২০২৪ সালে গণঅভুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছেই। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয় পায় বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দলটি ক্ষমতায় আসার পরও প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ বিভিন্ন ইস্যুতে টানাপোড়েন ক্রমেই তিক্ত হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে প্রতিবেশী ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এতে দেশটির বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি ভারতে রপ্তানি আরও বাড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) দেশভিত্তিক রপ্তানি তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে ভারতে বাংলাদেশ ৩৩ কোটি ৫২ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩১ কোটি ১৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ২ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। ভারতের বাজারে রপ্তানি বাড়ার এই প্রবণতা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি প্রায় ৯১৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৮৬৯ কোটি ডলার। বাংলাদেশের জন্য ভারত গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বাজারগুলোর একটি। ফলে দেশটিতে রপ্তানি বাড়ার এই প্রবণতা দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইপিবি’র তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুলাই মাসেই ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারেও রপ্তানি আয় বেড়েছে। প্রথম দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ১১ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়ে ১৮৭ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। স্পেনে রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৭০ শতাংশ, যা ৮৩ কোটি ৮৫ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। তবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে একই সময়ে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ১৭৫ কোটি ডলার। ফলে ওই অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯২১ কোটি ডলার। এই বড় বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্যের জন্য ভারতের বিশাল ভোক্তা বাজারে আরও বেশি প্রবেশাধিকার তৈরি করা গেলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ভারসাম্য আনার সুযোগ রয়েছে।
এ সময়ে যুক্তরাজ্যে রপ্তানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ, পরিমাণ ৯৭ কোটি ৪ লাখ ডলার। নেদারল্যান্ডসে রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ, পরিমাণ ৪৯ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। কানাডায় রপ্তানি ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২৭ কোটি ৯৩ লাখ ডলার। উদীয়মান বাজারগুলোর মধ্যে তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। দেশটিতে রপ্তানি ৮৭ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়ে ১৩ কোটি ৮৯ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে রপ্তানি বেড়েছে ১৯ দশমিক ৫০ শতাংশ, পরিমাণ ৭ কোটি ৪২ লাখ ডলার। মেক্সিকোতে রপ্তানি ১৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। সুইডেনে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ১২ দশমিক ০৯ শতাংশ, পরিমাণ ১৩ কোটি ৪ লাখ ডলার। অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ৫১ শতাংশ, যা ১৬ কোটি ৪৯ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সামগ্রিক রপ্তানি চিত্রও আগস্টে বেশ ভালো ছিল। ওই মাসে বাংলাদেশ ৪৪৩ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের আগস্টের ৩৯২ কোটি ডলারের তুলনায় ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি। বড় বাজার, ভৌগোলিক নৈকট্য এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগের কারণে রপ্তানিকারকদের কাছে ভারতের বাজারের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সাম্প্রতিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বলছে, প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি ভারতসহ আঞ্চলিক ও উদীয়মান বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি প্লাস্টিক পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্যসহ অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে ভারতের বাজারকে আরও বেশি কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভারতের বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন বাজারে প্রবেশ এবং পণ্যের বহুমুখীকরণ অব্যাহত রাখতে পারলে বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান বড় বাণিজ্য ঘাটতি কমাতেও রপ্তানি বৃদ্ধির এই প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।