঠিন একটি প্রক্রিয়া। এ কারণে দেশের প্রবীণ ও নবীন সংগ্রাহকরা দীর্ঘদিন ধরে জোর দাবি জানিয়ে আসছেন যেন ভিন্টেজ বা ক্লাসিক গাড়ির জন্য পৃথক ‘ক্লাসিক কার ক্যাটাগরি’, রেট্রো নম্বরপ্লেট ও বিশেষ ট্যাক্স রেয়াত সুবিধা প্রদান করা হয়।
যদি সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য ইতিবাচক ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, তবে বাংলাদেশে ভিন্টেজ কার কালচার কেবল কয়েকজন মানুষের ব্যক্তিগত শখের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এক নতুন সাংস্কৃতিক ও পর্যটন সম্ভাবনার বিস্তার ঘটাতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশেই ভিন্টেজ কার মিউজিয়াম বা গ্যালারি তৈরি করে কিংবা পর্যটকদের জন্য ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রার আয়োজন করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ও আন্তর্জাতিক সুনাম অর্জন করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসেও যে অটোমোবাইল সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় ধারা বিদ্যমান ছিল, তা বিশ্ববাসীর সামনে মর্যাদার সাথে তুলে ধরার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হতে পারে এই সমস্ত পরম মমতায় সংরক্ষিত চার চাকার অমূল্য রতনগুলো।
পরিশেষে এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ভিন্টেজ গাড়ি মূলত ধাতব চাকার ওপর ভর দিয়ে চলা এক টুকরো বাংলাদেশ, আমাদের অতীতের এক জীবন্ত সেলুলয়েড। এগুলো কেবল লোহা, লোহালক্কড় বা যান্ত্রিক যন্ত্রাংশের সমাহার নয়; বরং প্রতিটি গাড়ির স্টিয়ারিং, ড্যাশবোর্ড ও সিটের ভাঁজে জমে আছে অতীত দিনের কত মানুষের স্বপ্ন, ঘাম, আবেগ, আনন্দ আর আভিজাত্যের স্পর্শ। আধুনিকতার দ্রুতগতির এই অস্থির যুগে যেখানে সবকিছু ক্ষণস্থায়ী, ডিসপোজেবল এবং প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল, সেখানে এই ভিন্টেজ গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে স্থায়িত্ব, ধ্রুপদী রুচি ও নান্দনিকতার এক চিরন্তন স্মারক হিসেবে। ইট-কাঠের এই যান্ত্রিক জনাকীর্ণ শহরে যখন কোনো এক শান্ত সকালে রঙিন এক ভক্সওয়াগন বিটল বা ধীরগতির অভিজাত মার্সিডিজ নিজের রাজকীয় ভঙ্গিতে এগিয়ে চলে, তখন মনে হয় চারপাশের কোলাহল যেন মুহূর্তে থমকে গেছে। সংগ্রাহক, মেকানিক ও কার-প্রেমীদের গভীর ভালোবাসায় টিকে থাকা এই অনন্য বাহনগুলো আমাদের অতীত ও বর্তমানকে এক সুতোয় বেঁধে সামনের দিকে নিঃশব্দে এগিয়ে নিয়ে চলে।