* ২০ ধাপ পেরিয়ে পাচার হচ্ছে পণ্যবোঝাই মূল্যবান কন্টেইনার
* বন্দর থেকে গায়েব কাপড় ভর্তি ২ কোটি টাকার কন্টেইনার
* অর্ডার বাতিলের শঙ্কায় রপ্তানিকারক, প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা
“কন্টেইনার গায়েবচক্রে জড়িত কয়েকটি অসত সিএন্ডএফ এজেন্ট। এদের সাথে বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারি জড়িত রয়েছে। ঘটনার তদন্ত হয়, বিচার পায়না রপ্তানিকারকরা”
— গোলাম রব্বানি রিগ্যান, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক, চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন
“বন্দরের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে কন্টেইনার গায়েব সংক্রান্ত অভিযোগ পেলে তদন্ত কমিটি গঠনের পাশাপাশি জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে”
— সৈয়দ রেফায়েত হামিম, সচিব, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ
দেশের সবচেয়ে বৃহত্তম চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নানা কৌশলে গায়েব হচ্ছে আমদানি ও রপ্তানিকারকদের মূল্যবান পণ্যভর্তি কন্টেইনার। সিøপের নাম-ঠিকানা পরিবর্তন করে বন্দর থেকে সহজেই খালাস করে নিচ্ছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র। অভিযোগ উঠেছে, এ চক্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বন্দর, কাস্টমস ও অসাধু সিএন্ডএফের সমন্বয়ে গড়া শক্তিশালী সিন্ডিকেট। চট্টগ্রাম বন্দরে ত্রিমূখী চক্রের কালো থাবায় নিঃশ্ব হচ্ছেন অনেক রপ্তানিকারকরা। গত দুই বছরে এ বন্দর থেকে পাচার বা গায়েব হয়ে গেছে পণ্যসামগ্রী বোঝাই ১০টি কন্টেইনার। অথচ তদন্ত কমিটি হলেও অদ্যবধি একটি কন্টেইনারের হদিস মেরাতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। এতে টার্মিনালে কন্টেইনার রাখা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক রপ্তানিকারক এখন তাদের অর্ডার বাতিল হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। ভুক্তভোগী ও সিএন্ডএফ নেতারা বলছেন, বন্দর থেকে একটি কন্টেইনার খালাস করতে নানা প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ২০ ধাপ পেরিয়ে আসতে হয়। ফলে বন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ও প্রশ্ন রয়েছে। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, অভিযোগের ভিত্তিতে কন্টেইনার গায়েব বা পাচারের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বন্দরের অভ্যন্তরে নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি নেই। ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল থেকে সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যবান কাপড়সহ একাধিক কনটেইনার গায়েব হলেও কেবল তদন্ত কমিটি গঠন করেই দায় সারছে কর্তৃপক্ষ। পণ্যের রক্ষক হলেও হারানো কন্টেইনারের জন্য দায় কিংবা ক্ষতিপূরণ দেয় না বন্দর কর্তৃপক্ষ। এমনকি সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া শুল্কও ফেরত পান না আমদানিকারক। সর্বশেষ ইয়ার্ড থেকে গায়েব হয় গাজীপুরের এক পোশাক কারখানার দুই কোটি টাকার কাপড় ভর্তি কন্টেইনার। এ অবস্থায় ব্যাপক আর্থিক ক্ষতিই নয়, বাতিল হওয়ার পথে রপ্তানির অর্ডার। অভিনব জালিয়াতিতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কোটি কোটি টাকা মূল্যের কাপড়ের কন্টেইনার বের করে নিয়ে যাচ্ছে একটি চক্র। সবশেষ গাজীপুরের তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান গোল্ড স্টার গার্মেন্টসের আমদানি করা প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের কাপড়ের কন্টেইনার বের করে নিয়ে যায় জালিয়াত চক্র। ফ্রান্সে থেকে পাঁচ লাখ পিস লেডিস পোশাক রপ্তানির ক্রয়াদেশ পেয়ে চীন থেকে এই কাপড় আমদানি করেছিলেন রপ্তানিকারক। ৪৫ লাখ টাকা পরিশোধ করে ৩০শে আগস্ট বন্দরের সিসিটি ইয়ার্ড থেকে পণ্য ডেলিভারি নিতে গেলে কন্টেইনারের হদিস মেলেনি। ১১ আগস্ট কন্টেইনারটি আফরিনা ট্রেডিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে গেছে বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় আর্থিক ক্ষতিই শুধু নয়, অর্ডার বাতিলের শঙ্কায় রয়েছেন এই রপ্তানিকারক।
রপ্তানিকারক গোল্ড স্টারের সিএন্ডএফ এজেন্টের মোফাজ্জেল হোসেন মোল্লা বলেন, সাইড পাওয়ার থেকে কন্টেইনার কিপ ডাউন করতে পারে নি। পরে আমরা খোঁজাখুঁজি করে সাইড পাওয়ারের এখানে যখন গেছি, তখন সাইড পাওয়ার থেকে বলতেছে যে, এই কন্টেইনার তো ১১ই সেপ্টেম্বরে ডেলিভারি হয়ে গেছে। অনুসন্ধানে এই জালিয়াতিতে তিনটি সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে। কনটেইনার নামানোর কিপডাউন সিøপে আফরিনা ট্রেডিংয়ের নাম থাকলেও ১১ সেপ্টেম্বর রাতে কন্টেইনারটি বের করে নিয়ে যায় প্যারামাউন্ট ট্রেডিং নামে আরেকটি সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানের লোকজন। অথচ বন্দরে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে সোনারগাঁও অ্যাসোসিয়েটস নামে অন্য আরেকটি সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান। কাস্টমসের ডকুমেন্টে সেটি ছিল ফলের চালান। প্রশ্ন উঠেছে ফলের কন্টেইনারের বিল অব এন্ট্রি দেখিয়ে কাপড়ের কন্টেইনার কিভাবে ডেলিভারি হলো?
গোল্ড স্টারের সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানের এসআরএস সিন্ডিকেট হাফিজুর রহমান বলেন, দেখা যাচ্ছে ডেলিভারি নিয়ে গেছে একটা স্পেশাল পারমিশন অন্সএসিস নিয়ে। একটা সিøপ পাইছি, সেই সিøপের কপিটা আমি দেখলাম। কিন্তু সিএডের মধ্যে সিঅ্যান্ডএফের নাম আছে আরেকজন, বিল এভেন্ট্রি নম্বর আরেকজনের।
ভুক্তভোগীরা বলেন, সিএন্ডএফ এজেন্টের মাধ্যমে বন্দর ও কাস্টমের কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া নিরাপত্তা বেস্টনির অন্তত ২০টি ধাপ পেরিয়ে পণ্য পাচার সম্ভব নয়। গত দুই বছরে অন্তত ১০ টি কনটেইনার বন্দর থেকে গায়েব হলেও হদিস মেলেনি একটিরও। কোনটিতেই পণ্য বা বন্দর থেকে ক্ষতিপূরণ পাননি। বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, বন্দর ও কাস্টমসের সব প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল না হলে এ ধরনের জালিয়াতি বন্ধ হবে না।
চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক গোলাম রব্বানি রিগ্যান বলেন, এগুলোর সাথে জড়িত রয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষের লোকজন। যেমন- মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্ট, এই কনটেইনারকে মুভমেন্ট করাইতে যান্ত্রিক ডিপার্টমেন্টটা লাগে। ট্রাফিকের ডিপার্টমেন্ট লাগে। এই চক্রটা দীর্ঘদিন যাবত এগুলির সাথে জড়িত এবং এগুলো করে আসছে। আমি আবারও বলব, এটা কোনো বিক্ষিপ্ত বা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সব ধাপে ভেরিফিকেশনের পরও এসব চক্র কিভাবে জালিয়াতি করছে তা প্রশ্ন-সাপেক্ষ।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি হয়েছে। কাস্টমসের প্রতিনিধি রয়েছে কমিটিতে। এবং কমিটির কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় যারা চিহ্নিত হচ্ছেন- সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের, তাদেরকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। তবে যে বা যারা জড়িত তাদের শনাক্তে তদন্ত কমিটি গঠনের পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে দাবি বন্দরের।