* ১৮ বছরের পর বসানো হচ্ছে বিয়ের পিঁড়িতে
“কন্যাসন্তানের প্রতি যখন ইনভেস্ট করা হয়, তখন কিন্তু ছেলেদের চাইতে কোনোভাবেই পরিবারে ভূমিকা কম রাখেন না। কন্যাশিশু লেখাপড়া করে স্বাবলম্বী হলে পরিবারের জন্য অভিশাপ নয়, বরং আশীর্বাদ হয়ে ওঠেন”
— ড. সৈয়দ মো. শেখ ইমতিয়াজ, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ঢাবি
প্রাথমিকে মেয়েদের উপস্থিতি বাড়লেও উচ্চশিক্ষায় গিয়ে ঝরে পড়ছে অনেকেই। বিশেষ করে প্রাথমিকে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে থাকলেও ১৫ বছরের পর অভিভাবক ও প্রতিবেশীদের চাপে উচ্চশিক্ষায় বিঘ্ন ঘটছে তাদের। ফলে ১৮ বছরের পর উচ্চশিক্ষায় পা রাখার পরই আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী এবং অভিভাবকদের ত্রিমূখী চাপে বাধ্য হয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসে সংসার জীবনে ঢুকে পড়ছে মেয়েরা। এতে দিনের পর দিন তারা উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে ঝরে পড়ছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, মেয়েদের পরিবার ও সমাজের মনোভাব এখনো আশানুরূপ বদলায়নি। তাই প্রতিবছর ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালন করা হলেও কন্যার জীবনমান উন্নয়নে দিবসটি কতটা ভূমিকা রেখেছে, সেটি এখনও আলোচনার বিষয়। কারও কারও জীবনের খেরোখাতা এবড়োথেবড়ো, শক্ত কাঠের গুঁড়ির মতো অমসৃণ। যে জীবনে ইচ্ছেগুলো থাকে অধরা, পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব কষাও যেন বাতুলতা। তবুও জীবন চায় বাঁচতে, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের পিরোজপুর গ্রামের গোপালচন্দ্র সূত্রধরের জীবনটাও এমন। দারিদ্র্যের কষাঘাতে কেটেছে ৫৫টি বছর। মিলে কাঠ কেটে দিন কাটান তিনি। সপ্তাহান্তে আয় মোটে আড়াই হাজার টাকা। অভাব-অনটন ও সমাজের নানা প্রতিবন্ধকতা পাশ কাটিয়েও তিন কন্যাকে পড়াচ্ছেন তিনি। গোপালচন্দ্র বলেন, পড়া ছাড়া কোনো মূর্তি নাই তোরা, এখন তোরা যদি পড়স তাইলে পড়ামু। স’মিলের কয়েক গজ দূরে গোপালের সংসারে তার স্ত্রী ও কন্যারা বাঁশের চাটাই বুনেন, সংসারে বাড়তি অর্থ যোগান দেন। বড় মেয়ে রাত্রি সূত্রধর পড়ছেন স্নাতক প্রথম বর্ষে। আর দুই যমজ কন্যা পড়ছেন নবম শ্রেণিতে। রাত্রি সূত্রধর বলেন, টাকা জোগাড় করতে অনেক কষ্ট হয়েছে। মানুষের কাছে চাইলেও পাওয়া যায় না। আমি একটা চাকরি করে আনলে আমার বোনদের পড়াতে হবে।
এই সমাজে কন্যাশিশুর বেড়ে ওঠায় পদে পদে বাধাবিঘ্ন। ‘কন্যাকে এত পড়িয়ে কী হবে, জলদি বিয়ে দাও, বুড়ো বয়সে দেখবে না’ পাড়া-প্রতিবেশীদের এমন কথাও পাশ কাটিয়ে এগোতে হয় অভিভাবকদের। তার ওপর একটিও ছেলে সন্তান না হলে সমাজের চাপ বেড়ে যায় দ্বিগুণ। এই যেমন তামান্নারা কেবল চার বোন। বাবা-মা বেঁচে নেই। তবুও কোনো বাধাই দমাতে পারেনি তাদের। নিজেদের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে চলেছেন তারা। তানজিলা খান তামান্না বলেন, আমাদের গার্ডিয়ানরা হচ্ছে বাইরের লোকজন তারা কী বলল, সেটা কানে নেয়নি। তারা বলেছে, তোমরা তোমাদের যেটা ভালো মনে হবে, তোমরা সেটাই করবে। তোমরা মেয়ে হয়েছো তো কী হয়েছে, তোমরাও পারবে। তোমরাও চেষ্টা করো।
ইউনিসেফের তথ্য বলছে, ১৫ বছর বয়সের আগে কন্যাশিশুর বিয়ের হার কমলেও পরের তিন বছরে সেই হার অনেকটাই বেড়েছে। প্রাথমিকে ছেলে শিশুদের ঝরে পড়ার হার বেশি থাকলেও উচ্চ মাধ্যমিকে কন্যাশিশুরা ঝরে পড়ছে বেশি। বিশেষ করে পারিবারিক চাপে ১৮ বছরের পর থেকেই বিয়ে দিতে তৎপর হয়ে ওঠে অভিভাবকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. শেখ ইমতিয়াজ বলেন, পুত্র সন্তান হলে এখনও অনেক পরিবার মনে করে, বংশের প্রদীপ রক্ষা হবে এবং ভবিষ্যতে সেই সন্তান তাদের নিরাপত্তার কারণ হবে। কিন্তু মজার বিষয় হলো আমাদের গবেষণায় কিন্তু আমরা অনেকবারই দেখেছি যে কন্যাসন্তানের প্রতি যখন ইনভেস্ট করা হয়, তখন কিন্তু ছেলেদের চাইতে কোনোভাবেই পরিবারে ভূমিকা কম রাখেন না। এই অধ্যাপকের মতে, কন্যাশিশু লেখাপড়া করে স্বাবলম্বী হলে পরিবারের জন্য অভিশাপ নয়, বরং আশীর্বাদ হয়ে ওঠেন।